Published : 30 Sep 2025, 07:22 AM
দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীর মরমি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের ‘তাজকিরাত আল-আউলিয়া’ ফারসি ভাষায় রচিত সুফিদের জীবনীভিত্তিক একটি গ্রন্থ। বাংলায় এর আক্ষরিক অর্থ ‘সাধুদের জীবনী’। এই বইয়ে ৯৬ জন সুফি সাধক ও তাদের জীবনের লোকাতীত ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সারি আল-সাকাতির এই গল্পটি এ জে আরবেরির ইংরেজি অনুবাদ ‘মুসলিম সেইন্টস অ্যান্ড মিস্টিক্স’ (২০০০) থেকে বাংলায় ভাষান্তর করা হয়েছে। আজ রইলো দুই পর্বের প্রথম পর্ব।
সারি আল-সাকাতির পুরো নাম আবু আল-হাসান সারি ইবনুল মুঘাল্লেস আল-সাকাতি। তিনি ছিলেন মারুফ আল-কারখির শিষ্য এবং জুনায়েদ বাগদাদির মামা। বাগদাদের সুফি মহলে একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে তাকে সবাই চিনতো। অষ্টম শতকের প্রভাবশালী সুন্নি পণ্ডিত, আইনজ্ঞ, ধর্মতত্ত্ববিদ, ও ঐতিহাসিক আহমদ ইবন হাম্বালের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। এ কারণেই সে সময়ে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। সারি পেশায় ছিলেন পুরনো জিনিসপত্রের একজন ব্যবসায়ী। ২৫৩ হিজরিতে (৮৬৭ খ্রিস্টাব্দ) ৯৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন এই সুফি সাধক।
সারি আল-সাকাতি ছিলেন বাগদাদের প্রথম কোনো ব্যক্তি, যিনি সুফি তাওহিদের (ঐক্য) এবং রহস্যময় সত্যগুলো প্রচার করা শুরু করেছিলেন। তখনকার ইরাকের বেশিরভাগ সুফি শাইখ-ই ছিলেন তার শিষ্য। প্রখ্যাত সুফি সাধক জুনায়েদ বাগদাদি ছিলেন সম্পর্কে তার ভাগনে। আরেক সুফি সাধক মারুফ আল-কারখি ছিলেন তার আধ্যাত্মিক গুরু বা মুর্শিদ। সুফি ব্যক্তিত্ব হাবিব রায়ির সঙ্গেও জীবদ্দশায় তার সাক্ষাৎ হয়েছিল।
সারি থাকতেন বাগদাদ শহরে। সেখানে তার একটা দোকান ছিল। দোকানের দরজায় পর্দা ঝুলিয়ে ভেতরে গিয়ে নামাজে দাঁড়াতেন তিনি। প্রতিদিন এভাবে অজস্র রাকাত নামাজ পড়তেন সারি। একদিন লোকাম পর্বত থেকে এক ব্যক্তি এলেন তাকে দেখতে। পর্দা একটু সরিয়ে লোকটা বলল, “লোকাম পাহাড়ের একজন শাইখ আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন।”
এ কথা শুনে সারি বলে উঠলেন, “উনি তো পাহাড়ে থাকেন। আর সে কারণে তার এ সাধনার কোনো মূল্য নেই। একজন সাধকের বাস করা উচিত বাজারের (বহু মানুষের) মধ্যে। এবং আল্লাহতে এতোটাই মশগুল থাকা যেন এক মুহূর্তের জন্যও সে আল্লাহকে ভুলে না যায়।”
তার সম্পর্কে আরও যদি বলি, লেনদেনের ক্ষেত্রে সারি কখনও পাঁচ শতাংশের বেশি লাভ করতেন না। একবার তিনি ষাট দিনার দিয়ে বাদাম কিনলেন। তার পরপর-ই বাদাম হঠাৎ দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠল। একদিন এক ব্যবসায়িক প্রতিনিধি এলেন তার সঙ্গে দেখা করতে। সারি তাকে বললেন, “এই বাদামগুলো বিক্রি করে দিন।” “কত দামে?” প্রতিনিধি জানতে চাইল। “ছেষট্টি দিনারে,” সারির উত্তর।
অবাক হয়ে প্রতিনিধি বলল, “কিন্তু আজকে বাদামের বাজারমূল্য তো নব্বই দিনার।” এই শুনে সারির জবাব, “আমার নীতি হচ্ছে পাঁচ শতাংশের বেশি মুনাফা না নেওয়া। আমি আমার নীতি ভাঙব না।” প্রতিনিধি তখন বলল, “কিন্তু আমি তো আপনার জিনিস কম দামে বিক্রি করাটাকেও সঠিক বলে মনে করি না।” ফলে প্রতিনিধি আর তা বিক্রি করলেন না। সারিও তার নিজের নীতি থেকে সরে এলেন না একচুল।
শুরুর দিকে নানা রকম ছোটোখাটো জিনিসপত্র বিক্রি করতেন সারি। একদিন আগুন ধরে যায় বাগদাদের বাজারে। মানুষজন এসে তাকে বলতে লাগলো, “আগুন লেগেছে বাজারে।” “ওহ, তাহলে আমিও তো মুক্ত হয়ে গেলাম,” বললেন সারি। পরে একটা দল আসে বাজার পরিদর্শনে। তাতে দেখা যায়, একমাত্র সারির দোকানই অক্ষত। আর সব পুড়ে ছাই! সারিও এসে দেখলেন সেই দৃশ্য। তার পরপরই যা ছিল সব দরিদ্রদের বিলিয়ে দিয়ে সারি সম্পূর্ণভাবে পা বাড়ালেন সুফি জীবনের পথে।
“আপনার আধ্যাত্মিক জীবনের শুরুটা কীভাবে”, একবার জানতে চাওয়া হয়েছিল সারির কাছে। তিনি তখন বলেন, “একদিন হাবিব রায়ি যাচ্ছিলেন আমার দোকানের সামনে দিয়ে। তাকে কিছু একটা দিয়ে আমি বললাম, এটা দেবেন দরিদ্রদের। তখন তিনি এই বলে দোয়া করলেন, “‘আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন।” সেই দিনের ওই মুহূর্তে তিনি যখন এই দোয়া উচ্চারণ করলেন; অনুভব করলাম, তখন থেকেই দুনিয়াদারি আমার চোখে মূল্যহীন হয়ে উঠল।
পরদিন এলেন, মারুফ-এ-কারখি (আমার মুর্শিদ)। সঙ্গে একটা ইয়াতিম শিশু। এসে বললেন, “এই শিশুটিকে কাপড় দাও।” আমি শিশুটিকে পরানোর জন্য পোশাক দিলাম। তখন তিনি দোয়া করলেন, “আল্লাহ যেন এই পৃথিবীকে তোমার অন্তরের শত্রু করে দেন। আর তোমাকে এই কাজ থেকে এনে দেন মুক্তি। মারুফের ওই দোয়ার বরকতে সেই দিন থেকে আমি পার্থিব সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে গেলাম।”
একদিন বয়ান করছিলেন সারি। ঠিক সেই সময়, চাকচিক্যে মোড়া বেশভূষায় একদল দাস-দাসী আর চাকরের দল নিয়ে সেখানে হাজির হলেন খলিফার অনুচরদের একজন; আহমাদ-ই ইয়াজিদ নামক এক লিপিকার। “এই দরবেশ কী বলে একটু শুনে নিই,” বললো সে “অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি। গিয়েছি বহু জায়গায়, যেখানে যাওয়ার কথা ছিল না। এখন এসব থেকে বের হয়ে আসা জরুরি।” এই বলে সারির বয়ান শুনতে ভেতরে ঢুকলো সে।
সারি তখন বলছিলেন, “আঠারো হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানুষের চাইতে দুর্বল কিছু নেই। অথচ, আল্লাহর হুকুম অমান্য করার দিক দিয়ে সমগ্র সৃষ্টিজগতের মধ্যে মানুষের চেয়ে অবাধ্যও আর কেউ নয়। যখন সে ভালো, এমন ভালো যে ফেরেশতারাও হিংসায় জ্বলে ওঠে। আর যখন সে খারাপ, এরকম খারাপ যে শয়তান নিজেও তার সঙ্গে মিশতে চায় না। কী আশ্চর্য সৃষ্টি এই মানুষ! এত দুর্বল, অথচ এত সাহস তার যে, সর্বশক্তিমান আল্লাহর হুকুম অমান্য করতেও সংকোচ বোধ করে না!”
সারির মুখের কথাগুলো ঠিক যেন তীর হয়ে বিঁধল আহমাদের অন্তরে। সে এমন হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো যে, এক পর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়ে গেল। তারপর চোখের পানি মুছে, ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে ফিরে গেল বাড়ি। সেই রাতে কোনো খাবার খেল না সে। কথাও বললো না কারও সঙ্গে। পরদিন ভোর হতে না হতেই পায়ে হেঁটে এলো সারির আস্তানায়। মুখে তার দুশ্চিন্তার ছায়া, চেহারাও নিস্তেজ। সারির বয়ান শেষ হলে চুপচাপ ফিরে এলো ঘরে।
তৃতীয় দিনেও সে এলো। একাকী, পায়ে হেঁটে। সভা শেষ হওয়ার পর এবার সে এসে দাঁড়াল সারির সামনে। বললো, “হুজুর, আপনার বাণী আমাকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছে যে, এই দুনিয়াকে এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে বিষাদে ভরপুর। দুনিয়ার মোহ ছাড়তে চাই আমি; মানুষের সঙ্গ ছেড়ে দিয়ে পা বাড়াতে চাই নির্জনতার পথে। আপনি আমাকে দেখিয়ে দিন সেই সফরের পথ, যে পথে যাত্রা করে আত্মা।”
সারি জানতে চাইলেন, “কোন পথ চাও তুমি? শরিয়তের, নাকি তরিকতের? যে পথ সবার, নাকি সেই পথ, যা সেইসব নির্বাচিতদের, যাদের আছে অন্তর্দৃষ্টি?” “দয়া করে দুটো পথ-ই খুলে বলুন আমাকে। যেন বুঝতে সুবিধা হয় কোন পথে যাবো”, বিনীত কণ্ঠে বলল আহমাদ।
সারি তখন বললেন, “জনসাধারণের পথ হলো এই, তুমি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে ইমামের পেছনে। আর অংশ নেবে দান-খয়রাতে। যদি তা টাকা-পয়সা হয়, তাহলে প্রতি বিশ দিনারে সদকা করবে অর্ধ দিনার। আর নির্বাচিতদের পথ, সে এক ভিন্ন সাধনার ডানায় ভর দিয়ে চলে। এই পথে চলতে গেলে পেছনে ফেলে দিতে হয় দুনিয়াকে, চিরতরে। দুনিয়ার মোহ, বিত্ত, সম্মান, এর কোনোটার ফাঁদে আর পা দিতে নেই। যদি পৃথিবী নিজেই এসে তোমার দিকে তার দুই হাত বাড়িয়ে দেয়, তুমি সেটা প্রত্যাখান করবে একদম নিঃসঙ্কোচে, নিঃশব্দে। এই কেবল এই দুটি পথই খোলা রয়েছে মানুষের সামনে।”
এই কথা শুনে আহমাদ, সেই রাজসভাসদ, বেরিয়ে পড়লেন সভা থেকে। একবার মুখ তুলে তাকালেন দূরের বিজন মরুর পথে। তারপর, দুনিয়ার মোহমায়া পেছনে ফেলে, ক্রমশ হারিয়ে গেলেন নীরবতার গভীরে।
চলবে...