অনূদিত গল্প
Published : 03 Apr 2026, 12:43 AM
বেলজিয়ামের নাট্যকার, কবি ও প্রাবন্ধিক মরিস মাতেরল্যাঁক (১৮৬২-১৯৪৯), তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ১৯১১ সালে। ‘দ্য ব্লু বার্ড’ শিরোনামে তার এ নাটকটি ১৯০৮ সালে লেখা। এটি কেবল শিশুদের রূপকথা নয়, বরং মানবজীবনের গভীর সত্য অন্বেষণের বার্তা বহন করে। সেই বিবেচনা থেকে নাটকটিকে ছোটগল্প আকারে পুনর্লিখন করা হলো।
‘দ্য ব্লু বার্ড’ নাটকটি প্রথম অভিনীত হয় মস্কো আর্ট থিয়েটারে, যার নির্দেশনায় ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব কনস্ট্যান্টিন স্ট্যানিস্লাভস্কি। নাটকটির মূল উপজীব্য হলো ‘সুখ’। তিতিল ও মিতিল নামে দুই সহোদরের এক জাদুকরী অভিযানের মধ্য দিয়ে লেখক আমাদের দেখিয়েছেন যে, সুখ কোনো দূরবর্তী লক্ষ্য নয়, বরং তা আমাদের অতি চেনা জগতের সাধারণ জিনিসের মধ্যে, নিঃস্বার্থ ত্যাগের মধ্যে এবং নিজের অন্তরের প্রশান্তিতেই লুকিয়ে থাকে।
বড়দিনের আগের রাত। কাঠের ঘরের আধো-অন্ধকারে তিতিল আর মিতিল জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের ঝকঝকে দুনিয়াটা দেখছিল। মিতিল, দেখ দেখ! ওই বাড়িতে কত আলো, কত কেক! তিতিল উত্তেজিত গলায় বলল। মিতিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল, হ্যাঁ দিদি, কিন্তু আমাদের তো নীল রঙের চিনি-মাখানো কেক নেই!
তাতে কী? ওদের খাওয়া দেখে আমাদেরও তো পেট ভরে যাচ্ছে! তিতিলের কণ্ঠে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। হঠাৎ করেই দরজায় খটখট শব্দ। কপাটের কবজা আর্তনাদ করে উঠল। ভেতরে ঢুকলেন এক কুঁজো বুড়ি। নাকটা বাঁকানো, পরনে সবুজ ঘাগরা।
তোমাদের খাঁচায় কি নীল পাখি আছে? বুড়ি কর্কশ গলায় জানতে চাইলেন। তিতিল থতমত খেয়ে বলল, না তো ঠাকুমা, আমার কাছে একটা ধূসর ঘুঘু আছে। ওটা কি হবে?
না না! আমার নাতনি ভীষণ অসুস্থ। সে কেবল নীল পাখি চায়। ওটা না পেলে সে সারবে না। বুড়ি নিজের লাঠিতে ভর দিয়ে এগোতে এগোতে বললেন, আমি হলাম পরী বেরিলুন। তোমরা কি যাবে আমার জন্য নীল পাখি খুঁজতে? মিতিল ভয়ে তিতিলের হাত ধরল। তিতিল সাহস সঞ্চয় করে বলল, কিন্তু আমরা তো ছোট, রাস্তা চিনি না!
পরী বেরিলুন হাসলেন। তার হাতের লাঠিটা বাতাসে ঘোরাতেই এক অপূর্ব জ্যোতি ফুটে উঠল। তিনি তিতিলের মাথায় পরিয়ে দিলেন এক জাদুকরী টুপি, যার মাঝখানে বসানো ছিল বিশাল এক হীরা। এই হীরাটা একবার ঘোরাও তিতিল। দেখবে যা দৃশ্যমান নয়, তাও তোমার চোখে ভাসছে।
তিতিল আলতো করে হীরাটি ঘোরাল। অমনি জাদুকরী কাণ্ড! ঘরের কোণের রুটিগুলো থপথপ করে মেঝেতে নেমে এলো। তাদের পেট মোটা, পরনে হলদে পোশাক। ওরে বাবা! আমি তো এখন মানুষ! রুটি চিৎকার করে উঠল।
পাশের কলসি থেকে জল উপচে পড়ে এক ক্রন্দনরতা সুন্দরী তরুণীর রূপ নিল। উনুন থেকে আগুন বেরিয়ে এসে তলোয়ার হাতে নাচতে শুরু করল। চিনি তার লম্বা আঙুলগুলো দিয়ে মিষ্টি হাসি ছড়াতে লাগল।
সবচেয়ে বড় চমক দিল তাদের পোষা কুকুর টাইলো আর বিড়াল টাইলেট। টাইলো তিতিলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চেঁচাতে লাগল, আমার ছোট্ট মনিব! আমি কথা বলতে পারছি! আমি তোমাকে ভালোবাসি! আমি তোমার জন্য জান দিয়ে দেব! অন্যদিকে বিড়াল টাইলেট তার গোঁফ নাচিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, সাবধান তিতিল, মানুষ যখন সব জেনে ফেলে, তখন প্রাণীদের বিপদ বাড়ে। আমি তোমাদের সঙ্গ দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু সবকিছুর ওপর নজর রাখব।
ঠিক তখনই ঘরের মাঝখানে ফুটে উঠল এক স্বর্গীয় জ্যোতি। এক নারীমূর্তি আবির্ভূত হলেন। তার গা থেকে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটছে। আমি হলাম আলো, তিনি শান্তকণ্ঠে বললেন। ভয় নেই শিশুদের। নীল পাখির সন্ধানে আমিই হব তোমাদের পথপ্রদর্শক।
আলোর নির্দেশে তারা পৌঁছাল ‘স্মৃতির দেশে’। সেখানে সব সময় ঘন কুয়াশা। দিদি, আমার ভয় করছে! মিতিল ফিসফিস করে বলল। তিতিল বলল, ভয় নেই মিতিল, হীরাটা ঘোরালেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। কুয়াশা সরতেই তারা দেখল এক পুরোনো পরিচিত কুঁড়েঘর। সামনে বসে আছেন তাদের মৃত দাদা আর দাদি।
আরে! ওটা তো দাদু! তিতিল দৌড়ে গিয়ে দাদুর গলা জড়িয়ে ধরল। দাদি হাসিমুখে বললেন, তোরা এসেছিস? আমরা কতদিন ধরে তোদের জন্য অপেক্ষা করছি। তিতিল অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, দাদি, তোমরা তো মারা গেছ, তবে এখানে আছ কীভাবে?
দাদু তামাকের পাইপটা মুখে দিয়ে বললেন, পাগল ছেলে! আমরা মরি না। পৃথিবীতে যারা বেঁচে আছে, তারা যখন আমাদের কথা মনে করে, তখনই আমরা জেগে উঠি। আর যখন কেউ মনে করে না, তখন আমরা গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই।
তিতিল সেখানে একটি নীল পাখি দেখল। দাদুর অনুমতি নিয়ে সে পাখিটি খাঁচায় ভরল। পেয়েছি! মিতিল দেখ, আমি নীল পাখি পেয়েছি!
কিন্তু বিদায় নিয়ে যেই তারা স্মৃতির দেশের সীমানা পার হলো, অমনি নীল পাখিটি ফ্যাকাশে ধূসর হয়ে গেল। আলো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ওটা স্মৃতির পাখি ছিল তিতিল, আসল নীল পাখি নয়।
তাদের পরবর্তী গন্তব্য ‘রাত্রির প্রাসাদ’। কালো মার্বেলের তৈরি বিশাল অট্টালিকা। সিংহাসনে বসে আছেন রহস্যময়ী রাত্রি। রাত্রি রানি, নীল পাখি কি এখানে আছে? তিতিল সাহসের সঙ্গে প্রশ্ন করল। রাত্রি ভ্রু কুঁচকে বললেন, এখানে দুঃখ আছে, রোগ আছে, যুদ্ধ আছে। কিন্তু নীল পাখি? ওরে খুকি, ওটা খোঁজার সাহস কি তোর আছে?
তিতিল দমল না। সে এক এক করে বন্ধ দরজাগুলো খুলতে শুরু করল। প্রথম দরজা খুলতেই বেরিয়ে এল ‘অসুখ’। দ্বিতীয় দরজা থেকে ‘যুদ্ধ’। সাবধান তিতিল! মিতিল আর্তনাদ করে উঠল। তিতিল যখন শেষ দরজাটি খুলল, দেখা গেল এক নন্দনকানন। সেখানে লক্ষ লক্ষ নীল পাখি উড়ছে। তিতিল আর মিতিল দুহাতে পাখিগুলো ধরতে লাগল।
আলো! দেখো, আমরা হাজার হাজার নীল পাখি পেয়েছি! কিন্তু প্রাসাদের বাইরে আসতেই সেই পাখিগুলো একে একে মরে লুটিয়ে পড়ল। আলো বিষণ্ন কণ্ঠে বলল, এগুলো তো স্বপ্নের নীল পাখি তিতিল। চাঁদের আলোয় এদের নীল দেখায়, কিন্তু দিনের আলো সইতে পারে না এরা।
এবার যাত্রা চলল ‘ভবিষ্যতের রাজ্যে’। সেখানে সবকিছুই নীল। একদল শিশু সেখানে অদ্ভুত সব কলকব্জা নিয়ে কাজ করছে। তিতিল এক শিশুকে জিজ্ঞেস করল, তোমরা এখানে কী করছ? শিশুটা গর্বের সঙ্গে বলল, আমি পৃথিবীতে গিয়ে এক নতুন মেশিন আবিষ্কার করব, যা মানুষকে অমর করে দেবে। আমরা সবাই কোনো না কোনো উপহার নিয়ে পৃথিবীতে যাওয়ার অপেক্ষায় আছি।
হঠাৎ এক অতি ক্ষুদ্র শিশু তিতিলের কাছে এসে বলল, চিনতে পারছ ভাইয়া? আমি তোমাদের বাড়িতে আসব আগামী বছর। তিতিল শিহরিত হয়ে বলল, তুমি আমার ভাই হবে?
হ্যাঁ! কিন্তু আমার আগে ওই যে দেখছ নীল নৌকা, ওই নৌকায় করে কালপুরুষ শিশুদের নিয়ে যান। আজ আমার যাওয়ার সময় নয়। সেখানেও একটি খাঁচাবন্দি নীল পাখি ছিল। কিন্তু কালপুরুষের তাড়া খেয়ে ফেরার পথে তিতিল দেখল, সেই পাখির রংও বদলে গেছে।
অবশেষে এক বছর পার হলো। যদিও মর্ত্যের হিসেবে মাত্র এক রাত। তিতিল আর মিতিল ক্লান্ত। তারা তাদের চিরচেনা ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। আলো ম্লান হাসল। বন্ধুরা, আমার যাওয়ার সময় হয়েছে। তোমাদের অভিযান শেষ।
তিতিল কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, কিন্তু আমরা তো আসল নীল পাখি পেলাম না! পরীর নাতনি কি তবে সুস্থ হবে না? আলো উত্তর দিলেন, নিজের চারপাশটা ভালো করে দেখো তিতিল। উত্তরটা ওখানেই আছে। কথা শেষ হতেই আলো মিলিয়ে গেল। রুটি আবার রুটি হয়ে গেল, টাইলো আর টাইলেট ফিরে গেল তাদের পশু জন্মে।
ভোরে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল তিতিল আর মিতিলের। ওঠ রে পাগলের দল! বড়দিনের সকাল হয়ে গেছে! মা চিৎকার করে ডাকলেন। তিতিল চোখ কচলাতে কচলাতে ঘরের চারদিকে তাকাল। তার চিরচেনা সেই পুরনো দেওয়াল, সেই ভাঙা টেবিল। কিন্তু আজ যেন সবকিছুতে এক অপূর্ব উজ্জ্বলতা।
ঠিক তখনই প্রতিবেশী বৃদ্ধা বেরিলুন এলেন। খুকি, আমার নাতনিটা বড় অসুস্থ। তোমার ওই ধূসর ঘুঘুটা কি দেবে আমাকে? তিতিল খাঁচার দিকে তাকাল। তার চোখ ছানাবড়া! যে পাখিটি কাল রাতে ধূসর ছিল, আজ সকালের আলোয় সেটি গাঢ় নীল!
মা! দাদি! দেখো! এই তো নীল পাখি! আমি সারা বিশ্ব ঘুরেছি, অথচ ওটা আমার ঘরের কোণেই ছিল! তিতিল উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল।
সে পাখিটি বেরিলুনকে দিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল বেরিলুনের নাতনি দৌড়ে আসছে। সে সুস্থ, তার মুখে নির্মল হাসি। কিন্তু যখনই তারা পাখিটা নিয়ে খেলতে যাবে, তখনই পাখিটি ডানা ঝাপটিয়ে জানলা দিয়ে খোলা আকাশে উড়ে গেল।
ওহ! ও চলে গেল! বালিকাটি আর্তনাদ করে উঠল। তিতিল তাকে শান্ত করে বলল, কেঁদো না। ও উড়ে গেছে অন্যের কাছে সুখ পৌঁছে দিতে। কিন্তু আমরা তো জানি ও কোথায় থাকে।