Published : 23 Jul 2026, 12:52 PM
গানের টিউশনি সেরে আজিমপুর থেকে ফিরছিলাম। মেট্রো ধরব বলে একটি অটোতে উঠলাম। বাইরে তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। ব্যাগ থেকে হেডফোন বের করছি, ঠিক তখনই কানে এল সুফি গানের এক মাতাল করা সুর।
কৌতূহল সামলাতে না পেরে অটোচালককে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি গান শোনেন?” তিনি সহজ গলায় উত্তর দিলেন, “হ, শুনি তো। কেন ভাই?”
অটো চলতে থাকল, আর বৃষ্টিভেজা শহরের রাস্তায় চলতে থাকল আমাদের আলাপ। টিএসসি মেট্রো স্টেশনে এসে অটো থামল। নেমে যাওয়ার আগে শুধু বললাম, “গান শোনাটা কখনো বন্ধ করবেন না।” উত্তরে তিনি যা বললেন, তা রীতিমতো আমায় স্তব্ধ করে দিল। তিনি বললেন, “ভাই, শোনেন, গান তো আমাগো জ্ঞান বাড়ায়। আল্লার সঙ্গে কথা কই এই সুর দিয়া। এই গান কেমনে ছাড়বো?”
বৃষ্টি তখন আরও বেড়েছে। কথা আর বাড়ানো হলো না। লোকটি অটো নিয়ে চলে গেলেন, আর আমি এস্কেলেটরে উঠতে উঠতে ভাবছিলাম সেই কথাগুলোই। একজন সাধারণ অটোচালকের কাছে গান যদি এমন গভীর জীবনদর্শন বয়ে আনে, তবে একজন উচ্চশিক্ষিত সংগীতশিল্পী কিংবা কনসার্টে দামি টিকেট কেটে আসা শ্রোতা যখন একই সুরে বিভোর হন, তখন কি তাদের অনুভূতি এই চালকের চেয়ে খুব বেশি ভিন্ন হয়?
আমরা প্রায়ই গানকে শ্রেণিভিত্তিক ছাঁচে ফেলে বিচার করি। ধরে নিই, উচ্চাঙ্গ বা ধ্রুপদী সংগীত কেবল ‘শিক্ষিত ও রুচিশীল’ মানুষের বিষয়, আর লোকগান বা পথের গান ‘নিম্নবিত্তের’। অথচ বাস্তবে সংগীত এমন কোনো কৃত্রিম বিভাজন মানে না। একজন রিকশাচালক যখন প্যাডেল মারতে মারতে বাউল সুর গুনগুন করেন, আর একজন করপোরেট কর্মকর্তা গাড়িতে বসে হেডফোনে সেই একই সুর শোনেন- দুজনের অনুভূতির স্তরে পার্থক্য থাকে না। সুর দুজনকেই পৌঁছে দেয় এক অতীন্দ্রিয় প্রশান্তি, স্মৃতি কিংবা আত্মমগ্নতার জগতে।
সংগীতের এই শক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আমরা দেখি এটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমানাও অনায়াসে অতিক্রম করে। সংগীততত্ত্বের ব্যাকরণ না জেনেও একজন মানুষ গানের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেন। রাগ-রাগিণীর নাম না জেনেও একটি সুর কাউকে কাঁদাতে পারে, সাহস জোগাতে পারে, আবার কারও ভেতরে প্রতিবাদ কিংবা দ্রোহের আগুনও জ্বালিয়ে দিতে পারে।
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা সংগীততত্ত্বের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’-এর গান তাদের অনুপ্রাণিত করেছে, দিয়েছে লড়াইয়ের শক্তি। শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধই নয়, পৃথিবীর প্রায় সব মুক্তি আন্দোলনেই সংগীত মানুষকে একত্র করেছে, করেছে আন্দোলিত। তাই গান বোঝার জন্য অ্যাকাডেমিক প্রশিক্ষণের চেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি সংবেদনশীল মন এবং শোনার আগ্রহ।
সংগীতের এই সীমানাহীনতা শুধু শ্রেণি বা শিক্ষার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতির গণ্ডিও অতিক্রম করে। ইতিহাস বলে, প্রতিভাবান শিল্পীরা সবসময় এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে পরিভ্রমণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শৈশব থেকেই পাশ্চাত্য সংগীতের সংস্পর্শে বড় হয়েছিলেন। তার মেজদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর পিয়ানো ও বেহালা বাজাতেন, আর সেই সুরের ভুবন রবীন্দ্রনাথের সংগীতচেতনাকে সমৃদ্ধ করেছিল। পরবর্তীকালে তিনি স্কটিশ ও আইরিশ লোকসুরের আদলে একাধিক গান রচনা করেন।
একইভাবে কাজী নজরুল ইসলাম আরব, পারস্য ও মধ্য এশিয়ার সংগীতধারাকে নিজের সৃষ্টিতে আত্মস্থ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে রাহুল দেব বর্মন লাতিন আমেরিকার ‘বোসা নোভা’সহ নানা আন্তর্জাতিক ছন্দকে হিন্দি গানে সার্থকভাবে ব্যবহার করেন। আর এ আর রহমান ভারতীয় সংগীতকে পাশ্চাত্য অর্কেস্ট্রেশন ও ইলেকট্রনিক সাউন্ডের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন এক বিশ্বজনীন মাত্রা।
এই ধারার সবচেয়ে অনন্য কারিগরদের একজন ছিলেন সলিল চৌধুরী। ভারতীয় রাগসংগীতের সঙ্গে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীতের হারমনি ও অর্কেস্ট্রেশনকে তিনি এমনভাবে মিলিয়েছিলেন, যা সে সময় ছিল অভাবনীয়। মোৎসার্ট, বেটোফেন, বাখ কিংবা চাইকোভস্কির কাজ তার সংগীতচিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল। তবে তিনি তা অন্ধভাবে অনুকরণ করেননি; বরং ভারতীয় সুরের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র ভাষা।
সংগীত এভাবেই বহু মানুষের হাতে, বহু সংস্কৃতির সংস্পর্শে সমৃদ্ধ হয়েছে, যেমন একটি জীবন্ত ভাষা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ভাষার শব্দ গ্রহণ করে নিজেকে শক্তিশালী করে তোলে। অথচ আমরা প্রায়ই সংগীতকে সংকীর্ণ গণ্ডিতে আটকে ফেলতে চাই- এটা আমার সংস্কৃতি, ওটা অন্যের; এটা ‘বিশুদ্ধ’, ওটা ‘অশুদ্ধ’। অথচ, কোনো সংস্কৃতিই একা বিকশিত হয় না। আদান-প্রদান ও বিনিময়ের মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত বিকাশ ঘটে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সংগীতবিষয়ক নানা লেখায় বারবার বাংলা গানের সম্ভাবনা ও বিকাশের কথা বলেছেন। তিনি মনে করতেন, সংগীতকে জীবন্ত রাখতে হলে তাকে আত্মতুষ্টির গণ্ডি থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে সংলাপে বসতে হবে। অন্য সংস্কৃতি থেকে শিক্ষা নেওয়া মানেই নিজের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলা নয়; বরং সৃজনশীল গ্রহণের মাধ্যমেই শিল্প আরও সমৃদ্ধ হয়।
রবীন্দ্রনাথের একটি ভাবনা এখানে প্রাসঙ্গিক। যন্ত্রসংগীতের এক বিশেষ শক্তি রয়েছে, যেখানে ভাষার সীমাবদ্ধতা নেই। শব্দের অর্থ তৈরি হয় নির্দিষ্ট ভাষা বা সমাজের গণ্ডিতে, কিন্তু সুর সেই সীমা অনায়াসে ছাড়িয়ে যায়। গানের কথা মানুষের সৃষ্টি, তাই তার একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষিত থাকে। কিন্তু সুর অনেক বেশি উন্মুক্ত ও সর্বজনীন। এই কারণেই একই সুর একজন অটোচালকের কাছে স্রষ্টার সঙ্গে কথা বলার ভাষা হয়ে ওঠে, আবার ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের কাছে অন্য কোনো অনুভূতির জন্ম দেয়।
বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে এই মেলবন্ধনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ভারতীয় বেহালাবাদক এল. সুব্রামানিয়াম প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য- দুই সংগীতধারাকেই একসূত্রে গেঁথেছেন। পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া ভারতীয় বাঁশির সুরকে পাশ্চাত্য অর্কেস্ট্রার সঙ্গে মিলিয়েছেন। গ্রিসের সংগীতশিল্পী ইয়ানি তার আন্তর্জাতিক দল গড়েছেন চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের নিয়ে।
তবে গানের এই সর্বজনীনতা নিয়ে ভাবতে গিয়ে একটা প্রশ্নও জাগে, বাণিজ্যিকীকরণের এই যুগে আমরা কি সংগীতের এই গণতান্ত্রিক চরিত্রকে ধরে রাখতে পারছি? দামি কনসার্ট, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সাবস্ক্রিপশন ফি কিংবা সংগীতশিক্ষার উচ্চ ব্যয়- এসব কি গানকে আবার নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির সম্পত্তিতে পরিণত করছে!
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে অবশ্য এই বিনিময় আরও সহজ হয়েছে। ইউটিউব বা ডিজিটাল মাধ্যমে এখন দেখা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীরা দূরত্ব ঘুচিয়ে একসঙ্গে সংগীত পরিবেশন করছেন। ইতালির গিটার, নাইজেরিয়ার পারকাশন, যুক্তরাষ্ট্রের ড্রামস, নেপালের বেজ গিটার, কলকাতার বেহালা আর দক্ষিণ ভারতের কণ্ঠ, সব মিলে তৈরি হচ্ছে এক নতুন গ্লোবাল মিউজিক। এসব উদাহরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংগীত আদতে মুক্ত। তার কোনো পাসপোর্টের প্রয়োজন হয় না।
তবু বাস্তবতা হলো, আমাদের মানসিকতা কখনও কখনও এই মুক্ত প্রবাহের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নতুন কিছু গ্রহণ করার বদলে আমরা অনেক সময় পুরোনো কাঠামোকেই আঁকড়ে ধরে থাকি, কিংবা নিজেদের সংগীতকেই ‘সেরা বা খাঁটি’ প্রমাণ করার লড়াইয়ে নামি। কিন্তু যে সংগীত অন্যকে গ্রহণ করতে জানে, নতুন অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করতে পারে, দিনশেষে সেই সংগীতই টিকে থাকে।
সংগীতের প্রকৃত শক্তি তার এই সীমাহীনতায়। রাস্তার সাধারণ অটোচালক থেকে শুরু করে বিশ্বের নানা প্রান্তের মহৎ শিল্পী, সবাই যখন একই সুরের টানে মুগ্ধ হন, তখন বোঝা যায় গান কোনো নির্দিষ্ট দেশ, শ্রেণি কিংবা ধর্মের নয়। পাখির যেমন কোনো কাঁটাতার নেই, গানেরও তেমনি কোনো সীমানা নেই।