Published : 27 May 2026, 10:42 AM
ত্যাগের মহিমা আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ঈদুল আজহা। তবে দেশভেদে এ উৎসবের রঙে আসে ভিন্নতা। কোথাও কবরে গিয়ে স্বজনদের স্মরণ, কোথাও আকাশে বন্দুকের গুলি ছোড়া, আবার কোথাও কোরবানির পশুর ‘সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা’-এমনই নানা বিচিত্র আমেজে সাজানো থাকে এই ঈদ।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে আজ ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে। অন্যদিকে চাঁদ দেখার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে আগামীকাল ঈদ পালিত হবে।
হজের সমাপ্তি ঘোষণা আর হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে পালিত হয় এই ‘বড় ঈদ’। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক বিশ্বের ৭ অঞ্চলের অনন্য কিছু ঈদ রীতি:
১. কায়রোর উটের বাজার

ঈদের আগে নতুন পোশাক কেনা যেমন সাধারণ বিষয়, তেমনি পশুর হাটের ভিড়ও সব মুসলিম দেশে চিরচেনা। তবে মিশরের কায়রোর উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বিরকাশ এলাকায় ‘সুক আল জামাল’ বা উটের হাটটি একদম আলাদা। বলা হয়, এটি বিশ্বের বৃহত্তম উটের বাজার।
বিরকাশ বাজারে একটি বিশেষ দিক হলো, যখন ক্রেতা ও বিক্রেতা একটি দামে একমত হন, তখন তারা একে অপরের হাত শক্ত করে ধরেন। এই করমর্দন ততক্ষণ চলে যতক্ষণ না চূড়ান্ত দাম নির্ধারিত হয়। একবার হাত ছেড়ে দেওয়া এবং ‘কবুল’ বা ‘রাজি’ বলা মানে হলো চুক্তিটি আসমানে চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
এই হাটে একেকটি উটের দাম ১ হাজার ২০০ ডলার থেকে শুরু করে তার পাঁচ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। তবে ভিড় আর বিশৃঙ্খলা সামলানো সাধারণের জন্য বেশ কঠিন।
২. উপসাগরীয় দেশগুলোতে মেহেদি উৎসব

উপসাগরীয় দেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ঈদের আগের দিনটি যেন নারীদের মেহেদি উৎসব। হাতে ও পায়ে বাহারি নকশায় মেহেদি লাগানো এখানে প্রাচীন ঐতিহ্য। দুবাইয়ের ‘হেরিটেজ ফর হেননা’ বা দোহার ‘সুক ওয়াকিফ’-এর মতো জায়গাগুলোতে এসময় পেশাদার মেহেদি শিল্পীদের দারুণ ব্যস্ততা থাকে। পর্যটকরাও আনন্দের সঙ্গে এ ঐতিহ্যের অংশ হতে পারেন।
৩. ইন্দোনেশিয়ার বর্ণিল মিছিল

ইন্দোনেশিয়ায় ঈদ মানেই রাজপথে উৎসবের আমেজ। ঈদের আগের রাতে বা চাঁদরাতে সেখানে ছোট-বড় সবাই মশাল নিয়ে রাস্তায় নামে। অতীতে আগুনের মশাল বেশি থাকলেও এখন জায়গা করে নিয়েছে নিয়ন বা এলইডি বাতি।
তারা সম্মিলিত কণ্ঠে তাকবির পড়ে এবং রঙ-বেরঙের পোস্টার বা কোরবানির পশুর প্রতিকৃতি নিয়ে কুচকাওয়াজ করে। বিশেষ করে পূর্ব জাভার মালাং শহরে শিশুদের ভেড়া সেজে মিছিলে অংশ নিতে দেখা যায়।
৪. ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন

উৎসবের দিনে প্রিয়জনদের অভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে ঈদের সকালে কবরস্থানে যাওয়া একটি আবেগঘন ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের পর বছর যুদ্ধ আর দুর্যোগে অনেক মানুষ হারিয়েছে এ দেশগুলো।
তাই ঈদের নামাজের পর পরিবারগুলো কবরস্থানে গিয়ে কবর পরিষ্কার করে, ফুল দেয় এবং কোরআন তেলাওয়াত করে। এটি যেন উৎসবের দিনেও প্রয়াত আপনজনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের শোকগাথা।
৫. চীনে ধূপ জ্বালানোর রীতি

চীনের হুই মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদের রীতিতে রয়েছে স্থানীয় সংস্কৃতির ছাপ। তারা তাদের পূর্বপুরুষদের কবরে ধূপ বা আগরবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তাদের বিশ্বাস, আগরবাতির ধোঁয়া প্রার্থনার বার্তাগুলো আসমানে বয়ে নিয়ে যায়। বেইজিংয়ের প্রাচীন ‘নিউজি মসজিদ’-এ গেলে এ ইসলামি ও চীনা স্থাপত্যের অপূর্ব মিলনমেলা এবং ঈদের দিনের দৃশ্য চোখে পড়ে।
৬. নাইজেরিয়ার ‘দুরবার’ উৎসব ও বন্দুকের গুলি

আগেকার দিনে যখন ঘড়ি বা মোবাইল ছিল না, তখন প্রার্থনার সময় জানান দিতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হতো। নাইজেরিয়ার প্রাচীন কানো রাজ্যে এখনো সেই রীতি টিকে আছে। ঈদের নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজপ্রাসাদের রক্ষীরা আকাশের দিকে বন্দুকের (মাস্কেট) গুলি ছুড়ে উৎসবের সূচনা করেন।
তারপর শুরু হয় জাঁকজমকপূর্ণ ‘দুরবার ফেস্টিভ্যাল’, যেখানে রাজকীয় পোশাক পরে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় প্রদর্শন করা হয়।
৭. সেনেগালের ‘রাজকীয়’ ভেড়া

সারা বিশ্বে ভেড়া সাধারণত কোরবানির জন্যই পালন করা হয়, কিন্তু সেনেগালের ‘লাদুম’ জাতের ভেড়াগুলোর ভাগ্য একদম ভিন্ন। সাদা ধবধবে আর বিশাল শিংওয়ালা এ ভেড়াগুলোকে বলা হয় ‘ভেড়াদের ফেরারি’।
এগুলো মূলত আভিজাত্যের প্রতীক। ঈদের সময় এ ভেড়াগুলোকে কোরবানি না দিয়ে বরং অংশ নেওয়া হয় রূপ প্রতিযোগিতায়! একেকটি লাদুম ভেড়া ৭০ হাজার ডলার বা তার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হতে পারে।
সূত্র: কোঁদে নাস্ত ট্রাভেলার মিডল ইস্ট