Published : 26 Sep 2025, 01:18 AM
মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ব্রিটিশবিরোধী চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহে যে ১৪ জন নারী সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের একজন হলেন বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। তাকে বলা হয় বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘প্রথম নারী শহীদ’।
প্রীতিলতা সম্পর্কে বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী লিখেছেন, “আমাদের সুদীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার একটি অবিস্মরণীয় নাম। যে নাম বাঙালি জাতির ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই মেধাবী মেয়ে চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়ে শহীদ হয়েছিল। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করে শহীদ হওয়া এটা সহজ কথা নয়। প্রীতিলতা ছিলেন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এক অসীম সাহসী নারী।”
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ১৯১১ সালের ৫ মে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলার ধলঘাটে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন মিউনিসিপ্যাল অফিসের হেড কেরানি। মায়ের নাম প্রতিভাদেবী। তাদের পরিবারের আদি পদবি ছিল ‘দাশগুপ্ত’। পরিবারের কোনো এক পূর্বপুরুষ নবাবি আমলে ‘ওয়াদ্দেদার’ উপাধি পেয়েছিলেন, তারপর থেকে তারা ‘দাশগুপ্ত’ বাদ দিয়ে ‘ওয়াদ্দেদার’ লিখতে থাকেন।
প্রীতিলতার পিতা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার শৈশবে পিতৃহীন হয়ে আদিবাড়ি ডেঙ্গাপাড়া ছেড়ে ধলঘাট মামার বাড়িতে আশ্রয় নেন। এখানেই প্রথম বাঙালি নারী শহীদ বীরকন্যা প্রীতিলতার জন্ম হয়। মা আদর করে তাকে ডাকতেন ‘রাণী’।
প্রীতিলতার প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়। এখানে তিনি ১৯১৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। ১৯২৮ সালে প্রীতিলতা কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কসসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন (ম্যাট্রিক) পাশ করেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর ছুটিতে তিনি নাটক লিখেন। মেয়েরা সবাই মিলে চৌকি দিয়ে মঞ্চ সাজিয়ে সে নাটক মঞ্চস্থ করে।
পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় তার বিয়ের প্রস্তাব আসে। প্রীতিলতার প্রবল আপত্তিতে তা বাতিল হয়ে যায়। আইএ পড়ার জন্য তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩০ সালে আইএ পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করেন। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় পড়াশোনা শেষ করে প্রীতিলতা কলকাতার বেথুন কলেজে ভর্তি হন। তিনি দূরশিক্ষার সঙ্গে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রামের ইংরেজি নন্দনকানন গার্লস’ স্কুলের (বর্তমান নাম অপর্ণাচরণ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ) প্রধান শিক্ষিকা হন।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর স্কুলে পড়ার সময়ে শিক্ষক ঊষাদির দেওয়া ‘ঝাঁসীর রাণী’ বইটি পড়ার সময়ে তার মনে গভীর রেখাপাত করে। ১৯২৪ সালে বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স নামে এক জরুরি আইনে বিপ্লবীদের বিনাবিচারে আটক করা শুরু হয়। চট্টগ্রামের বিপ্লবীদলের অনেক সদস্য এই আইনে আটক হন। বিপ্লবীদের অস্ত্রশস্ত্র, সাইকেল ও বইপত্র গোপনে রাখার প্রয়োজন হয়। সরকার বিপ্লবীদের প্রকাশনাগুলো বাজেয়াপ্ত করে।
প্রীতিলতার নিকট-আত্মীয় পূর্ণেন্দু দস্তিদার তখন বিপ্লবী দলের কর্মী। তিনি সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত কিছু বই প্রীতিলতার কাছে রাখেন। প্রীতিলতা তখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। লুকিয়ে পড়ে ফেলেন এসব বই। এ গ্রন্থগুলোই প্রীতিলতাকে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে। প্রীতিলতা এসময় পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কাছে বিপ্লবী সংগঠনে যোগদানের গভীর ইচ্ছার কথা বলেন। তখনও পর্যন্ত বিপ্লবীদলে মহিলা সদস্য গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি নিকট আত্মীয় ছাড়া অন্য কোনো মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশাও নিষেধ ছিল।
পূর্ণেন্দু দস্তিদার সেকথা গিয়ে জানালেন দলের প্রবীণ সদস্য নির্মল সেনের কাছে। প্রীতিলতাকে বিপ্লবী দলে দীক্ষিত করার আগে পরীক্ষা করেন মাস্টারদা সূর্য সেনের সতীর্থ নির্মল সেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, “পরিবারের প্রতি টান কেমন তোমার?” অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা উত্তর দিয়েছিলেন, “টান আছে। কিন্তু ডিউটি টু ফ্যামিলিকে ডিউটি টু কান্ট্রির কাছে বলি দিতে পারব।”
তাকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে তীব্র আপত্তি ছিল মাস্টারদার। মাস্টারদা বলেছিলেন, “বিপ্লবী দলে নারী নিও না। জানো তো আমাদের জীবন কেমন? এই লড়াই ছেলেখেলা নয়। এর নাম তো শুনেছি ‘রাণী’। বাপ-মায়ের আদুরে কন্যা হবে। এজন্য অনেক সাধনা করতে হয়। তাছাড়া কতো রকম চাল আছে পুলিশের। এইভাবে গুপ্তচর ঢুকিয়ে দিতে পারে। পদবি শুনছি ‘ওয়াদ্দেদার’। কোথাকার বাসিন্দা কে জানে। দেশপ্রেমের শুধুই হুজুগ, নাকি অভিজ্ঞতা আছে কিছু?” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলেন মাস্টারদা।

শুনতে শুনতে মুখটা ক্রমশ গম্ভীর হয়ে উঠেছিল বিপ্লবী নির্মল সেনের। খেয়াল করে আলতো হাসলেন মাস্টারদা। বললেন, “রাগ করলে নির্মল?” নির্মল সেন বললেন, “আমি যাকে আনবো সে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জানবেন।” মাস্টারদা উত্তর দিলেন, “শুনি তবে তার কথা।”
শুরু করলেন নির্মল সেন, “আমাদের দলের সাথী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের সম্পর্কে বোন হয় রাণী। ভালো নাম প্রীতিলতা। চট্টগ্রামের ধলঘাট গ্রামে জন্ম। আসল পদবি দাশগুপ্ত। পূর্বপুরুষরা নবাবের কাছ থেকে ওয়াদ্দেদার উপাধি পান, তার থেকেই হয়েছে ওয়াদ্দেদার।”
একটি ঘটনা প্রীতিলতার জীবনের মোড় পালটে দিয়েছিল। চট্টগ্রামের ইন্সপেক্টর জেনারেল ক্রেগকে হত্যা করতে গিয়ে রামকৃষ্ণ বিশ্বাস চট্টগ্রামের এসডিও তারিণী মুখার্জীকে হত্যা করেন, এ কারণে তাকে ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়। তাকে আলিপুর জেলে রাখা হয়। সুদূর চট্টগ্রাম থেকে মৃত্যুর প্রহর গোনা রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করার জন্য বাড়ির লোকেরা কেউ আসতে পারেনি। তা জেনে রামকৃষ্ণের বোন সেজে অমিতা দাস নাম নিয়ে প্রীতিলতা অনেকবার তার সঙ্গে দেখা করেন। নিঃসঙ্গ ফাঁসির প্রতীক্ষারত রামকৃষ্ণের কাছে এই সাহচর্য ছিল পরম পাওয়া। তিনিই বিপ্লবী আদর্শে দীক্ষা দেন প্রীতিলতাকে।
বিপ্লবী কল্পনা দত্ত ছিলেন প্রীতিলতার ঘনিষ্ঠতম বান্ধবী। প্রীতিলতার বাড়িতে এক আলাপচারিতা প্রসঙ্গে কল্পনা দত্ত লিখেছেন, “কথা হচ্ছিল, পাঁঠা কাটতে পারব কিনা। আমি বলেছিলাম, নিশ্চয় পারব, আমার মোটেই ভয় করে না।” প্রীতি উত্তর দিয়েছিল, “ভয়ের প্রশ্ন নয়, কিন্তু আমি পারব না নিরীহ একটা জীবকে হত্যা করতে।”
অন্য একজন তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করলেন, “কী, দেশের স্বাধীনতার জন্যও তুমি অহিংস উপায়ে সংগ্রাম করতে চাও?” আমার মনে পড়ে প্রীতির স্পষ্ট জবাব, “স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতেও পারব, প্রাণ নিতে মোটেই মায়া হবে না। কিন্তু নিরীহ জীব হত্যা করতে সত্যি মায়া হয়, পারব না।”
বীরকন্যা প্রীতিলতা ১৯৩২ সালে ২৩ সেপ্টেম্বর মাস্টারদা সূর্য সেনের নির্দেশে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। শান্তি চক্রবর্তী, কালী দে, প্রফুল্ল দাস, সুশীল দে আর মহেন্দ্র চৌধুরী ছিলেন তার সহযোদ্ধা। সম্পূর্ণ পুরুষের বেশে খাকি পোশাকে প্রীতিলতা আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মাস্টারদার সহযাত্রী, পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবের বাবুর্চি বিপ্লবী আবদুল করিমের টর্চের আলোর সংকেত পেয়ে সেদিন বীরকন্যা প্রীতিলতা একটি সফল আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
বিজয়ের আনন্দে উৎফুল্ল বিজয়ীরা ফিরে আসার সময়ে হঠাৎ কোথা থেকে একটা গুলি এসে প্রীতিলতাকে আহত করে। তিনি মাটিতে লুটয়ে পড়েন। তখনও প্রাণবায়ু নিঃশেষ হয়ে যায়নি। ইংরেজ বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কা থেকে সঙ্গে থাকা পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন। ঘটনার এই সরল বর্ণনা আজকের দিনে অনেকের কাছে নাটকীয় মনে হলেও ৯৩ বছর আগে এমন একটি উদ্যোগ দুঃসাহসিকতার নামান্তর।
“মাতৃভূমির জন্য তার এ আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম বাংলার স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষেরা নতচিত্তে যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবে।” বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর এমন একটি প্রত্যাশাকে আজকের এই সভা প্রথমবারের মতো সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল বলে আমি মনে করি। বাঙালির গর্বের যে কিছু ঘটনা তার মধ্যে প্রীতিলতার ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ অবশ্যই একটি। বাঙালির গর্বের ইতিহাসে যে-কজন বীরকন্যার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো, এর মধ্যে অবশ্যই প্রথম বাঙালি নারী শহীদ প্রীতিলতা থাকবেন। এদের কারণেই তো গান্ধীজি সেদিন সগর্বে বলেছিলেন, চট্টগ্রাম সর্বাগ্রে।”
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, “ক্ষুধার্ত বাতাসে শুনি এখানে নিভৃত এক নাম/ চট্টগ্রাম: বীর চট্টগ্রাম/ বিক্ষত বিধ্বস্ত দেহে অদ্ভুত নিঃশব্দ সহিষ্ণুতা/ আমাদের স্নায়ুতে স্নায়ুতে/ বিদ্যুৎ প্রবাহ আনে, আজ চেতনার দিন/ চট্টগ্রাম: বীর চট্টগ্রাম!...”
১৯৩২-এর ২৩ সেপ্টেম্বরের পর ১৫ দিন কেটে যায়। মাস্টারদা লিখলেন তার বিষণ্ন আখ্যান ‘বিজয়া’। বিশ শতকের সশস্ত্র সংগ্রামের মহাযজ্ঞে এ বাংলা ততদিনে পেয়ে গিয়েছে তার প্রথম শহীদ কন্যাটিকে। দু’সপ্তাহ পর শারদোৎসবের শেষে উপস্থিত হয়েছে বিজয়া। মায়ের বিদায়ের ক্ষণ। মাস্টারদা লিখলেন, “পনেরো দিন আগে যে নিখুঁত পবিত্র, সুন্দর প্রতিমাটিকে এক হাতে আয়ুধ, অন্য হাতে অমৃত দিয়ে বিসর্জন দিয়ে এসেছিলাম, তার কথাই আজ সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে। তার স্মৃতি আজ সবকে ছাপিয়ে উঠেছে।
“যাকে নিজ হাতে বীর সাজে সাজিয়ে সমরাঙ্গনে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, নিশ্চিত মৃত্যুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুমতি দিয়ে এসেছিলাম, তার স্মৃতি যে আজ পনেরো দিনের মধ্যে এক মুহূর্ত ভুলতে পারলাম না। সাজিয়ে দিয়ে যখন করুণভাবে বললাম, তোকে এই শেষ সাজিয়ে দিলাম। তোর দাদা তো তোকে আর জীবনে কোনোদিন সাজাবে না। তখন প্রতিমা একটু হেসেছিল। কি করুণ সে হাসিটুকু! কত আনন্দের, কত বিষাদের, কত অভিমানের কথাই তার মধ্যে ছিল।”
প্রীতিলতার আত্মবলিদানকে ইতিহাস কখনো পরাজয়ের প্রতীক হিসেবে দেখেনি। বরং, তার আত্মদান ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের এক মহান উৎস। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নারী মানেই কেবল কোমলতা নয়; নারী মানে সাহসিকতা, নেতৃত্ব এবং দেশপ্রেমের প্রতিচ্ছবি। একজন শিক্ষিকা হিসেবে, একজন বিপ্লবী হিসেবে এবং একজন নারীর মর্যাদার প্রতীক হিসেবে প্রীতিলতা বেঁচে থাকবেন। তিনি সেই মুক্ত আকাশের স্বপ্ন, যা একদিন বাঙালির স্বাধীনতার পথে পথে ছড়িয়ে পড়েছিল।