অনূদিত গল্প
Published : 24 Dec 2025, 12:10 AM
সম্প্রতি পড়ছিলাম মণীন্দ্র দত্তের অনুবাদে ‘এডগার অ্যালান পো রচনাবলী’। পড়তে পড়তে পেলাম ‘লায়নাইজিং’ গল্পটি। পো শিশু-কিশোরদের জন্য আলাদা করে কিছু লেখেননি। তিনি মূলত লিখেছেন প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য, বিশেষ করে রহস্য, ভীতি, মানসিক অন্ধকার আর মৃত্যুচেতনার গল্প ও কবিতা। কিন্তু ‘লায়নাইজিং’ অনায়াসে যে কোন বয়সের মনস্তত্ত্বের উপযোগী।
সে আগ্রহ থেকেই অন্তর্জাল ঘেঁটে ‘দ্য পো মিউজিয়াম’ ওয়েবসাইটে পেয়ে গেলাম পুরো গল্পটি। মণীন্দ্র দত্তের অনুবাদ পড়ে যে অতৃপ্তি রয়ে গেছে তা মেটাতে গল্পটি মূল ইংরেজি থেকে নিজেই অনুবাদ করলাম শিশু-কিশোরদের জন্য।
এডগার অ্যালান পো (১৮০৯-৪৯) মার্কিন কবি, প্রাবন্ধিক ও ছোটগল্পকার। রহস্য ও রোমাঞ্চের পাশাপাশি তার লেখনিতে ব্যঙ্গাত্মক রসবোধ বিদ্যমান। ‘লায়োনাইজিং’ (১৮৩৫) গল্পটি মূলত তৎকালীন সমাজের মেকি আভিজাত্য আর সস্তা খ্যাতি বা ‘সেলিব্রিটি কালচার’ নিয়ে এক নিদারুণ পরিহাস। গল্পের নায়ক রবার্ট জোন্স তার প্রকাণ্ড নাককে পুঁজি করেই কীভাবে সমাজের ‘সিংহ’ বা নায়ক হয়ে উঠল, তারই বিচিত্র আখ্যান এটি।
আমি আসলো এমনই। মানে, একসময় বেশ বড় মাপের মানুষ ছিলাম আর কী! তবে আমি সেই বিখ্যাত ‘জুনিয়াস’ নই, কিংবা রহস্যময় কোনো মুখোশধারী মানবও নই। আমার নাম রবার্ট জোন্স, আর আমার জন্ম হয়েছিল ফাম-ফাজ নামের এক আজব শহরে।
জন্মের পর জ্ঞান হয়ে আমার জীবনের প্রথম কাজই ছিল দুহাত দিয়ে নিজের নাকটা শক্ত করে টেনে ধরা। মা তো আমার এই কাণ্ড দেখে এক্কেবারে নিশ্চিত হয়ে গেলেন, আমার মধ্যে প্রচ্ছন্ন প্রতিভা লুকিয়ে আছে। বাবা খুশিতে আত্মহারা হয়ে কেঁদেই ফেললেন আর আমাকে উপহার দিলেন ‘নোজোলজি’ বা ‘নাসিকা-তত্ত্ব’-এর ওপর একখানা ঢাউস বই। আমি হাঁটা শেখার আগেই সেই শাস্ত্র গুলে খেয়ে ফেললাম।
হ্যাঁ, খুব জলদিই আমি এই বিজ্ঞানের মাজেজা বুঝে নিলাম। আমার মাথায় গেঁথে গেল যে- কোনো মানুষের যদি তলোয়ারের মতো তীক্ষ্ণ ও খাড়া একখানা দেখার মতো নাক থাকে, তবে সেই নাক অনুসরণ করেই সে জগৎজোড়া খ্যাতি বা সিংহগিরি হাসিল করতে পারে। তবে আমি শুধু কেতাবি পড়াশোনাতেই আটকে থাকলাম না। রোজ সকালে নিজের শুঁড়টাকে ধরে জুতসই কয়েকটা হ্যাঁচকা টান দিতাম আর আধ ডজন কড়া পানীয় পেটে চালান করে দিতাম।
সাবালক হওয়ার পর একদিন বাবা আমাকে তার খাস কামরায় ডেকে পাঠালেন। গম্ভীর হয়ে বসবার পর তিনি বললেন, “বৎস রবার্ট, তোমার এই ইহলৌকিক অস্তিত্বের চূড়ান্ত লক্ষ্যটা কী?” আমি বিনীত স্বরে বললাম, “পিতা, আমার জীবনের ধ্যান-জ্ঞান সবই তো ওই নাসিকা-তত্ত্ব।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তা এই নাসিকা-তত্ত্ব জিনিসটা আসলে কী, বলতে পারবে?” আমি উত্তর দিলাম, “আজ্ঞে স্যার, সহজ কথায় একে বলে নাকের বিজ্ঞান।” বাবা এবার জানতে চাইলেন, “তা এই ‘নাক’ শব্দটার গভীর মানেটা আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারো?”
আমি মনটাকে একটু নরম করে বললাম, “বাবা, হাজারো পণ্ডিত নাকের প্রায় হাজার খানেক সংজ্ঞা দিয়ে গেছেন।” পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে দেখে নিলাম। “এখন তো কেবল দুপুর গড়িয়েছে, রাত বারোটা নাগাদ হয়তো আমি সব কটি সংজ্ঞা শেষ করতে পারব। তো শুরু করা যাক। মহান বার্থোলিনাসের মতে, নাক হলো সেই উদগত অংশ, সেই মাংসপিণ্ড, সেই উপবৃদ্ধি যাৃ”
এইটুকু বলতেই বাবা হাত তুলে আমাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বললেন, “থাক রবার্ট, থাক! তোমার এই অগাধ পাণ্ডিত্যে আমি স্রেফ থ হয়ে গেছি। সত্যি বলছি, আমি বিস্মিত!” তিনি চোখ বুজে বুকে হাত রাখলেন। তারপর আমার হাত ধরে টেনে বললেন, “যাও বাপু, তোমার শিক্ষা পূর্ণ হয়েছে। এখন তোমার নিজের কপাল তোমাকে নিজেকেই গড়তে হবে। আর তোমার জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে স্রেফ নিজের নাকটাকে অনুসরণ করা, এই যেমন এই দিকেৃ”
বলেই তিনি আমাকে একটা মোক্ষম লাথি কষিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে গড়িয়ে ফেলে দিলেন এবং বাড়ির চৌকাঠের বাইরে বের করে দিলেন। দরজার আড়াল থেকে শেষবার গর্জে উঠলেন, “বেরিয়ে যাও বাড়ি থেকে, আর আপদ বিদায় হও! আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন!”
আমি তখন নিজের ভেতরে এক স্বর্গীয় আবেশ অনুভব করছিলাম, তাই এই অপমানজনক লাথিটাকে নেহাত দুর্ঘটনা না ভেবে বরং সৌভাগ্যের ইঙ্গিত হিসেবেই ধরে নিলাম। বাবার উপদেশ শিরোধার্য করে আমি নিজের নাককে অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। রাস্তায় দাঁড়িয়েই নাকে কয়েকটা মোচড় দিলাম আর সঙ্গে সঙ্গে নাসিকা-তত্ত্বের ওপর একখানা প্রচারপত্র লিখে ফেললাম।
গোটা ফাম-ফাজ শহরে হুলস্থুল পড়ে গেল। নামী সব পত্রিকা আমাকে ধন্য ধন্য করতে লাগল। কেউ বলল- ‘অসামান্য প্রতিভা’, কেউ বলল- ‘অপূর্ব শরীরতত্ত্ববিদ’, কেউ আবার বলল- ‘গভীর চিন্তাশীল লেখক’। কিন্তু আমি ওসব প্রশংসায় একদম কান দিলাম না। আমি সোজা ঢুকে পড়লাম এক প্রখ্যাত চিত্রকরের স্টুডিয়োতে।
সেখানে ডাচেস অফ ব্লেস-মাই-সোল পোট্রেট আঁকানোর জন্য বসেছিলেন। মারকুইস অফ সো-অ্যান্ড-সো ডাচেসের কুকুরটা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর আর্ল অফ দিস-অ্যান্ড-দ্যাট ডাচেসের রূপের গুণগানে মত্ত ছিলেন। রাজপুত্র টাচ-মি-নট তো চেয়ারের পেছনে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েই ছিলেন। আমি চিত্রকরের সামনে গিয়ে আমার নাকটা একটু কুঁচকে বাঁকিয়ে ধরলাম। ডাচেস তো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেই বসলেন, “আহা, কী অপূর্ব দৃশ্য!” মারকুইস তোতলাতে তোতলাতে বললেন, “কী অদ্ভুত!” আর্ল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, আর রাজপুত্র গজরে উঠলেন, “একেবারে অসহ্য!”
চিত্রকর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই বস্তুটার জন্য আপনি কত দাম নেবেন?” আমি নির্বিকারভাবে বসে বললাম, “স্রেফ এক হাজার পাউন্ড।” চিত্রকর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “এক হাজার পাউন্ড? সত্যি?” আমি বললাম, “একেবারেই তাই।” তিনি আমার নাকটাকে আলোর সামনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “জিনিসটা নিখাদ তো?” আমি একবার নাক ঝেড়ে বললাম, “একদম খাঁটি।”
তিনি তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করে মুগ্ধ হয়ে বললেন, “অসাধারণ! সত্যিই এক দুষ্প্রাপ্য বস্তু।” ব্যাস, তিনি তখনই চেক কেটে দিলেন আর আমার নাকের একটা স্কেচ এঁকে নিলেন। আমি জার্মিন স্ট্রিটে নামী ঘর ভাড়া নিলাম এবং রাজ দরবারে আমার বইয়ের নিরানব্বইতম সংস্করণ আর আমার সেই মহামূল্যবান নাকের একটা প্রতিকৃতি পাঠিয়ে দিলাম। ফল হাতেনাতে মিলল, খোদ প্রিন্স অফ ওয়েলস আমাকে ডিনারের নিমন্ত্রণ জানালেন। রাতারাতি আমি হয়ে উঠলাম সিংহের মতোই শহরের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সেলিব্রিটি।
সেই ডিনারের মজলিশে ছিল বিচিত্র সব মানুষের মেলা। একজন প্লেটোবাদী দার্শনিক ছিলেন, যিনি পরফিরি আর প্লোটিনাস আওড়াচ্ছিলেন। একজন ছিলেন মানুষের পূর্ণতা নিয়ে পাগল, তিনি দুনিয়ার সব বড় বড় নামের উদ্ধৃতি দিচ্ছিলেন। স্যার পজিটিভ প্যারাডক্স নামে এক ভদ্রলোক গম্ভীর মুখে দাবি করলেন যে, সব বোকারাই আসলে দার্শনিক আর সব দার্শনিকই আসলে আস্ত বোকা।
কেউ আত্মার অবিনশ্বরতা নিয়ে কথা বলছিলেন, কেউ বা ধর্মতত্ত্বের মারপ্যাঁচে সবাইকে নাকানিচুবানি দিচ্ছিলেন। এমনকি এক বাবুর্চিও ছিল সেখানে, যে লাল জিহ্বার মোরগ আর বিচিত্র সব খাবারের ফর্দ শুনিয়ে সবাইকে মোহিত করছিল। মদ বিশেষজ্ঞ ও-বাম্বার তো চোখ বন্ধ করেই সেরা মদের স্বাদ আর আভিজাত্য বলে দিচ্ছিল। ফ্লোরেন্সের এক চিত্রকর আবার ছবির রঙের ব্যবহার নিয়ে পাণ্ডিত্য ঝাড়ছিলেন। এমনকি ফাম-ফাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চাঁদের হরেক দেশের হরেক নাম শুনিয়ে মাত করে দিচ্ছিলেন। একজন তুর্কি ভদ্রলোক তো দাবি করে বসলেন যে, পৃথিবীটা একটা আকাশ-নীল রঙের গরুর শিংয়ের ওপর টিকে আছে!
আর আমি? আমি শুধু নিজের কথাই বলছিলাম। আমার নাক, আমার শাস্ত্র আর আমার মহিমা, এই নিয়েই আমি মশগুল ছিলাম। মাঝে মাঝে নিজের নাকটা একটু উঁচিয়ে ধরছিলাম আর তাতেই সবাই কুপোকাত। প্রিন্স বললেন, “কী তুখোড় বুদ্ধিমান লোক মাইরি!” সবাই একবাক্যে সায় দিল। পরের দিন সকালেই ডাচেস অফ ব্লেস-মাই-সোল আমার ডেরায় এসে হাজির। আদুরে গলায় বললেন, “ওগো আমার রূপবান সোনা, আলমেক-এর জমকালো পার্টিতে আমার সঙ্গে যাবে?” আমি বললাম, “নিশ্চয়ই যাব।” তিনি চোখ টিপে জিজ্ঞেস করলেন, “নাকটা নিয়ে আসবে তো?” আমি হেসে বললাম, “নাক ছাড়া কি আর আমি আছি?”
আলমেক-এর সেই হলরুম ছিল ভিড়ে ঠাসা। আমার আসার খবর পাওয়া মাত্রই শুরু হয়ে গেল হুটোপুটি। সিঁড়িতে কানাকানি হতে লাগল, “ওই তো তিনি আসছেন! তিনি এসে গেছেন!” ডাচেস তো আমাকে দেখা মাত্রই দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন এবং সবার সামনে আমার নাকের ওপর তিন-তিনবার চুমু খেলেন। ব্যস, মুহূর্তের মধ্যে যেন বোমা ফাটল! বিদেশি কন্যারা আর রাজপুরুষেরা অপমানে আর ঈর্ষায় ফেটে পড়লেন।
আমি তো রেগে লাল হয়ে ইলেক্টর অফ ব্লাডেন্নাফকে বলে বসলাম, “আপনি একটা আস্ত বেবুন!” তিনি ফুঁসতে ফুঁসতে ডুয়েলের চ্যালেঞ্জ দিলেন। পরের দিন ভোরেই লড়াই হলো। আমি মোক্ষম নিশানায় একটা গুলি চালিয়ে তার আস্ত নাকটাই উড়িয়ে দিলাম!
বিজয়ীর বেশে বন্ধুদের কাছে গেলাম বাহবা পাবো বলে। কিন্তু কোথায় কী! তারা আমাকে ‘গাধা’, ‘পাগল’ আর ‘উল্লুক’ বলে গালাগাল দিয়ে পাড়া থেকে বিদায় করে দিল। অপমানে জজ্বরিত হয়ে আমি শেষমেশ বাবার কাছে ফিরে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “বাবা, আমার জীবনের আসল সার্থকতা তবে কোথায়?”
বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বৎস, সার্থকতা তো সেই নাসিকা-তত্ত্বেই ছিল। কিন্তু তুমি ওই ইলেক্টরের নাকে গুলি চালিয়ে নিজের কপালেই কুড়াল মেরেছ। তোমার একখানা বড় আর সুন্দর নাক আছে বটে, কিন্তু এখন ওই বেচারা ব্লাডেন্নাফের তো কোনো নাকই অবশিষ্ট নেই! আমাদের এই ফাম-ফাজ শহরে যার নাক যত বড়, তার কদর তত বেশি- এটা যেমন সত্যি, তেমনই এটাও সত্যি যে, যার কোনো নাকই নেই, তার সঙ্গে আভিজাত্যের লড়াইয়ে জেতার সাধ্য আর কার হতে পারে? সে-ই তো এখন শহরের সবচেয়ে বড় হিরো!”