ভ্রমণগদ্য
Published : 27 Nov 2025, 12:53 PM
জাফলং ভ্রমণ দিয়ে মেঘালয়ের স্বপ্ন দেখার শুরু সেই ১৯৮৩ সালে। তখন জাফলং আজকের মতো এতো পরিপাটি ছিল না; পাথর পরিবহনের ট্রাক, বারকি নৌকার জট আর ক্রাশিং মেশিন ঠেলে সৌন্দর্য দেখতে হতো। অবশ্য তখন বোমা মেশিনের উপদ্রব ছিল না। দূর থেকে ডাউকি ব্রিজ আর ভারতের অংশে গাড়ির ছুটে চলা দেখে খুব মন খারাপ হতো। ভাবতাম, আহা! যদি একবার ওই পারে যাওয়া যেত!
কিন্তু ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্র, যাকে টিউশনি করে পড়ার খরচ জোগাতে হয়, তার পক্ষে ওই স্বপ্নের রাশ ধরে রাখা ছাড়া আর কী করার থাকে? পরবর্তী সময়ে বহুবার জাফলং গিয়েছি, ওপারের পাহাড় দেখেছি, কিন্তু মনকে বুঝিয়েছি, একদিন মেঘালয়ে যাবই। স্বপ্ন আর ইচ্ছে মিলে গেলে সফল হওয়া যায়, এটাই সত্যি। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো ২০২৪ সালে। পহেলা মে থেকে আমার ‘পোস্ট রিটায়ারমেন্ট লিভ’ (পিআরএল) শুরু হলো। মাসখানেকের মধ্যেই ভিসা হয়ে গেল।
প্রথমে কলকাতা যাওয়ার কথা ভাবলেও প্রচণ্ড গরমের খবরে সিদ্ধান্ত পালটালাম। মেঘালয়ে তখন বৃষ্টি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের মোক্ষম সময়। আমার দুই কন্যা এবং তাদের বন্ধু সুস্মিতার পরিবার, এই দুই পরিবার মিলে ঠিক করলাম, ১৬ জুন ২০২৪ আমরা তামাবিল সীমান্ত দিয়ে মেঘের দেশে পা রাখব। ১৫ জুন রাতে এনা পরিবহনের বাসে সিলেট যাত্রা করে পরদিন ভোরে হুমায়ুন চত্বরে নেমে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। নাস্তা শেষ করে তামাবিলের পথে যখন যাত্রা শুরু করলাম।

আকাশ তখন মেঘলা। হরিপুর পার হতেই টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হলো। দূরের মেঘালয় পাহাড়ও মাথায় মেঘ নিয়ে হাতছানি দিচ্ছিল। তারপর সীমান্তের আনুষ্ঠানিকতা, স্বপ্নের পথে যাত্রা তামাবিল বর্ডারে ইমিগ্রেশনের কাজ সারতে খুব বেশি সময় লাগল না। সীমান্ত অতিক্রম করতে গিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো, এই প্রথম ভারতের মাটিতে পা রাখা। ইমিগ্রেশন শেষে আমাদের পুরো ট্রিপের গাইড-কাম-চালক শ্যামের সঙ্গে দেখা হলো। সে তার চকচকে হলুদ রঙের মাহিন্দ্র বলেরো গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত ছিল। হালকা বৃষ্টির মধ্যেই আমরা ডাউকি বাজারের দিকে ছুটলাম। ডাউকি বাজারে টাকা ভাঙিয়ে নিয়ে আমাদের মূল যাত্রা শুরু হলো।
ডাউকি ব্রিজের আগেই দেখা মিলল প্রথম ঝরনা বা জলপ্রপাতের। প্রচুর জল নামছে, সঙ্গে তুমুল শব্দ। ডাউকি ব্রিজে ওঠার পর বামে বাংলাদেশের জাফলং আর ডানে উমগট নদীর স্বচ্ছ জলরাশি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলা রাস্তায় একটু এগোতেই ‘উমক্রেম ফলস’-এর দেখা পেলাম। বর্ষায় এর রূপ ভয়ঙ্কর সুন্দর। অসীম জলরাশি আর জলকণার দাপট। সেখানে আনারস আর কলা খেয়ে আমরা ছুটলাম পরের গন্তব্যে।
পরের গন্তব্য ছিল ‘বরহিলস ফলস’, যা আমাদের দেশের ‘পানথুমাই ফলস’ নামে পরিচিত। বর্ষায় চেরাপুঞ্জির ফলসগুলোর রূপই আলাদা- হিংস্র গতি, তীব্র জলকণা আর ভয়ঙ্কর শব্দ। বরহিলস দেখেও স্তম্ভিত হতে হলো। নিচে বাংলাদেশের সবুজ সৌন্দর্য আর ওপরে পাহাড় থেকে নেমে আসা জলধারা।
এরপর আমরা পৌঁছলাম এশিয়ার অন্যতম ‘পরিচ্ছন্ন গ্রাম’ মাওলিনং-এ। গ্রামটি অদ্ভুত সুন্দর, সবুজ গাছগাছালি আর ফুলে পরিপূর্ণ। প্রতিটি বাড়ি সাজানো-গোছানো, নির্দিষ্ট দূরত্বে বাঁশের তৈরি ময়লা ফেলার ঝুড়ি। দুপুরের খাবার খেলাম গ্রামেরই এক পরিচ্ছন্ন বাড়িতে। ভেজ থালির স্বাদ ছিল অমৃতের মতো। বিকেল পর্যন্ত গ্রাম ঘুরে, ট্রি-হাউজ আর গির্জা দেখে আমরা রিওয়াই গ্রামের লিভিং রুট ব্রিজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। খরস্রোত নদীর ওপর জীবন্ত রাবার গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি এই সেতু প্রকৃতির এক বিস্ময়। ঝুম বৃষ্টিতে নদীর গর্জন শুনতে শুনতে আমরা সেখান থেকে ফিরে এলাম।
মেঘ ছুঁয়ে চেরাপুঞ্জির পথে সন্ধ্যা নামার আগেই আমাদের গাড়ি চেরাপুঞ্জি বা সোহরার পথে ছুটল। বৃষ্টি ঝরছেই, কখনো জোরে, কখনো ইলশেগুঁড়ি। মেঘ দিব্যি গাড়ির এক জানালা দিয়ে ঢুকে অন্য জানালা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। পথে এক পাহাড়ি ক্যাফেতে গরম মোমো আর কফি খেয়ে ক্লান্তি দূর করলাম। রাত নটার দিকে রাস্তার পাশের এক রেস্টুরেন্টে ডিনার সেরে আমরা পৌঁছলাম আমাদের হোমস্টে ‘জোহালেজ’-এ। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা আর ক্লান্তি নিয়ে কম্বলের নিচে উষ্ণ আশ্রয় নিতেই ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম।
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙল মেঘলা আকাশ আর হালকা বৃষ্টি দেখে। হোমস্টের ছাদ থেকে চারপাশের সবুজ পাহাড়, দূরে গির্জার চূড়া আর পাহাড়ি রাস্তা দেখে মন ভালো হয়ে গেল। নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লাম চেরাপুঞ্জির দর্শনীয় স্থানগুলোর উদ্দেশ্যে। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল বিখ্যাত নোহকালিকাই জলপ্রপাত। এক হাজার ১১৫ ফুট উঁচু এই জলপ্রপাতের সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি এর পেছনের করুণ ‘কা লিকাই’-এর কিংবদন্তিও শুনলাম শ্যামের মুখে।

স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, লিকাই নামের এক নারী তার দ্বিতীয় স্বামীর ঈর্ষার শিকার হয়ে নিজের অজান্তেই তার কন্যার মাংস খেয়ে ফেলেছিলেন। সত্য জানার পর উন্মাদ হয়ে তিনি এই জলপ্রপাত থেকে ঝাঁপ দেন। সেই থেকে এর নাম নোহকালিকাই। জলপ্রপাতের গর্জনে যেন সেই মায়ের কান্না মিশে আছে।
এরপর গেলাম তিন ধাপের কাইনরেম জলপ্রপাতে। চেরাপুঞ্জি থেকে প্রায় বারো কিলোমিটার দূরে এই ফলস। তুমুল বৃষ্টি আর বাতাসের দাপটে দাঁড়ানোই দায়, তবুও প্রায় এক হাজার ফুট ওপর থেকে নেমে আসা এই জলপ্রপাতের দৃশ্য ভোলার নয়। সেখান থেকে থাংখারাং পার্ক। পার্কের ভিউ পয়েন্ট থেকে কাইনরেম ফলস আর বাংলাদেশের সমতল ভূমির যে দৃশ্য দেখা যায়, তা এক কথায় অপার্থিব। এরপর সেভেন সিস্টার্স ফলসে গিয়ে অবশ্য কিছুটা হতাশ হতে হলো, ঘন মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছিল তার রূপ। কেবল গর্জন শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো।
তবে সেই আক্ষেপ ঘুচল মাওসামি কেভে গিয়ে। চুনাপাথরের তৈরি এই প্রাকৃতিক গুহার ভেতর দিয়ে হাঁটা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। সরু পথ, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, ওপর থেকে চুইয়ে পড়া পানি আর অদ্ভুত সব ফসিল আকৃতির পাথর, সব মিলিয়ে এক অন্য জগৎ। গুহা থেকে বেরিয়ে স্থানীয় খাসি পোশাকে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখল সবাই। দুপুরে চেরাপুঞ্জির এক ক্যাফেতে আড্ডা আর খাওয়া শেষে বিকেলে পৌঁছালাম সোহরা প্লাজা রিসোর্টে। রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড় আর বাড়িঘরের আলো দেখে মনে হলো যেন নক্ষত্ররাজি নেমে এসেছে পৃথিবীতে।
পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে রোমাঞ্চ তৃতীয় দিনের শুরুটা হলো আরওয়া কেভ দিয়ে। জনমানবহীন সকালে জঙ্গলের পথ মাড়িয়ে গুহার দিকে যাওয়াটা ছিল এক বড় অ্যাডভেঞ্চার। পথের ধারের ভিউ পয়েন্ট থেকে দেখা ঝরনা আর মেঘের দৃশ্য ছিল অনবদ্য। গুহার ভেতরের নিস্তব্ধতা আর আদিম গন্ধ আমাদের শিহরিত করেছিল। এরপর একে একে দেখলাম ওয়াকারা ফলস, যেখানে জনশ্রুতি আছে দুটি পরি বাস করে। তারপর প্রুত জলপ্রপাত, যেখানে মূল সড়ক থেকে ট্রেকিং করে নামতে হয়।
মাওকডোক ডিম্পেপ ভ্যালিতে গিয়ে মনে হলো পাহাড়ের বিশালতার কাছে আমরা কত ক্ষুদ্র! দুপাশে পাহাড় সারি চলে গেছে যতদূর চোখ যায়, মাঝখানে গভীর উপত্যকা। এখানে ম্যাগি আর চা খেয়ে আমরা শিলংয়ের পথ ধরলাম। শিলং শহরে ঢোকার মুখেই এলিফ্যান্ট ফলস। তিন ধাপের এই জলপ্রপাতটি খুব সুন্দরভাবে সংরক্ষিত। ব্রিটিশরা এখানে হাতির মতো দেখতে একটি পাথর দেখে এর নাম দিয়েছিল, যদিও সেই পাথর ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু নামটি রয়ে গেছে। সবুজে ঘেরা এই জলপ্রপাতের প্রতিটি ধাপে গিয়ে এর সৌন্দর্য উপভোগ করলাম।
সন্ধ্যায় শিলং পৌঁছেই পুলিশ বাজারের জমজমাট পরিবেশ। স্ট্রিট ফুড, কেনাকাটা আর আলোকোজ্জ্বল শহর, শিলংয়ের সন্ধ্যা মানেই উৎসব। রাতে থাকলাম ‘লাতেই ভিলা ইন’-এ। পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত এই হোমস্টের বারান্দা থেকে রাতের শিলং শহরকে মায়াবী মনে হচ্ছিল। শিলংয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য চতুর্থ দিনের সকাল শুরু হলো ডন বসকো মিউজিয়াম দিয়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সংস্কৃতিকে জানার এক দারুণ জায়গা এটি। সাত তলা এই মিউজিয়ামের ছাদে উঠে পুরো শিলং শহরকে পাখির চোখে দেখা যায়।
এরপর গেলাম ওয়ার্ডস লেক-এ। শহরের মাঝখানে ঘোড়ার নালের আকৃতির এই কৃত্রিম হ্রদটি এক টুকরো শান্তির জায়গা। হ্রদের ওপর কাঠের সেতু আর চারপাশে ফুলের বাগান, সব মিলিয়ে এক চমৎকার পরিবেশ। লেডি হায়দারি পার্ক মেরামতের কাজ চলায় খুব একটা দেখা হলো না, তবে মেরি হেলপ অফ খ্রিস্টান ক্যাথেড্রাল চার্চের বিশালতা আর স্থাপত্যশৈলী মনে দাগ কেটেছে। ১৯৩৬ সালে নির্মিত এই ক্যাথেড্রালটি ভূমিকম্প সহনশীল করে তৈরি; এর ভিত্তিপ্রস্তর বালির ওপর স্থাপন করা হয়েছে যাতে ভূমিকম্পের সময় এটি দুলতে পারে, কিন্তু ভেঙে না পড়ে।
নীল রঙের গির্জা আর রঙিন কাচের জানালায় যিশুর জীবনের নানা চিত্র খোদাই করা। গির্জার গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ আমাদের মুগ্ধ করল। রাতে হোটেল রেইনবোতে চেক-ইন করে বিশাল মার্টে কেনাকাটা করলাম এবং এক সিলেটি দিদির নিরামিষ হোটেলে তৃপ্তিসহকারে রাতের খাবার খেলাম।
বিদায়ের সুর বাজলো পঞ্চম দিন, ২০ জুন। ফেরার পালা। শেষ গন্তব্য ছিল লাইটলুম ক্যানিয়ন। শিলং থেকে প্রায় বাইশ কিলোমিটার দূরে এই জায়গাটি মেঘের আনাগোনার জন্য বিখ্যাত। কিন্তু ঘন কুয়াশা আর বৃষ্টি আমাদের হতাশ করল। দশ হাত দূরের কিছুও দেখা যাচ্ছিল না। অগত্যা মেঘ আর কুয়াশাকে বিদায় জানিয়ে ডাউকির পথ ধরলাম। ডাউকি ব্রিজের ওপর থেকে শেষবারের মতো উমগট নদী আর ওপারের বাংলাদেশকে দেখলাম। ফেরার পথে চেরাপুঞ্জি-ডাউকি রোডের বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের নয়নাভিরাম দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করলাম।
ডাউকি বাজারে শেষবারের মতো কিছু কেনাকাটা আর খাওয়া-দাওয়া সেরে ইমিগ্রেশন পার হলাম। গাইড শ্যামের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। তার সততা আর আন্তরিক সেবা আমাদের ভ্রমণকে আরও সুন্দর করে তুলেছিল। ইমিগ্রেশন শেষ করে যখন বাংলাদেশে ঢুকলাম, তখন সন্ধ্যা নামছে। পেছনে ফেলে এলাম মেঘ, পাহাড় আর ঝরনার এক মায়াবী জগৎ। চারদিনের এই আনন্দভ্রমণ শেষে আবার সেই যান্ত্রিক জীবনে ফেরা। কিন্তু বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা মেঘালয়ের এই স্মৃতিগুলো আজীবন সতেজ হয়ে থাকবে।