Published : 04 Aug 2025, 12:17 AM
তারিখটি ছিল পহেলা অগাস্ট, ১৯৭১। যারা সেদিন নিউ ইয়র্কে ছিলেন, কিংবা খোদ ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনের ভেতরে ছিলেন, তাদের জন্য তো অবশ্যই; কিন্তু আমরা যারা অবরুদ্ধ বাংলাদেশে ছিলাম, তাদের জন্যও কি যে উদ্বেলিত ছিল দিনটি, তা অবিস্মরণীয়।
সে বেলায় এ দিনটিকে দেখেছিলাম একজন ২০ বছরের টগবগে তরুণ হিসেবে, আজ ৫৪ বছর পরে ফিরে তাকাচ্ছি একজন প্রাজ্ঞ মানুষ হিসেবে। কী ছিল সেই দিনটায়? বাংলাদেশ তখন তার মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ লড়ছে। সে লড়াই স্বাধীনতার লড়াই, মুক্তির যুদ্ধ। পাকিস্তানি হানাদারেরা বসিয়েছে তাদের মরণকামড়। অত্যাচারে, ধ্বংসে জর্জরিত এ দেশ, কিন্তু সে রুখে চলছে।
তখন তার বড় প্রয়োজন বৈশ্বিক সহযোগিতার। বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্রগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিচ্ছিল বটে, কিন্তু তখন পর্যন্ত কোন দেশ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। জাতিসংঘে আলোচনা হয়েছে বটে, কিন্তু পাকিস্তানকে রুখতে পারেনি এই বিশ্বসংস্থা।
আর তখনই ঘটল ১৯৭১ সালের পহেলা অগাস্ট নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। এখন ভাবতে অবাক লাগে তখন বহুদিন ধরে বিদেশে বিভিন্ন সরকারি নথিপত্র ও সংবাদমাধ্যমে ইংরেজিতে বাংলাদেশকে ‘বাংলা দেশ’ লেখা হতো।

কী ছিল ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’? বিশ্বের একগুচ্ছ খ্যাতনামা সঙ্গীতশিল্পী একত্রিত হয়েছিলেন দু’দিনব্যাপী একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ভারতের শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত এক কোটি শরণার্থীর স্বপক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য।
কে ছিলেন না সেখানটায়? ছিলেন বিটলখ্যাত জর্জ হ্যারিসন, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, বব ডিলান, পণ্ডিত আলী আকবর খান, আল্লা রাখা, রিঙ্গো স্টার, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রেস্টন ও লিয়ন রাসেলসহ অনেকেই, তারকাখচিত তালিকা। একটি অমোঘ মুহূর্তে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আবির্ভূত হয়েছিল এক ঐশ্বরিক আশীর্বাদের মতো।
‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আমাদের মুক্তি সংগ্রাম তিনটি বড় কাজ করেছিল। প্রথমত: এতজন জননন্দিত বিশ্বখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীর যূথবদ্ধ সমর্থন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে নতুন উন্মাদনা ও নতুন বেগ সৃষ্টি করেছিল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিল্পীদের সমন্বয় এ উদ্যোগ এই প্রয়াসকে একটি সর্বজনীন মাত্রা দান করেছিল, যাকে উপেক্ষা করার শক্তি কারো ছিল না।
দ্বিতীয়ত: এই উদ্যোগ বাংলাদেশের স্বপক্ষে একটি বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। বহু কূটনৈতিক প্রয়াস যখন এই কাজটি করে উঠতে পারছিলো না, তখন সৃষ্টিশীল এই শৈল্পিক অনুষ্ঠানটি সে কাজটি অত্যন্ত সুচারুভাবেই করতে পেরেছে। একটি দেশের মুক্তি সংগ্রামে বিশ্বসমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং সেই প্রেক্ষিতে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এর ভূমিকা অনন্য।

তৃতীয়ত: সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে চেনানো, এর মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একটি জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর ভূমিকা ছিল অনন্য। সেইসঙ্গে শরণার্থীদের প্রতি মনোযোগ ফিরিয়ে এ অনুষ্ঠান একদিকে যেমন পাকিস্তানি অত্যাচারকে জনসমক্ষে তুলে ধরতে পেরেছিল, তেমনি অন্যদিকে শরণার্থী সেবা এবং তার অর্থায়নের বিষয়টিতেও সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছিল। এরফলে শুধু যে দানসামগ্রী শরণার্থী শিবিরে গেছে তাই নয়, বহু তরুণ স্বেচ্ছাসেবকও কাজ করতে ভারতের নানা শরণার্থী শিবিরে গেছেন।
সরাসরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করা ভিন্নও ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ তিনটি সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এক: একটি মুক্তিসংগ্রাম শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না। সঙ্গীত, সাহিত্য ও চিত্রকলাও তাতে বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে। দুই: কোন যুদ্ধই একা করা যায় না, বন্ধুশক্তির সমর্থন সেখানে অপরিহার্য। তিন: একটি সুকাজ পুরোনো বন্ধুদের আবার যূথবদ্ধ করে। যেমন, এ উপলক্ষ্যে জর্জ হ্যারিসন ও রিঙ্গো স্টার ৫ বছর পরে একত্রে অনুষ্ঠান করেছেন।
১৯৭১ সালের পহেলা অগাস্টের সূত্র ধরে একই নামে পরবর্তী সময়ে তিনটি দীর্ঘবাদন ঘনশ্রুতি রেকর্ডের একটি অ্যালবামের জন্ম হয়। একাত্তরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বিজয়ের মাসে যুক্তরাষ্ট্রে তা প্রকাশিত হয়। তারপর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে তা যুক্তরাজ্যে বেরোয়। এই অ্যালবামটিও স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের স্বপক্ষে জনমত গড়ে তোলে, যা নব্য স্বাধীনতালব্ধ এ দেশটির স্বীকৃতির পথটি সুগম করেছিল।

এ বছর ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর ৫৪ বছর পূর্ণ হল। তিনটি কথা দিয়ে শেষ করি। এক: এ অনুষ্ঠানটি পরবর্তীসময়ে বহু মানবতার স্বপক্ষের অনুষ্ঠানের অগ্রপথিক হিসেবে কাজ করেছে। যেমন, ১৯৮৫ সালে ‘লাইভ এইড’ কিংবা ২০০১ সালের ‘দ্য কনসার্ট ফর নিউ ইয়র্ক সিটি’। দুই: বিশ্বের যে কোন জায়গায় মানবতার সংগ্রামে আমরা যেন বিপন্নের পাশে দাঁড়াই। এবং তিন: আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের আমরা যেন বিস্মৃত না হই।