Published : 11 Jun 2026, 02:35 PM
বিশ্বে প্রতি ৭০ জনে একজন বা অন্তত ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে আছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশন (ইউএনএইচসিআর) ।
তবে ১০ বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কমেছে। কিন্তু বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কমলেও দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী সংকট কাটেনি।
দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতির শিকার শরণার্থীদের সংখ্যা এখনো উদ্বেগজনকভাবে বেশি বলে ইউএনএইচসিআর এর বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে; খবর রয়টার্সের।
সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ সালে সংঘাত ও নিপীড়নের কারণে ৫৪ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে শরণার্থী বা শরণার্থী সদৃশ পরিস্থিতিতে থাকা মানুষের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ১৬ লাখে। এদের মধ্যে ফিলিস্তিনি শরণার্থী ৬০ লাখ।
একই সময়ে প্রায় এক কোটি ৪৭ লাখ শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষ নিজ দেশে বা এলাকায় ফিরে গেছেন। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় ৪৯ শতাংশ বেশি এবং ১৯৬৫ সালের পর ইউএনএইচসিআর এর রেকর্ড করা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা।
ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের ৯২ শতাংশই ছয়টি দেশের নাগরিক। দেশগুলো হল ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (৩৬ লাখ), সুদান (৩৫ লাখ), সিরিয়া (৩৩ লাখ), আফগানিস্তান (২০ লাখ), ইউক্রেন (৭১৮৩০০) ও মিয়ানমার (৪১৫২০০) ।
তবে ফিরে যাওয়া ব্যক্তিরা অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। সেখানে মৌলিক পরিষেবাগুলোর অভাব, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং চলমান নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে; যা এই প্রত্যাবর্তনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছ।
২০২৫ সালে প্রায় ২৯ লাখ আফগান নাগরিক দেশে ফিরে গেছেন, যার মধ্যে ১৯ লাখই শরণার্থী। এই সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি।
মূলত প্রতিবেশী ইরান ও পাকিস্তানের কঠোর নীতির কারণে তারা ফিরতে বাধ্য হয়েছেন আর অনেকের মতে ফিরে আসা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় ছিল না।
এই ব্যাপক প্রত্যাবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে আফগান শরণার্থীর সংখ্যা ২০২৪ সালের ৫৮ লাখ থেকে কমে ২০২৫ সালে ৩৭ লাখে নেমে এসেছে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বাস্তুচ্যুতি সংকটে থাকা সিরিয়ায় ২০২৫ সালে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ ফিরে গেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর ফলে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বজুড়ে সিরীয় শরণার্থীর সংখ্যা ৬০ লাখ থেকে কমে ৪৭ লাখে দাঁড়িয়েছে।
তবে ফিরে আসা ব্যক্তিদের অনেকেই নিরাপত্তাহীনতা, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা, সীমিত পরিষেবা ও কর্মসংস্থান এবং দেশের কিছু অংশে চলমান বিক্ষিপ্ত সহিংসতার মতো গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।
প্রতিবেদনটিতে মিয়ানমারে ৪ লাখ ১৫২০০ শরণার্থী বা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষ নিজ দেশে বা এলাকায় ফিরে গেছেন বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে তারা রোহিঙ্গা না অন্য শরণার্থী না অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক বাহিনীর সহিংস দমনপীড়নের মুখে দেশটির রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাড়ে সাত লাখেরও বেশি মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে আসে, তারপর থেকে সংখ্যাটি বাড়তে থাকে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বশেষ তথ্যে বাংলাদেশের নথিবদ্ধ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লাখ ৬০০০ বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাস্তুচ্যুতির প্রবণতাকে প্রভাবিত করেছে। ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে ইরানে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
অন্যদিকে ২ মার্চ হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলা ও এলাকা ছেড়ে যাওয়ার আদেশের কারণে লেবাননে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
ইউএনএইচসিআর জানায়, বিশ্বব্যাপী ৭০ শতাংশ শরণার্থীই পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় ধরে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছে। মানবিক সহায়তার প্রয়োজন এমন দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থীদের সংখ্যা ২০৩৫ সালের মধ্যে অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি।
মূলত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার সুযোগ তৈরি এবং স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন উৎসাহিত করার মাধ্যমে শরণার্থীদের স্বাবলম্বী করে সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চায় তারা।
ইউএনএইচসিআর-এর হাইকমিশনার বারহাম সালিহ বলেন, আশ্রয় ও সুরক্ষা বিতর্কের ঊর্ধ্বে হলেও লাখ লাখ শরণার্থী জীবন পুনর্গঠনের বাস্তব আশা ছাড়া বছরের পর বছর আটকে থাকবে, এমন ভবিষ্যৎ মেনে নেওয়া যায় না।