Published : 13 Jan 2026, 11:47 AM
মিশর বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মমি আর গিজার সুবিশাল পিরামিড। কিন্তু এই প্রাচীন সভ্যতা কেবল রহস্যময় সব স্থাপত্যই রেখে যায়নি, তারা উপহার দিয়েছে আধুনিক শাসনব্যবস্থার এক বাস্তবসম্মত কিন্তু কিছুটা অস্বস্তিকর অনুষঙ্গ, আর তা হলো ‘কর’ বা ট্যাক্স।
আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে, খ্রিস্টপূর্ব ৩ হাজার অব্দ নাগাদ যখন প্রথম রাজবংশ উচ্চ ও নিম্ন মিশরকে একত্রিত করে, তখনই জন্ম নেয় পৃথিবীর প্রথম সুসংগঠিত কর ব্যবস্থা। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার যেসব মূলনীতি আমরা আজ দেখি, তার অনেক কিছুরই গোড়াপত্তন হয়েছিল নীল নদের তীরে।
রাষ্ট্র পরিচালনা, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিশাল সব রাজকীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন কিংবা ভিনদেশি যুদ্ধ জয়, সবকিছুর জন্যই দরকার ছিল প্রচুর অর্থের। আর এই অর্থের জোগান আসত জনগণের কাছ থেকে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশরবিদ টবি উইলকিনসনের মতে, গত পাঁচ হাজার বছরে মানব সমাজের মৌলিক ভিত্তি খুব একটা বদলায়নি। প্রাচীন মিশরে উদ্ভাবিত শাসন ও নিয়ন্ত্রণ কৌশলগুলো আজও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রায় একই রূপে টিকে আছে।
প্রাচীন মিশরের অধিকাংশ সময়ে কর নেওয়া হতো পণ্য আকারে। শস্য, বস্ত্র, গবাদি পশু কিংবা শ্রম ছিল করের প্রধান মাধ্যম। তবে মজার ব্যাপার হলো, সেই আমলেও কর নির্ধারণ করা হতো কৃষিজমির উৎপাদন ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে, যা অনেকটা আজকের প্রগতিশীল আয়কর ব্যবস্থার মতো। জমির উর্বরতা আর মাটির গুণাগুণ অনুযায়ী করের হার ভিন্ন হতো। আর এই পুরো হিসাবটি মূলত নির্ভর করত নীল নদের জোয়ারের ওপর।
এলিফ্যান্টাইন দ্বীপসহ বিভিন্ন স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ‘নাইলোমিটার’ নামে এক বিশেষ ধরনের সিঁড়ি বা পরিমাপ যন্ত্র খুঁজে পেয়েছেন। নদের জলস্তর নির্দিষ্ট সীমার ওপরে গেলে যেমন ফসল নষ্ট হওয়ার ভয় থাকত, তেমনি নিচে নেমে গেলে দেখা দিত খরা। এই দুই পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই সরকার সেই বছরের করের হার নির্ধারণ করত। উইলকিনসনের ভাষায়, মিশরের অর্থনীতি ছিল কৃষিভিত্তিক এবং নীল নদের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল। নদের জলস্তর মাপার এই প্রথা থেকেই মূলত আদি কর ব্যবস্থার সূচনা।
কেবল পণ্য নয়, প্রাচীন মিশরে শ্রমও ছিল করের অংশ। একে বলা হতো ‘কর্ভি’ ব্যবস্থা। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে সাধারণ নাগরিকদের রাষ্ট্রের প্রয়োজনে শ্রম দিতে হতো। মন্দির বা পিরামিড নির্মাণ, খনি খনন কিংবা কৃষিকাজে তাদের এই শ্রম দিতে বাধ্য করা হতো। রাষ্ট্র কেবল শস্য নয়, মানুষের পেশিশক্তিকেও কর হিসেবে আদায় করত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর সংগ্রহের পদ্ধতিতে নানা বিবর্তন আসে। প্রাচীন রাজত্বের (ওল্ড কিংডম) সময় রাজারা দলগতভাবে কর আদায় করতেন। সম্রাট নিজে মাঝে মাঝে রাজ্য ভ্রমণে বেরিয়ে সরাসরি কর সংগ্রহ করতেন, যাতে স্থানীয় শাসকরা কোনো নয়ছয় করতে না পারে। একে বলা হতো ‘শেমসু হোর’ বা হোরুসের অনুসরণ। তবে মধ্য রাজত্বের (মিডল কিংডম) সময় সাক্ষরতা বাড়লে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কর আদায়ের প্রথা শুরু হয়। তখন লিপিকার বা হিসাবরক্ষকরা ঘরে ঘরে গিয়ে কার কত পাওনা, তার সুনিপুণ খতিয়ান রাখতেন।
যেখানে কর আছে, সেখানে জালিয়াতি থাকবে না, তা কী করে হয়! প্রাচীন মিশরেও কর ফাঁকি ও দুর্নীতির ব্যাপক প্রচলন ছিল। কৃষকরা শস্যের ওজন বাড়াতে ভেতরে পাথর ঢুকিয়ে দিত। এই জালিয়াতি এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, খোদ সম্রাটকে ফরমান জারি করতে হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সম্রাট হোরেমহেব এক কঠোর নিয়ম করেন, কর ফাঁকি দিলে বা দুর্নীতি করলে অপরাধীর নাক কেটে ফেলা হতো এবং তাকে নির্বাসনে পাঠানো হতো।
মিশরীয়রা ফারাওদের দেবতার দূত মানলেও কর দেওয়ার ব্যাপারে তারা মোটেও উৎসাহী ছিল না। আধুনিক কালের মতোই তারা অন্যায্য করের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করত। প্রাচীন নথিপত্রে এমন অনেক চিঠিপত্র পাওয়া গেছে যেখানে সাধারণ মানুষ বা মন্দিরের পুরোহিতরা অতিরিক্ত করের বিরুদ্ধে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে নালিশ জানাচ্ছেন।
পরবর্তীতে পারসিক বা মেসিডোনিয়ানরা যখন মিশর দখল করল, তারা মুদ্রার প্রচলন শুরু করে। এতে রাষ্ট্র পরিচালনার সুবিধা হলেও সাধারণ মানুষের অসন্তোষ আরও বাড়ে। কারণ ধাতব মুদ্রা দিয়ে কর দেওয়া ছিল তাদের জন্য আরও কঠিন। রাজনৈতিক সুবিধা পেতে কর মওকুফের চলও ছিল সেই আমলে। বিখ্যাত ‘রোসেটা স্টোন’, যা দিয়ে প্রথম হায়ারোগ্লিফিকের পাঠোদ্ধার করা হয়, তা আসলে ছিল সম্রাট পঞ্চম টলেমি কর্তৃক মন্দিরের কর মওকুফ এবং নিজের গুণকীর্তন সংবলিত এক ধরনের প্রচারপত্র। সম্রাট পুরোহিতদের সমর্থন পাওয়ার জন্য তাদের কর মওকুফ করে দিয়েছিলেন।
আধুনিক বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের কর ছাড় দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে কর মওকুফ করার যে সংস্কৃতি আমরা দেখি, তার শেকড় প্রোথিত আছে এই কয়েক হাজার বছর পুরোনো সভ্যতায়। গবেষক মোরেনো গার্সিয়ার মতে, ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে যে সম্রাটরা নির্দিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা মন্দিরের সমর্থন পেতে কর ছাড়ের অস্ত্র ব্যবহার করেছেন।
প্রাচীন মিশর আমাদের কেবল সুন্দর পিরামিড বা রহস্যময় শিল্পকলা দেয়নি, দিয়েছে শাসনের জটিল এক কাঠামো। আমরা হয়তো ভাবছি আমরা অনেক আধুনিক ও ডিজিটাল যুগে বাস করছি, কিন্তু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি আর কর আদায়ের কৌশলের দিক থেকে আমরা এখনো সেই ব্রোঞ্জ যুগের কাঠামোতেই আটকে আছি। কর নিয়ে জনগণের আজকের মানসিক চাপ আসলে সেই নীল নদের ধারের আদিম প্রশাসনিক চিন্তারই এক আধুনিক উত্তরাধিকার।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন