Published : 26 Aug 2025, 10:53 PM
তিন দশক পরে হতে যাওয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-জাকসু নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, তা কোনো কোনো ছাত্রসংগঠন ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখছে।
তবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করেন, স্বায়ত্তশাসিত ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনী মোতায়েন ‘বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক’। তারা এই প্রশ্নও তুলেছেন, নিরাপত্তা ঘাটতির কোন প্রেক্ষাপটে প্রশাসন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
২০ অগাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে নির্বাচনের সময় ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে চিঠি দিলেও মঙ্গলবার পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান। খুব শিগগির এ নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে ‘নানা প্রশ্নের মধ্যেই’ ১১ সেপ্টেম্বর জাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন ঠিক করা হয়েছে। এরই মধ্যে ক্যাম্পাসে এক ধরনের ভোটের আবহ ও আমেজ তৈরি হয়েছে। যদিও ক্রিয়াশীল সব ছাত্র সংগঠন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এখনও তাদের প্যানেল ঘোষণা করতে পারেনি।
তবে ঢাকার অদূরে সাভারের এই ক্যাম্পাসে ভোটকে কেন্দ্র সেনা মোতায়েনের বিষয়টি শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা সারাদেশেই আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠেছে। কারণ, এর আগে বাংলাদেশে কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি বলেই জানাচ্ছেন সাবেক ছাত্রনেতারা।
যদিও মঙ্গলবার জাকসু নির্বাচনের দুদিন আগে ডাকসু নির্বাচনে ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে রাখার কথা জানিয়েছেন চিফ রিটার্নিং অফিসার। রাকসুতেও সেনা মোতায়েনের বিষয়টি সামনে এসেছে।
বিষয়টিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ‘ইতিবাচকভাবে’ দেখছে। পাশাপাশি ইসলামী ছাত্রশিবিরও ‘নিরাপত্তাগত দিক থেকে বিবেচনায়’ নেওয়ার কথা বলেছে। তবে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কথা বলেছে।
ছাত্র ইউনিয়নের একটি অংশ মনে করে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করলেও তাদের ক্যাম্পাসের বাইরে রাখা উচিত। আর সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রণ্টের একাংশ একে ‘প্রক্রিয়াগত ভ্রান্তি’ হিসেবে দেখছে।

নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য
সর্বশেষ জাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯২ সালে। গত বছরের ৫ অগাস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে প্রায় ৩৩ বছর পরে জাকসু নির্বাচন আয়োজনে রোডম্যাপ ঘোষণার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অন্তত দুইবার পিছিয়ে আসে। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর রোডম্যাপ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এরই ধারাবাহিকতায় ১০ জানুয়ারি একটি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করলেও নানা ঘটনার পর ৩০ এপ্রিল নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩১ জুলাই। পরে কয়েক দফা পেছানোর পর জাকসু নির্বাচনের তারিখ ঠিক করা হয় আগামী ১১ সেপ্টেম্বর।
সেই তফসিল অনুযায়ী, ১৮, ১৯ ও ২১ অগাস্ট প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেন। মনোনয়ন পত্র যাচাই-বাছাই হয় ২১ থেকে ২৪ আগস্ট এবং খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয় ২৫ অগাস্ট।
এ ছাড়া, মনোনয়নপত্রের বৈধতার বিষয়ে এবং বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন গ্রহণ করা হয় ২৬ অগাস্ট (মঙ্গলবার) সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। আপিলের শুনানি গ্রহণ করা হবে ২৭ অগাস্ট (বুধবার) সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এবং আপিলের রায় ঘোষণা করা হবে বিকাল ৪টায়।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৮ অগাস্ট (বৃহস্পতিবার) সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। সবকিছু শেষে আগামী ২৯ অগাস্ট (শুক্রবার) বিকাল ৪টায় চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানায় নির্বাচন কমিশন।
১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। একইদিনে সন্ধ্যা ৭টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
জাকসু নির্বাচনের ২৫টি পদের বিপরীতে মোট ২৯৬টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এছাড়া ২১টি হল সংসদের জন্য মনোনয়ন তুলেছেন ৪৬৭ জন।
সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত যেভাবে
২০ অগাস্ট জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ভোটগ্রহণের দিন, এর আগের দিন এবং পরের দিন সেনা মোতায়েনের জন্য সেনা প্রধানের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। মূলত সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করার কথা জানানো হয়েছে।
সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ বলেছিলেন, “রাষ্ট্রে এখন বিশেষ পরিস্থিতি চলছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীরও ম্যাজিস্ট্র্যাসি পাওয়ার আছে। নির্বাচন কমিশন সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে সেনাবাহিনী থেকে সহযোগিতা চেয়েছে। শুধু সেনাবাহিনীই না বরং পুলিশ, র্যাব, আনসারের কাছেও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।”
শিক্ষার্থীরা বলছেন, মূলত জুলাই-অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসন হলগুলো থেকে মেয়াদোত্তীর্ণদের বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। কিন্তু সেটি কার্যকর হয়নি। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের একজন নেতাকে ‘মব’ তৈরি করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
একসঙ্গে জুলাই-অগাস্টের ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিলেও সব ছাত্র সংগঠনের সহবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি বলেও অভিযোগ আছে। এ ধরনের ছোট-খাট আরও অনেক বিষয় ঘটেছে; যেগুলো মূলত নিরাপত্তার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।

‘ইতিবাচক’ ছাত্রদল, ‘পুনর্বিবেচনা’ চায় বাগছাস
ভোটের সময় সেনা মোতায়েনের বিষয়টিকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখছে ছাত্রদল। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফো ডটকমকে বলেন, “আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের আশঙ্কা আছে। আমরা এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি যে, ছাত্রলীগের যেসব সদস্য জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল তাদের অবস্থান এখনো শক্তিশালী। তাদের রুখতে এবং নাশকতা ঠেকাতে নির্বাচনকালীন সেনা মোতায়েনকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি।”
অপরদিকে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল মনে করেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা দেখেছি, একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন উপলক্ষে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
“যেহেতু এতদিন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনা মোতায়েন হয়নি, সেরকম কোনো আশঙ্কাও নেই। তাই আমরা এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি না। আমাদের মনে হয়, এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।”
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের দপ্তর সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, “প্রশাসনের এই দক্ষতা থাকা উচিত যে, তারা নিজেদের সক্ষমতা দিয়েই ক্যাম্পাসের নির্বাচনি নিরাপত্তা বজায় রাখতে পারবে। তবু তারা যদি সার্বিক প্রেক্ষাপটে জরুরি মনে করে, সেক্ষেত্রে ব্যাপারটি বিবেচনা করা যেতে পারে।”
সহাবস্থান নিশ্চিত না করার জের: ছাত্রফ্রন্ট
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল সব ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ‘সহাবস্থান ও প্রশাসনিক তদারকি’ নিশ্চিত করা গেলে নিরাপত্তার ঘাটতি থাকত না বলে মনে করেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্কসবাদী) বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক সজীব আহমেদ জেনিচ।
তার ভাষ্য, “প্রশাসন সরাসরি সেনাবাহিনীকে চিঠি দিয়েছে জাকসু চলাকালীন সময়ে নিরাপত্তা চেয়ে- এটি প্রথমত প্রক্রিয়াগত ভ্রান্তি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে উচিত ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবগত করা। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীরাও অবগত নয়, প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি।”
ক্যাম্পাসে ‘নৈতিক কারণেই’ সেনাবাহিনী দেখতে চান না বর্ণনা করে এই ছাত্রনেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রশাসন নিরাপত্তার জন্য সেনা মোতায়েন করতে চাইছে। কারণ, তারা নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংগঠনগুলোর সহাবস্থান ও প্রশাসনিক তদারকি নিশ্চিত করা গেলে কোনো বাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন পড়ত না।”
ছাত্র ইউনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার (একাংশ) সদ্য সাবেক সভাপতি অমর্ত্য রায়ের মতে, সেনাবাহিনী হলে নয়, সর্বোচ্চ ভোটের দিন ক্যাম্পাসের ফটকের বাইরে থাকতে পারে। জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া ক্যাম্পাসে তাদের প্রবেশের ‘প্রয়োজন’ নেই।

তিনি বলেন, “স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান নিয়ে আমাদের শঙ্কা আছে। তবে নিরাপত্তার জন্য সীমিত মাত্রায় বাইরে থাকাটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।”
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (বাসদ) বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক সোহাগী সামিয়া বলেন, “প্রশাসন সেনা মোতায়েনের কারণ হিসেবে নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনছে। আমরা মনে করি, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করার দায়িত্ব ছিল প্রশাসনের, সে জায়গা থেকে প্রশাসন দায়িত্বহীনতা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
“গত এক বছরে শামিম মোল্লা হত্যাকাণ্ডসহ ক্যাম্পাসে যেসব ‘মব’ তৈরি হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, অথচ এখন তারা নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি সামনে আনছে।”
‘বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’
ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনী মোতায়েন ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ বলে মন্তব্য করেছেন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মৃধা মো. শিবলী নোমান।
তিনি বলেন, “মূল প্রশ্ন হল, সেনা মোতায়েনের ভাবনাটি এল কেন? প্রশাসন কি জাকসুকেন্দ্রিক নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ? যদি তাই হয়, তবে আগে সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নির্বাচন করা যেত। কারণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক; অন্যদিকে নির্বাচন-পরবর্তী ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়েও শঙ্কা তৈরি করবে। এর কোনোটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে না।”
জাকসু নির্বাচনের ভোটার আজিজুল হাকিম জয় বলছিলেন, “একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন করতে সেনা বা বিজিবির প্রয়োজন পড়ে- এটা আসলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য লজ্জাজনক। এতে তাদের অক্ষমতা প্রমাণিত হয়। স্বায়ত্তশাসিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে সেনাবাহিনীর বিচরণ সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
“তবে সত্য হল, সহিংসতা এবং নির্বাচন ভণ্ডুল হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই প্রশাসনসহ অনেকেই চাচ্ছেন সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে হলেও নির্বাচনটা নিরাপদ ও স্বচ্ছ হোক। সেক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করতে পারে। ৩৩ বছর পর জাকসু যেন আবার হারিয়ে না যায়- এটাই গুরুত্বপূর্ণ।”
‘নিরাপত্তা ঝুঁকি অনুভব করছি’
সেনা মোতায়েনের বিষয়ে কথা হয় জাকসুর সাবেক একজন সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে। আজিজুল হাসান চৌধুরী (শাহীন) বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের হয়ে ষষ্ঠ জাকসুতে (১৯৮৮-৮৯) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তের কথা শুনে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সঙ্গে সেনা মোতায়েন সাংঘর্ষিক। প্রশাসন যদি দায়িত্ব পালন করে এবং সব সংগঠনকে নিয়ে বসে তবে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সময়ে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সব সংগঠন ঐক্যবদ্ধ ছিল। তাই সে সময় ডাকসু, রাকসু বা চাকসুতে কোনো ধরনের সেনা বা পুলিশ মোতায়েন ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছিল।”
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “দীর্ঘ ৩৩ বছর পর একটি অস্থিতিশীল সময়ে জাকসু নির্বাচন হচ্ছে। দীর্ঘদিন চেষ্টার পরেও মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করতে পারিনি। তারা বহিরাগত হিসেবে থেকে গেছে। এসব দিক বিবেচনায় আমরা নিরাপত্তা ঝুঁকি অনুভব করছি।”
তিনি বলেন, “নির্বাচনে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমরা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চাইছি। নির্বাচন কমিশন সরাসরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে পারে না, তাই প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছি। সেনাসদস্যরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবেন কি-না, সেটি সেনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর ঠিক করা হবে।”

‘বেনামে’ শিবির, ছাত্রদলের অপেক্ষা
এদিকে জাকসুকে কেন্দ্র করে প্যানেল চূড়ান্ত করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির ও বাগছাস। ছাত্রদল এখনও কোনো প্যানেল ঘোষণা করেনি।
ছাত্রশিবির ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ নামে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে। ঘোষিত প্যানেলে সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ফার্মেসি ৪৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী আরিফুল্লাহ আদিব; সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে রয়েছেন ইংরেজি বিভাগের ৪৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দপ্তর সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ৪৯ ব্যাচের ফেরদৌস আল হাসান এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে দর্শন বিভাগের ৪৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
নিজেদের নামেই পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে বাগছাস। তাদের ঘোষিত প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচন করবেন বাগছাসের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল; সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রার্থী হয়েছেন সদস্যসচিব আবু তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়াম; সহ-সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক জিয়াউদ্দিন আয়ান এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে মালিহা নামলা লড়বেন।
প্যানেল ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, “আমরা খুব শিগগিরই প্যানেল ঘোষণা করব।”
এ ছাড়া ক্যাম্পাসে বিদ্যমান বাম ছাত্র সংগঠন, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ নামে একটি প্যানেল করার কাজ চলছে বলেও কয়েকটি সংগঠনের শীর্ষ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, খুব শিগগির এ প্যানেল ঘোষণা করা হবে।
এ ছাড়া ‘গণঅভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলন’ এর আহ্বায়ক আব্দুর রশিদ জিতুর নেতৃত্বে একটি প্যানেল নির্বাচনে অংশ নেবে বলেও জানা যায়। সেটি স্বতন্ত্র প্যানেল হতে পারে; যে প্যানেলে জুলাই-গণঅভ্যুত্থানের সক্রিয় অংশগ্রহণ করবে বলে আলোচনা আছে।
জিতু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ক্যাম্পাসের যেসব শিক্ষার্থী নির্দলীয় এবং কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নন, তাদের নিয়ে আমরা একটি প্যানেল করার কথা ভাবছি। আমি নিজে সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী হচ্ছি।”
চত্বরে-চত্বরে নির্বাচনি আড্ডা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা। সাধারণত ছুটির দিন ছাড়া ক্লাস চলাকালীন দুপুরে নীরবতায় ঢেকে থাকে। দীর্ঘদিনের সেই চেনা দৃশ্যপট এবার পাল্টে গেছে। আসন্ন জাকসু নির্বাচনকে ঘিরে বটতলা এখন শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত আড্ডার কেন্দ্রস্থল।
ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে জড়ো হচ্ছেন সেখানে। আলোচনার মূল বিষয় একটাই—জাকসু।
শুধু বটতলা নয়, একই দৃশ্য ধরা পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুরাদ চত্বরে। ক্লাসের ফাঁকে সেখানে জমছে আড্ডা। একই সঙ্গে ভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদেরও দেখা যাচ্ছে পাশাপাশি বসে আড্ডা দিতে।
মঙ্গলবার বিকালে কথা হয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আমিনুর ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, “জাকসুর আগে মুরাদ চত্বরে আমাদের খুব একটা বসা হত না। জাকসু উপলক্ষে মুরাদ চত্বর এখন একটা আড্ডাস্থল হয়ে ওঠেছে। এখানে এসে কয়েকজন প্রার্থীর সঙ্গে দেখা হলো। নির্বাচন উপলক্ষে নতুন কলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও অনেকেই এখন মুরাদে এসে বসতে শুরু করেছেন।”
এ ছাড়া ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষদের পাশে এবং চায়ের দোকানগুলোতেও জমে উঠেছে নির্বাচনি আড্ডা। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাকসু উপলক্ষে তারা দারুণ উচ্ছ্বসিত। তবে কিছু বিষয় শঙ্কারও জন্ম দিয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
আরও পড়ুন:
জাকসু ভোট: সেনা মোতায়েন চেয়ে নির্বাচন কমিশনের চিঠি
ফের জাকসুর তফসিল, ভোট ১১ সেপ্টেম্বর
৩৩ বছর পর জাকসুর ভোট, তবু শঙ্কা-অনিশ্চয়তা