Published : 25 Jun 2026, 02:18 PM
হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে প্রশ্নের সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর দেয়নি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, হামের প্রাদুর্ভাব ও এ সংক্রান্ত মৃত্যুর জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণের বিষয়টি তদন্ত ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হলে মন্ত্রীর লিখিত জবাবে এ তথ্য জানানো হয়।
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার জানতে চেয়েছিলেন, হামের প্রাদুর্ভাবে প্রতিদিন কোমলমতি শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে; এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে এবং যারা এর জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হল সব শিশুকে টিকার আওতায় এনে একটি শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধক বলয় বা ইমিউনিটি তৈরি করা।
তবে হামে কত শিশুর মৃত্যু হয়েছে, কোন এলাকায় প্রাদুর্ভাব বেশি, কিংবা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য তিনি দেননি।
মন্ত্রীর জবাবে বলা হয়, হামের বিস্তারে টিকাদানে অনীহা, অসম্পূর্ণ টিকাদান, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ভূমিকা রাখে।
সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “প্রাদুর্ভাবের জন্য দায় নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঘটনার তদন্ত ও প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল।”
তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবহেলা, দায়িত্বে গাফিলতি বা কর্তব্যে অবজ্ঞার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি-বিধান অনুযায়ী বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে এমন কোনো তদন্ত হয়েছে কি না, কারও গাফিলতি পাওয়া গেছে কি না, বা কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে জবাবে কিছু বলা হয়নি।
হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘মেগা-ক্যাম্পেইন’ ও ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রামের’ ওপর জোর দিচ্ছে বলে জবাবে জানানো হয়।
রুটিন টিকাদান থেকে বাদ পড়া জিরো-ডোজ শিশুদের শনাক্ত করে দ্রুত টিকার আওতায় আনা হচ্ছে বলেও মন্ত্রী আশ্বস্ত করেন।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুরা আগে টিকা পেয়ে থাকলেও তাদের সুরক্ষা শতভাগ নিশ্চিত করতে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আবারও এক ডোজ বিশেষ এমআর টিকা দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ প্রধান শহর এলাকা এবং কক্সবাজারের মত ঘনবসতিপূর্ণ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থলে বিশেষ নজর দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলেন মন্ত্রী।
তার ভাষ্য, এসব উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগামী কয়েক মাস ‘মাইক্রো-প্ল্যানিংয়ের’ মাধ্যমে গলি ও পাড়াভিত্তিক নিবিড় টিকাদান কার্যক্রম চালানো হবে।
ভবিষ্যতে কোনো শিশু যাতে টিকাদান কর্মসূচির বাইরে না থাকে, সেজন্য প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কথাও বলেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
প্রতিটি শিশুর টিকাদানের হিসাব ডিজিটালভাবে রাখতে ই-ট্র্যাকার সিস্টেম সম্প্রসারণ এবং শতভাগ অনলাইন নিবন্ধন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
প্রত্যন্ত অঞ্চলেও টিকার গুণগত মান ঠিক রাখতে কোল্ড চেইন রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং কঠোর মনিটরিংয়ের কথা বলা জয় তার জবাবে।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং সরকারি বিধি-বিধান মেনে চালানো হয়।
টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তনের ফলে টিকাদান কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কি না, তা তথ্য-উপাত্ত ও কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হবে বলে মন্ত্রীর উত্তরে জানানো হয়।
পর্যালোচনায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন মন্ত্রী।
হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত শনাক্ত করতে মাঠপর্যায় ও বিভিন্ন হটস্পটে নজরদারি টিম গঠনের কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ কার্যক্রমকে বলা হয়েছে কমিউনিটি-বেইজড সারভেইলেন্স বা সিবিএস।
দ্রুত রোগ নির্ণয়ে পর্যাপ্ত টেস্টিং কিট সরবরাহ এবং হামজনিত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। এক্ষেত্রে তিনি বাবল সিপ্যাপ ব্যবস্থার কথা বলেন।
আক্রান্ত শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল প্রদান এবং জটিলতা প্রতিরোধে চিকিৎসাসেবা জোরদারের কথা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
টিকা নিয়ে সামাজিক দ্বিধা বা অবহেলা দূর করতে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও মন্ত্রীর জবাবে এসেছে।
সেখানে বলা হয়, সরকার উঠান বৈঠক, মাইকিং এবং গণমাধ্যমের সহায়তায় সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন আরও জোরদার করবে। বিশেষ করে কর্মজীবী ও সুবিধাবঞ্চিত বাবা-মাকে সচেতন করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, টিকা মজুত ব্যবস্থাপনা জোরদার, রোগ নজরদারি সম্প্রসারণ, দ্রুত প্রাদুর্ভাব শনাক্তকরণ ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।