Published : 20 Jul 2026, 09:26 PM
দেশের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে চাকরিতে যোগদানের শুরুতে চিকিৎসকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট বেতনকাঠামোর সুপারিশ করেছে এ সংক্রান্ত সরকারি কমিটি।
‘এন্ট্রি লেভেল’ বা প্রারম্ভিক পর্যায়ের চিকিৎসকদের জন্য সরকারি চিকিৎসকদের মূল বেতনের অন্তত ৯০ শতাংশ, সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা এবং বছরে তিনটি উৎসব ভাতার সুপারিশ করা হয়েছে এই খসড়ায়।
বেসরকারি চিকিৎসকদের জন্য ‘সম্মানজনক’ বেতনকাঠামোর খসড়া তৈরি করতে গঠিত সাত সদস্যের এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন। সদস্যসচিব ছিলেন একই অধিদপ্তরের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক ডা. মাছুদুর রহমান। কমিটিতে দুজন যুগ্ম সচিবও সদস্য হিসেবে ছিলেন।
কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, নিয়মিত অথবা পূর্ণকালীন মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদানকারী একজন চিকিৎসক ২০১৫ সালের জাতীয় বেতনকাঠামোর নবম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতনের ৯০ শতাংশ পাবেন। ভবিষ্যতে নতুন পে-স্কেল ঘোষিত হলে সে অনুযায়ী বেতন সমন্বয় হবে।
বাড়িভাড়া হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা মূল বেতনের ৫৫ শতাংশ, বিভাগীয় পর্যায়ের সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য স্থানের ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ হারে ভাতা পাবেন।
এছাড়া চিকিৎসা ভাতা হিসেবে থাকছে ১ হাজার টাকা। চাকরিকাল এক বছর পূর্ণ হলে ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি বছরে তিনটি উৎসব ভাতা পাবেন চিকিৎসকরা।
পূর্ণকালীন অস্থায়ী মেডিকেল অফিসারদের জন্য মূল বেতন, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতাসহ সাকল্য বেতন ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ৩৫ হাজার টাকা, জেলা শহরে ৩৩ হাজার টাকা এবং উপজেলা পর্যায়ে সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। উৎসব ভাতা হিসেবে তারা মূল বেতনের দুই-তৃতীয়াংশ পাবেন।
খণ্ডকালীন চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে রোস্টার অনুযায়ী দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে দিনের পালায় ১ হাজার ২৫০ টাকা এবং রাতের পালায় ১ হাজার ৫০০ টাকা পারিশ্রমিক দিতে হবে।
সুপারিশে আরও বলা হয়, চিকিৎসা বিজ্ঞানের বেসিক বা মৌলিক বিষয়গুলোতে চিকিৎসকদের আগ্রহী করতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্নকারীদের প্রণোদনা হিসেবে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ ‘নন-প্র্যাকটিসিং ভাতা’ দেওয়া হবে।
তবে এ জন্য তাদের অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। এছাড়া নিয়মিত চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে চাকরিকাল এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির সুপারিশও করা হয়েছে খসড়ায়।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ১৩ জুলাই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে কমিটি তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে।
সুনির্দিষ্ট বেতনকাঠামোসহ বেশ কিছু দাবিতে সম্প্রতি ইন্টার্ন ও স্নাতকোত্তর শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকের পর নবীন চিকিৎসকদের জন্য একটি যৌক্তিক ও সম্মানজনক কাঠামো তৈরিতে গত মাসে এ কমিটি গঠন করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন বলেন, “দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা চিন্তা করে এই বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ জমা দিয়েছে। এটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে এখন সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।”
তিনি বলেন, “সরকার যদি সুপারিশ অনুমোদন করে, তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তা মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হবে। সরকার চাইলে এই প্রস্তাবে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও আনতে পারে। কারণ সর্বনিম্ন হিসেবে এই কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে, এর বেশিও করতে পারে সরকার চাইলে।
“জুনিয়র ও সিনিয়র চিকিৎসক, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের প্রতিনিধি এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের মত অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সুপারিশগুলো তৈরি করা হয়েছে।”
মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বেতনকাঠামোর এই খসড়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
একাংশের দাবি, ইন্টার্ন ও নবীন চিকিৎসকদের সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ না করেই এই কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে আগের চেয়েও কম বেতনের সুপারিশ করা হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা এক চিকিৎসক লিখেছেন, “এটি ভালো উদ্যোগ, তবে তার আগে সব বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক রাখা নিশ্চিত করতে হবে।”
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাহাদ হাসান নামের একজন ফেইসবুকে মন্তব্য করেছেন, “পেরিফেরি (প্রান্তিক পর্যায়) চিন্তা করলে বেতন আরও কমে গেল।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা আরেক চিকিৎসকের দাবি, সংশ্লিষ্টদের মতামত ছাড়াই এই কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
তরুণ চিকিৎসকদের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন বলেন, “সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের সমান বেতন কাঠামো করা যায় না কারণ তাদের বিসিএসসহ দীর্ঘ দিনের একটা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আসতে হয়। এছাড়া বেতন আরো বেশি চাইলেই নির্ধারণ করা যায় না, কারণ সেটি মানুষের পকেট থেকে আসবে।”
অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক বেসরকারি হাসপাতাল এবং উপজেলা পর্যায়ে অনেক কম টাকায় নতুনদের দিয়ে কাজ করায়।
“সেদিক থেকে এই কাঠামো খুবই ভালো হয়েছে, যা নতুন চিকিৎসকদের মধ্যে বেতন বৈষম্য দূর করতে সাহায্য করবে।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “এটি একটি খসড়া কাঠামো। আমরা এই খাতের সব অংশীজনের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে আলোচনা করে এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাব। নতুন একটি পে-স্কেলের কাজও চলমান রয়েছে। সেই বিবেচনায় ভবিষ্যতে এই কাঠামো আরও উন্নত হবে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, “অনেকেই না বুঝে মন্তব্য করছেন। চিকিৎসকদের জন্য অসম্মানজনক হয়, এমন কোনো বেতনকাঠামো আমরা করব না।”