Published : 23 Jun 2026, 11:02 PM
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মিছিল শততম দিন পার হলেও প্রাণহানি বন্ধ হচ্ছে না; হাসপাতালেও ভিড় কমছে না রোগীর।
এসময়ের মধ্যে টিকার কাভারেজ শতভাগ হলেও হামের সংক্রমণ ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ঠেকাতে না পারা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে ‘অ্যান্টিবডি’ যাচাই করার তাগিদ এসেছে বিশেষজ্ঞদের তরফে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে, শিশুদের রক্তে অ্যান্টিবডির মাত্রা (আইজিজি) অন্তত ১২০ মিলিলিটার পেলে সেটি শুধু সুরক্ষা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, টিকার কাভারেজ সঠিক হয়নি। সেটি হলে টিকাদানের পর বর্তমান সময়ে হাম নিয়ন্ত্রণে আসত।
যে কারণে তারা বলছেন, হামের টিকাদানের পর শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে কি না সেটি যাচাই করা এখন জরুরি।
তারা বলছেন, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইডিসিআর), আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটসহ বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চাইলে অ্যান্টিবডি যাচাই করতে পারে। এটির জন্য যে বাজেট দরকার সেটি নেই। তবে যাচাই হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পেলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। এবার স্বাস্থ্য খাতের অনেক বাজেট রয়েছে। শিশুদের সুরক্ষার জন্য যা যা প্রয়োজন সব করা হবে।
‘‘বর্তমানে শিশুদের হয়তো পুষ্টির কিছুটা ঘাটতি থাকতে পারে। এ মাসের শেষ থেকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। আশা করি তারপর শিশুদের ইমিউনিটির ঘাটতি স্বাভাবিক ভাবেই অনেকটা কমে যাবে।’’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিন অনুসারে সোমবার হামে আক্রান্ত ও লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুর শততম দিন পার করেছে বাংলদেশ। গত ১৫ মার্চ থেকে সরকারিভাবে এ রোগে আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করা হচ্ছে। সেই হিসাবে ২২ জুন শততম দিন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে দৈনিক গড়ে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
হামের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার প্রথম এক মাসে অর্থাৎ ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিলে দেশে রোগীর সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ১২৯ জন। এসময়ে মৃত্যু হয়েছে ১৯৫ শিশুর। প্রথম মাসে প্রতিদিন গড় সংক্রমণ ৬০৪ এবং মৃত্যু হয়েছে ৬ শিশুর।
পরে ৬০তম দিন ১৪ মে মোট রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৪ হাজার ৪১৯ এবং মোট মৃত্যু ৪৩৯ শিশুর। ৯০তম দিন ১৩ জুন দেশে মোট রোগীর সংখ্যা ছিল ৮৪ হাজার ৮৯১ জন এবং ৬৪৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল।
সবশেষ ১০০তম দিন ২২ জুন সোমবার মোট রোগী ছিল ৯৩ হাজার ৭৫৫ জন এবং মোট মৃত্যু ৬৮৩ শিশুর। সেই হিসাবে গড়ে প্রতিদিন সংক্রমণ ৯৩৭ এবং মৃত্যু ৬ শিশুর। শততম দিনের পরদিন মঙ্গলবারও তিনজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।]
পরিকল্পনার অভাবে হচ্ছে না ‘অ্যান্টিবডি’ যাচাই
অ্যান্টিবডি হল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মূল উপাদান। গর্ভাবস্থায় মায়ের কাছে থেকে অ্যান্টিবডি পায় শিশুরা। জন্মের পর পর তাদের শরীরে নিজস্ব অ্যান্টিবডি তৈরি হতে থাকে। জন্মের পর শিশুদের ইমিউনিটি শক্তিশালী করতে বিভিন্ন ধরনের টিকা দেওয়া হয়।

টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, রোগ প্রতিরোধের জন্য জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়সের মধ্যে শিশুকে মোট ১০টি টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে হামের দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ ৯ মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে।
তবে এবার হামের প্রাদুর্ভাব বিবেচনায় এবং আক্রান্ত শিশুদের বয়স বিবেচনায় ৬ মাস বয়সি শিশুদেরও টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় বিশেষজ্ঞ কমিটি।
হাম-রুবেলা মোকাবেলায় এপ্রিলের ৫, ১২ ও ২০ তারিখ থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। তিনটি ধাপের টিকাদান সম্পন্ন হয়ে অ্যান্টিবডি তৈরির চার সপ্তাহ শেষ হয়েছে। তবে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ হারে না কমায় অ্যান্টিবডি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, টিকাদান শুরুর পর সব সময় কাভারেজ যাচাই করা হয়। কিন্তু এবারের কাভারেজের তথ্য সঠিক নয়। নানা কারণে টার্গেট শিশুদের সংখ্যা কম হয়েছে। যে কারণে টিকাদানের পর শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি যাচাই করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়।
তিনি বলেন, টিকাদানের দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। টিকাদানের পর শিশুদের রক্তে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে অ্যান্টিবডির মাত্রা ১২০ মিলিলিটার থাকলে সেটি হাম থেকে সুরক্ষা দেবে। বর্তমানে এটি যাচাই করা উচিত। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্তের নমুনা নিয়ে এটি যাচাই করা সম্ভব। এটি করতে পারলে ভবিষ্যতের জন্য ভালো।
হাম থেকে সুস্থ্য হওয়ার পর তার রক্তে এই অ্যান্টিবডি ৮০০ মিলিলিটারের বেশি পাওয়া যাবে, যোগ করেন তিনি।
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করে বলেন, আইডিসিআর, আইসিডিডিআর,বি, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটসহ বেসরকারি সংস্থা চাইলে অ্যান্টিবডি যাচাইয়ের গবেষণা করতে পারে। তবে এখনও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের তেমন পরিকল্পনার কথা শোনা যায়নি। এ খাতের জন্য কোনো বাজেটও নেই।
এ বিষয়ে আইডিসিআর এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, এটি যাচাই হওয়ার দরকার রয়েছে। কিন্তু সেটির জন্য প্রটোকলসহ অনেক কিছু প্রয়োজন, যা সব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোমিনুর রহমান বলেন, “আমরা হামের অ্যান্টিবডি যাচাইয়ে একটা সার্ভে প্রটোকল তৈরি করেছি। এটার জন্য বাজেট এবং পদ্ধতি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
টিকার কাভারেজ নিয়ে প্রশ্ন?
১৫ মার্চ থেকে হামের তথ্য সরকারিভাবে প্রচার শুরু হয়েছে। সেই হিসাবে শততম দিনে অর্থাৎ ২২ জুনে ১০৩ শতাংশ টিকার কাভারেজের তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
দেশের আট বিভাগে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন ‘টার্গেট’ শিশুর বিপরীতে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৩ হাজার ৭৯৫ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ টিকার ‘কাভারেজ’ ১০৩ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা এ ‘কাভারেজকে’ যথোপযুক্ত বলে মানছেন না। তারা বলছেন, টিকা পাওয়ার উপযুক্ত সব শিশু ‘টার্গেটের’ আওতায় নাও আসতে পারে। কারণ কোনো এলাকায় ৯৫ শতাংশ টিকা ‘কাভারেজ’ হলে সেখানে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস তাদের সঙ্গে একমত নন। টিকার ‘কাভারেজ’ খুব ভালোভাবে হওয়ার দাবিই তার।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সর্বশেষ ক্যাম্পেইনের আগে পর্যাপ্ত সময় পায়নি, তাই হয়তো মাইক্রোপ্ল্যানে অনেক শিশু বাদ পড়েছে। কিন্তু মহামারী মোকাবিলায় সবাইকে টিকা দেওয়া জরুরি।”
সরকারি টিকার ‘কাভারেজে’ সমস্যা আছে, বলছেন আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “একটি এলাকায় টিকার কাভারেজ যদি ৯৫ শতাংশের বেশি হয়, তাহলে সেই এলাকায় হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।”
সরকারের ১০০ শতাংশের বেশি ‘কাভারেজের’ দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, “টিকার কাভারেজ সরকার যা বলছে তা হয়তো সঠিক নয়। কারণ শতভাগ টিকা কাভারেজ হলে এত সময় পর অবশ্যই হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসতো, যেটি হয়নি। এটি থেকে বোঝা যায়, টিকার ‘কাভারেজে’ সমস্যা আছে।”
টিকার কার্যকারিতা বিষয়ে জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, শিশুরা মায়ের কাছ থেকে দুই ধরনের আইজিজি (ইমিউনোগ্লোবুলিন জি) ও আইজিএ (ইমিউনোগ্লোবুলিন এ) নামে অ্যান্টিবডি পরোক্ষভাবে পায়। আইজিজি গর্ভকালীন সময়ে শিশু মায়ের কাছ থেকে ‘অমরা’ বা ‘প্লাসেন্টার’ মাধ্যমে পায়। আর আইজিএ জন্মের পর মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে যায়।
তিনি বলছেন, “এই মাতৃপ্রদত্ত অ্যান্টিবডিগুলো শিশুর জীবনের শুরুর দিকে টিকার কার্যকারিতায় কিছুটা বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাম টিকার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।”
এর ব্যাখ্যায় এই বিশেষজ্ঞ বলেন, শিশুর ছয় মাসে বয়সে টিকার কার্যকারিতা প্রায় ৫০ শতাংশ, নয় মাসে প্রায় ৮৫ শতাংশ, ১২ মাসে প্রায় ৯০ শতাংশ, ১৫ মাসের বেশি বয়সে প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ৪–৬ বছর (প্রাক-প্রাথমিক স্কুলগামী বয়স) এ টিকা প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কাজ করে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের দাবি, টিকার ‘কাভারেজ’ খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
“যার ফলে বর্তমানে হামের সংক্রমণ, নিশ্চিত হাম রোগী এবং মৃত্যুর সংখ্যা আগের চেয়ে কমে গেছে। হাম একবারে কমে যাবে না। ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। আশা করি, জুন মাসের শেষে একেবারে কমে যাবে।”
টিকা দিলেও হামের সংক্রমণ কমছে না? 'গলদ' কোথায়?
হামে শিশুমৃত্যুর দায় কার? 'পর্যালোচনার' কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী
হাম ঠেকানোর সব কিছুতেই 'ঘাটতি'
শয্যা খালি নেই, করিডোরেও চলছে চিকিৎসা: হামের বিস্তার বাড়ল কেন?
হাম নিয়ে 'উচ্চ ঝুঁকিতে' বাংলাদেশ: ডব্লিউএইচও
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য 'বিভ্রান্তিকর', হামে মৃত্যু আসলে কত?
‘জোড়াতালি’ দিয়ে চলছে হাম মোকাবিলা, বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ ‘উপেক্ষা’
হামের রোগী ফেরত না পাঠানোর নির্দেশনা কতটা মানতে পারছে হাসপাতালগুলো?