Published : 28 Mar 2026, 01:44 AM
রাজধানীতে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এখন শয্যার চেয়ে রোগী বেশি। ভর্তি রোগীদের বড় অংশই শিশু; জায়গা না থাকায় অনেকে করিডোর ও বারান্দায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে।
শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত হাসপাতালে দেড় শতাধিক রোগী ভর্তি ছিলেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির আইসিইউতে দায়িত্বে থাকা সেবিকা মাহমুদা আক্তার।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন হামের আউটব্রেক চলছে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীর মধ্যে ১৩০ জনই হামের রোগী, বেশিরভাগই শিশু। ঈদের পর থেকে অনেক রোগী আসছেন। আমরা রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি।”
হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলো এখন রোগীতে পূর্ণ। বেড না পেয়ে অনেক রোগীকে বারান্দা বা করিডোরে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
পটুয়াখালী সদর উপজেলা থেকে পাঁচ দিন আগে ভর্তি হওয়া ১ বছর ২৫ দিন বয়সী রাফিয়া শুয়ে ছিল তৃতীয় তলার করিডোরে।
তার মা সুমাইয়া বেগম বললেন, “পাঁচ দিন আগে এই হাসপাতালে এসেছি। এখন বাচ্চার অবস্থা কিছুটা ভালো। বেড পাই নাই, তাই কোরিডোরে আছি।”
মিরপুর-২ এলাকা থেকে আসা আরেক শিশু মুনতাহা চিকিৎসা নিচ্ছে হাসপাতালটির আইসিইউতে।
তার ফুফু হেনা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাচ্চার ঈদের আগে থেকেই নিউমোনিয়া ছিল, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিল। ঈদের আগের দিন থেকে হাম। হঠাৎ অবস্থা খারাপ হওয়ায় ঈদের দিন এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি।
“বাচ্চা তিন দিন ধরে আইসিইউতে। আজকে ডাক্তার জানিয়েছে বাচ্চার হার্ট ফেইল করেছে। এখন সব কিছুই আল্লাহর হাতে।”
চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, শুধু রোগীর সংখ্যা নয়, গুরুতর রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
শুক্রবার বিকালে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. তানজিনা জাহান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হাম রোগী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। হাম নিয়ে এক রোগী এসেছেন কিছুক্ষণ আগে, তার অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৫০ শতাংশ। তার জীবন বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।”

হামের লক্ষণ ও প্রতিকার
চিকিৎসার খোঁজে ঘুরে শিশুর মৃত্যু
গত ১৯ মার্চ চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ১১ মাসের শিশু আব্দুর রহমানের মৃত্যু হয় পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়।
স্বজনদের ভাষ্য, রোজার আগে প্রথমে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় শিশুটি। পরে কুমিল্লার ময়নামতি হাসপাতালে ১৫ থেকে ২০ দিন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
বাড়ি ফেরার পর আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। এবার তার নিউমোনিয়া দেখা দেয়, শ্বাসকষ্ট বাড়ে। স্থানীয়ভাবে কয়েক জায়গায় দেখানোর পর ঢাকায় আনা হয়। একপর্যায়ে বারডেম-২ এ নেওয়া হয়েছিল তাকে।
শিশুটির আত্মীয় মাসুম বিল্লা বলেন, বাড়ি ফেরার দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে রহমানের মুখে ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেয়, খাওয়াদাওয়াও বন্ধ হয়ে যায়।
তার ভাষায়, “মুখে ইনফেকশন হইল, পায়খানার রাস্তার কাছে ইনফেকশন, বিভিন্ন জায়গায় ইনফেকশন দেখা দিল, খাওয়াদাওয়া নাই।”
এরপর আবার ঢাকায় নেওয়া হলে শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে যায় বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, “ওরা বলতেছে এখানে কোনো রাখা যাবে না।”
মাসুম বিল্লা বলেন, অবস্থার অবনতি হওয়ায় অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে তারা আবার ঢাকায় আসেন। এরপর কয়েকটি হাসপাতালে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।
“ইনসাফ বারাকা, হলি ফ্যামিলি সব জায়গাতে ফোন দিছি। কোথাও কিছু পাই নাই।”
শেষ পর্যন্ত আব্দুর রহমানকে পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রথম রাতেই তার অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় বলে পরিবারকে জানানো হয়।
মাসুম বিল্লা বলেন, “প্রথম রাতে কইল যে অক্সিজেন লেভেল কমে গেছে, লাইফ সাপোর্ট দিতে হবে।”
দুই দিন দুই রাত লাইফ সাপোর্টে থাকার পর পরদিন সকালে মারা যায় শিশুটি।
মাসুম বিল্লা বলেন, আব্দুর রহমানকে হামের টিকা দেওয়া হয়নি, কারণ যখন টিকা দেওয়া হচ্ছিল, শিশুটির জ্বর ছিল।
“জ্বর থাকলে তো টিকা দেয় না। ওইদিকে টিকাও নাকি ছিল না পর্যাপ্ত পরিমাণে।”
স্বজনদের ধারণা, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় পাশের বেডের আরেক শিশুর কাছ থেকে আব্দুর রহমানের হাম সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে তাদের হাতে কোনো চিকিৎসা নথি নেই।
মাসুম বিল্লা বলেন, “ওরা ধারণা করতেছে, ওই বাচ্চা থেকে হয়তোবা ইনফেকশন হইতে পারে।”

কেন এই প্রাদুর্ভাব?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশীদ বলছেন, হামের সংক্রমণ মূলত ঢাকায় বেশি হলেও রাজশাহী ও ময়মনসিংহেও কিছু রোগী পাওয়া যাচ্ছে।
শুক্রবার তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি থেকেই প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করেছে।
আক্রান্তের সংখ্যা জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, এই মুহূর্তে মোট রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪০০ হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে তার কাছে নেই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, হাম ছড়িয়ে পড়ার পেছনে প্রধান কারণ হতে পারে টিকাদানের ঘাটতি।
তিনি বলেন, যেসব শিশুর টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তাদের অনেকে হয়ত তা পায়নি। ফলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
“টিকার ঘাটতি থাকলে এখন অবিলম্বে তা পূরণ করতে হবে এবং দ্রুত পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহ নিশ্চিত করা উচিত।”
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, হামের টিকা নিয়ে তাৎক্ষণিক সংকট না থাকলেও রুটিন টিকার সরবরাহে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
“বর্তমানে হাতে প্রচুর পরিমাণ ক্যাম্পেইনের টিকা আছে। রুটিন টিকা হাতে এলে তা দিয়েই কার্যক্রম চলবে, আর সরবরাহে দেরি হলে আপাতত ক্যাম্পেইনের টিকা দিয়ে সেই ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।”
তিনি বলেন, “সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেই এখন বেশি সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। অথচ এই বয়সে তাদের টিকা নেওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ টিকা পাওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে।”
ডা. শাহরিয়ার বলেন, এ ধরনের প্রবণতা শুধু বাংলাদেশে নয়, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও দেখা যাচ্ছে; একই পরিস্থিতি বিশ্বের আরও বিভিন্ন দেশেও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে। হামের টিকার নির্ধারিত সময় আরও এগিয়ে আনা যায় কি না, সেটিও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে।
তার ভাষ্য, বিশ্বে খুব কম দেশই ছয় মাস বয়সে হামের টিকা দেয়, বেশিরভাগ দেশই নয় মাস বয়সে দেয়; কোথাও কোথাও আরও পরে দেওয়া হয়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি ভাইরাসের ধরনে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একচেটিয়া বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়া, অপুষ্টি, ভিটামিনের ঘাটতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের বাড়তি যাতায়াতও হামের বিস্তারের কারণ ঘটাতে পারে বলে মন দেন এই কর্মকর্তা।
ডা. শাহরিয়ার বলেন, “সাধারণভাবে মায়ের দুধ থেকে পাওয়া সুরক্ষার কারণে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং করা শিশুদের নয় মাসের আগে হাম হওয়ার কথা নয়। কিন্তু জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সেই সুরক্ষার বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
“একজন হাম আক্রান্ত ব্যক্তি ১৩ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেন। ঈদের সময় মানুষের ব্যাপক আসা যাওয়া সংক্রমণ বিস্তারে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।”
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতির কথাও জানান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোকে আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে এবং চিকিৎসা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সবাইকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হামের বর্তমান পরিস্থিতির কারণ নির্ধারণে একাধিক বৈঠক হয়েছে জানিয়ে ডা. শাহরিয়ার বলেন, আগামী ৫ এপ্রিল বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা কমিটির বৈঠক রয়েছে। সেখানে বিষয়টি নিয়ে আরও সিদ্ধান্ত হবে।
তিনি জানান, রোগীদের নমুনা বিদেশেও পাঠানো হয়েছে। সেখানকার পরীক্ষার ফল এলে বোঝা যাবে, বাইরে থেকে আসা কোনো নতুন জিনোম বা ভাইরাসের ধরন এর সঙ্গে যুক্ত আছে কি না।

কী করণীয়?
ডা. মুশতাক হোসেন বলছেন, শুধু টিকা নয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণেও বাড়তি ব্যবস্থা দরকার।
“হাম আক্রান্ত শিশুদের ঘরে রাখতে হবে, স্কুলে বা বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না। কারণ এই রোগ হাঁচি-কাশি ও নিঃশ্বাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়াতে পারে।”
ডা. মুশতাক বলেন, দরিদ্র পরিবারের শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে আছে। তাদের জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে আলাদা সেবা বা আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে মা ও শিশু একসঙ্গে থেকে চিকিৎসা ও পরিচর্যা পেতে পারে।
“দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা না দিলে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা কঠিন হবে। এজন্য খাবার, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থাও জরুরি।”
তার ভাষায়, টিকার দ্রুত ব্যবস্থা করা এবং আক্রান্ত শিশুদের কমিউনিটি পর্যায়ে শনাক্ত ও আলাদা রাখার উদ্যোগ একসঙ্গে নেওয়া গেলে সংক্রমণ কমানো সম্ভব হবে।
টিকা সংগ্রহ, আইসিইউ ও ওয়ার্ড বাড়ানোর চেষ্টা
গত ১৭ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ঘোষিত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ চালু করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইআরপিপি প্রকল্পের অর্থায়নে গ্লোবাল ফান্ডের সহায়তায় স্থাপিত আইসিইউটি বন্ধ ছিল। পরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তিনজন চিকিৎসক, একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, অ্যানেস্থেসিয়া, এবং একজন অ্যানেস্থেটিস্টকে সেখানে সংযুক্ত করা হয়েছে। আইসিইউর বেড ও যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করে পাঁচ শয্যার ইউনিটটি জরুরি সেবার জন্য চালু করা হয়েছে।
একই সঙ্গে, ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে হাম ছাড়াও জলাতঙ্ক, এইডস, টিটেনাসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের রোগী ভর্তি থাকায় পাশের ডিএনসিসি হাসপাতালে হাম রোগীদের চিকিৎসার জন্য একটি ইউনিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি শুধু তাৎক্ষণিক টিকা স্বল্পতার ফল হিসেবে দেখছেন না; তার দাবি, বহু বছর ধরেই টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহে ঘাটতি ছিল।
শুক্রবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা টিকা কালেকশনের জন্য চেষ্টা করতেছি। যে কোনোভাবে টিকার ব্যবস্থা করার জন্য কাজ করছি।”
মন্ত্রী বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য আইসিইউ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে, ওয়ার্ডের সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি জানান, ডিএনসিসির ডেডিকেটেড হাসপাতালেও হাম রোগীদের জন্য সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্য জায়গাতেও আইসিইউ সেবা চালুর ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে রোগীরা চিকিৎসা পেতে সমস্যায় না পড়েন।