Published : 21 Dec 2025, 11:46 PM
চট্টগ্রামে চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত ৬০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিসন্ধির ব্যথা তিন মাসের বেশি স্থায়ী হয়েছে। আর ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ৪৮ শতাংশের বেশি বয়সে তরুণ।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণ পরিস্থিতি বোঝা ও ভবিষ্যৎ জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালিত এক গবেষণা কার্যক্রমে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আক্রান্ত রোগীদের তথ্য নিয়ে এ গবেষণা পরিচালিত হয়।
১৭৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী এবং ১১০০ জন চিকুনগুনিয়া রোগীর তথ্য যাচাই করা হয়েছে এই গবেষণায়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও উপজেলাগুলোর রোগীদের ক্লিনিক্যাল, জনস্বাস্থ্য, রোগতত্ত্ব ও জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, ইউএসটিসি, অ্যাপোলো ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল, ডিজিজ বায়োলজি অ্যান্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রুপ এবং নেক্সট জেনারেশন রিসার্চ, সিকুয়েন্সিং অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাব চিটাগং (এনরিচ) এর গবেষকরা এ গবেষণায় অংশ নেন।
চিকুনগুনিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিসন্ধির ব্যথা
এ বছর চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের শুরু থেকেই আক্রান্তরা অস্থিসন্ধির ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা জানাচ্ছিলেন। তবে এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ছিল না। এবারই প্রথম চিকুনগুনিয়া আক্রান্তদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রবণতার স্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেল।
গবেষক দলের নেতৃস্থানীয় একজন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আদনান মান্নান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশে বিশেষ করে চট্টগ্রামে চিকুনগুনিয়া এখন একটি দ্রুত বিস্তারমান মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
“গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, এই রোগ কেবল স্বল্পমেয়াদি জ্বরেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিসন্ধির ব্যথা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। শুধুমাত্র ডেঙ্গুকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল দিয়ে এই রোগ মোকাবিলা যথেষ্ট নয়।”
গবেষণায় দেখা যায়, চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত ৬০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিসন্ধির ব্যথা তিন মাসের বেশি স্থায়ী হয়।
১১০০ চিকুনগুনিয়া রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ গোড়ালির ব্যথা, ৮২ শতাংশ হাঁটুর ব্যথা, ৮০ শতাংশ কব্জির ব্যথা এবং ৬৫ শতাংশ হাতের অস্থিসন্ধির ব্যথায় আক্রান্ত হন।
৬০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে সকালে অস্থিসন্ধি শক্ত হয়ে যাওয়া এবং ৪৫ শতাংশের বেলায় ফোলা ভাবের লক্ষণ পাওয়া গেছে।
ড. আদনান মান্নান বলেন, “গবেষণায় জিনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভাইরাসের জিনগত বৈচিত্র্য শনাক্ত করা হয়েছে। এই ভ্যারিয়েন্ট ইতোপূর্বে পাকিস্তান, ভারত ও থাইল্যান্ডে দেখা গেছে।
“এবং চট্টগ্রামের ভাইরাসের প্রকরণে অর্ধশতাধিক জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন আছে। আর্থিক সহায়তা পেলে এ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করা সম্ভব হবে।”
চট্টগ্রামে সিটি করপোরেশনর এলাকার মধ্যে কোতোয়ালি, বাকলিয়া, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ, চকবাজার, হালিশহর ও পাঁচলাইশ এলাকায় সংক্রমণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। উপজেলাগুলোর মধ্যে সীতাকুণ্ড, বোয়ালখালি ও আনোয়ারাতে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ পরিলক্ষিত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০ শতাংশ রোগীর বেলায় ভুল রোগ নির্ণয় এবং পর্যাপ্ত রিপোর্ট না হওয়ার কারণে প্রকৃত রোগের বিষয়ে জানা ব্যাহত হয়েছে।
আদনান মান্নান বলেন, “জনসচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ রোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠিন করে তুলছে। প্রত্যেক আক্রান্ত রোগীর গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
“গবেষণা কাজে আমরা চিকিৎসকদের কাছ থেকে যে সাধারণ ধারণা পেয়েছি তা হল, আরটিপিসিআর এর উচ্চ মূল্যের কারণে প্রায় নয় হাজার রোগী রোগ পরীক্ষা করাননি।”
গবেষণায় দেখা যায়, শতাধিক রোগীর মাঝে চিকুনগুনিয়ার সাথে ডেঙ্গু (১ দশমিক ১ শতাংশ) ও জিকার (দশমিক ৭ শতাংশ) সহ-সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি তরুণদের মধ্যে
গবেষণায় জনসংখ্যাগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ জনগোষ্ঠী।
২৪ দশমিক ৫ শতাংশ শিশু-কিশোর, যাদের বয়স আঠারোর নিচে এবং ২২ শতাংশ মধ্যবয়সীদের আক্রান্তের তথ্য পাওয়া গেছে।
১,৭৯৭ জন রোগীর ক্লিনিক্যাল এবং বায়োলজিক্যাল ডেটা নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৪৪ দশমিক ৮ শতাংশ সতর্কতামূলক লক্ষণসহ ডেঙ্গুতে ভুগছিলেন।
ক্লিনিক্যাল উপসর্গ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় সব রোগীরই জ্বর ছিল (৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ)। পাশাপাশি বমিভাব ও বমি (৭১ দশমিক ৪ শতাংশ); মাথাব্যথা (৬২ দশমিক ৫ শতাং); মাংসপেশি (৪২ দশমিক ৪ শতাংশ) ও চোখের পেছনে ব্যথা (৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ); পেটব্যথা (৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ) এবং ডায়রিয়া (২৩ শতাংশ) ছিল।
সহ-রোগ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫ দশমিক ৫ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ এবং ৪ দশমিক ৫ শতাংশের ডায়াবেটিস ছিল।
ডেঙ্গুজনিত জটিলতার মধ্যে ৩১ শতাংশের কাশি এবং ২৩ দশমিক ৯ শতাংশের রক্তক্ষরণ দেখা গেছে। কিছু রোগীর শরীরে তরল জমে যাওয়ার লক্ষণ পাওয়া গেছে, যেমন- ১৪ দশমিক ৩ শতাংশের পেটে পানি জমেছে এবং ১৪ দশমিক ২ শতাংশের ফুসফুসে পানি জমেছে।
রক্ত পরীক্ষার ফলাফলে ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ রোগীর শরীরে তীব্র সংক্রমণের সূচক শনাক্ত হয়েছে।
অধ্যাপক আদনান মান্নান বলেন, “ভাইরাসের জিনগত বিশ্লেষণে আমরা একাধিক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ মিউটেশন শনাক্ত করেছি, যা এই অঞ্চলে রোগের বিস্তার ও তীব্রতার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। এসব তথ্য ভবিষ্যতে চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কৌশল নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী, রেলওয়ে হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আবুল ফয়সাল মোহাম্মদ নুরুদ্দিন ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আদনান মান্নান।
গবেষক দলে আরো ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডা. এম এ সাত্তার, ডা. মারুফুল কাদের, ডা. নুর মোহাম্মদ, ডা. হিরন্ময় দত্ত, ডা. ইশতিয়াক আহমদ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ডা. এ এস এম লুতফুল কবির শিমুল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ডা. রজত বিশ্বাস, ইউএসটিসির আইএএইচএস এর ডা. আয়েশা আহমেদ, অ্যাপোলো ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের ডা. মোহাম্মদ আকরাম হোসেন, নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. অরিন্দম সিং পুলক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিয়ারিং বিভাগের ড. মো. মাহবুব হাসান ও মহব্বত হোসেন, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এএমএএম জুনায়েদ সিদ্দিকি।
সহযোগিতায় ছিল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ
রোববার থিয়েটার ইনস্টিটিউটে গবেষণা কার্যক্রমের ফলাফল উপস্থাপনকালে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “নগর এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ।
“মশার প্রজননস্থল, মৌসুমি ও জলবায়ুগত প্রভাব, নগরের অবকাঠামো এবং মানুষের আচরণ—এসব বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ না করলে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।”
তিনি গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ, ওয়ার্ডভিত্তিক পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেন।
এ সময় তিনি গবেষক, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ামুক্ত নগর’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান গোলাম বাকি মাসুদ বলেন, “গবেষণাভিত্তিক তথ্য ছাড়া ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। এসপেরিয়া সবসময় বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও জনস্বার্থে কার্যকর উদ্যোগের পাশে রয়েছে।”
জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ২৪৩ জন; এ রোগে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এই সময়ে জেলায় ৩ হাজার ৬৮৩ জন চিকুনগুনিয়া রোগী শনাক্ত হয়েছে।
পুরনো খবর
চট্টগ্রামে মৃত্যু বেড়েছে ডেঙ্গুতে, রোগী বেড়েছে চিকুনগুনিয়ার
চট্টগ্রামে জিকা শনাক্ত, 'উচ্চ ঝুঁকি' ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর বিস্তার, গুরুতর রোগী কম
চট্টগ্রামে চিকনগুনিয়ার 'ঝুঁকিতে' ৬ এলাকা