Published : 30 May 2026, 01:44 AM
‘পদ্মা নদীর মাঝি’ সিনেমার কুবের, কপিলা, ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’র জয়গুন, কিংবা 'আগুনের পরশমণি' চলচ্চিত্রের যুদ্ধকালীন পরিবার, ‘লালসালু’র মজিদ চরিত্রগুলো দর্শকের হৃদয়ে যে ছাপ ফেলেছিল, তা আজও অমলিন।
সময়ের সাথে সাথে বাংলা চলচ্চিত্রে বেড়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার, বিনিয়োগ ও সক্ষমতা। কিন্তু শক্তিশালী সাহিত্যের গল্পনির্ভর সিনেমা কমতির দিকে।
ঢাকাই চলচ্চিত্র কি তাহলে সাহিত্যের হাত ছেড়ে দিচ্ছে?
নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, প্রযোজক, দর্শক ও চলচ্চিত্র সমালোচকদের বয়ানে উঠে এসেছে এর বিভিন্ন কারণ।
নির্মাতাদের মতে, দর্শকের রুচির পরিবর্তন, পাঠাভ্যাসের সংকট, মৌলিক চিত্রনাট্যের অভাব ও প্রযোজনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র খুব বেশি এখন আর হচ্ছে না।
প্রযোজকরা বলছেন হল সংকট ও চিত্রনাট্যের অভাবের কথা। আর চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, নির্মাতাদের মৌলিক চিত্রনাট্যের দিকে যাত্রা, চলচ্চিত্রের নির্মাণভঙ্গির পরিবর্তন, আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে সাহিত্যের আঙ্গিক ও বর্ণনাভঙ্গির সেই আবেগ দর্শকদের মধ্যে তুলে ধরা কিছুটা জটিল হয়ে ওঠায় সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ কমেছে।

গৌরবময় অতীত
বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের সম্পাদিত গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাস’ এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতির বিভিন্ন নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, বাংলাদেশের সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্রের ধারার সূচনা স্বাধীনতার অনেক আগে থেকে।
১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ সিনেমাটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অবলম্বনে নির্মিত হয়। নদীতীরের জেলেপরিবারের সংগ্রাম ও নিপীড়নের গল্প নিয়ে তৈরি এই সিনেমায় অভিনয় করেন খান আতা, তৃপ্তি মিত্র, সুমিতা দেবীসহ অনেকে।
এরপর ‘মুখ ও মুখোশ’ সিনেমার মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যের গল্পভিত্তিক চলচ্চিত্রের একটি শক্ত ধারা গড়ে উঠতে শুরু করে।
চলচ্চিত্র গবেষক ও সমালোচক অনুপম হায়াতের ভাষ্য, ষাটের দশকে দেশের চলচ্চিত্রে শিল্পবোধ ও জীবনদৃষ্টির একটি শক্তিশালী প্রভাব ছিল। সত্তর ও আশির দশকে মূলধারার চলচ্চিত্র ছিল বেশ প্রাণবন্ত; তখন সামাজিক এবং পারিবারিক গল্পনির্ভর সিনেমায় সাহিত্যিকদের উপন্যাস ও গল্প থেকে কাহিনী নেওয়ার প্রবণতা ছিল বেশি।
অনুপম বলেন, আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে। কল্পকাহিনী ও প্রামাণ্যচিত্র উভয় ধারার এসব সিনেমায় দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজবাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা দেখা যায়।
কারিগরি সীমাবদ্ধতা থাকলেও নব্বইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো সময়ের বাস্তবতা ও মানুষের জীবনের গভীরতাকে ধারণ করতে পেরেছে বলেই মনে করেন তিনি।
তবে নব্বইয়ের দশক থেকে ভেতর-বাইরের নানা কারণে চলচ্চিত্রশিল্পে ভাটা পড়ে। তখন থেকে ধীরে ধীরে বিদেশি সিনেমার অনুকরণনির্ভর নির্মাণ বাড়তে থাকে এবং এখনকার সময়ের বড় বাজেটের সিনেমাতেও এই অনুকরণ দেখতে পাচ্ছেন অনুপম।
তিনি বলেন, “নির্মাতা, প্রযোজক ও দর্শকের একটা অংশ এখন সেদিকেই বেশি ঝুঁকছে। ফলে সাহিত্যনির্ভর মৌলিক গল্পের চলচ্চিত্র আগের তুলনায় কমে গেছে। তবে সবসময়ই এমন কিছু নির্মাতা ছিলেন যারা স্রোতের বিপরীতে গিয়ে ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সফল হয়েছেন, সেগুলোরও দর্শক গ্রহণযোগ্যতা ছিল।”
পাঁচ দশকের ইতিহাস
‘জাগো হুয়া সাভেরা’ নির্মাণের পর পঞ্চাশের শেষ ও ষাটের দশকে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন উপন্যাস ও গল্প অবলম্বনে নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে সালাহউদ্দিনের ‘সূর্যস্নান’ (১৯৬২) ও ও ‘ধারাপাত’ (১৯৬৩), সাদেক খানের ‘নদী ও নারী’ (১৯৬৫), সৈয়দ শামসুল হকের ‘ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো’ (১৯৬৬), সুভাষ দত্তের ‘কাগজের নৌকা’ (১৯৬৬)।
সাহিত্যের পাশাপাশি সেসময়ে গ্রামবাংলার চিরন্তন লোকগাথা, ‘পদ্মপুরাণ’, ‘মনসামঙ্গল’ কাব্য অবলম্বনে জহির রায়হান নির্মাণ করেছিলেন চলচ্চিত্র ‘বেহুলা’, যেটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৬ সালে। এরপর তিনি নির্মাণ করেন ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭)।
সুভাষ দত্তের ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ (১৯৬৭), কাজী জহিরের ‘নয়নতারা’ (১৯৬৭), খান আতাউর রহমানের ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ (১৯৬৭), আমজাদ হোসেন ও নওফেল হক বাচ্চুর ‘আগুন নিয়ে খেলা’ (১৯৬৭) সিনেমার কথাও এই তালিকায় আসবে।

ওই ধারায় আরও যুক্ত হয় মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘মোমের আলো’ (১৯৬৮), কামাল আহমেদের ‘অবাঞ্ছিত’ (১৯৬৯), নূরুল হকের ‘বেদের মেয়ে’ (১৯৬৯), খান আতাউর রহমানের ‘জোয়ার ভাটা’ (১৯৬৯) এবং মোস্তফা মেহমুদের ‘ময়নার সংসার’ (১৯৬৯)।
সত্তরের দশকে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের ধারা আরও বিস্তৃত হয়। সে সময়ে নির্মিত হয় শরৎচন্দ্রের বৈকুণ্ঠের উইল উপন্যাস অবলম্বনে বশীর হোসেনের ‘আপন পর’ (১৯৭০), খান আতাউর রহমানের ‘সুখ দুঃখ’ (১৯৭১), আলি কাওসারের ‘গায়ের বধূ’ (১৯৭১), কাজী জহিরের ‘অবুঝ মন’ (১৯৭২)।
সুবোধ ঘোষের ‘কান্তিধারা’ উপন্যাস অবলম্বনে রুহুল আমিন নির্মাণ করেছিলেন ‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’ (১৯৭২)।
এছাড়া ছিল সুভাষ দত্তের ‘বলাকা মন’ (১৯৭৩), সি বি জামানের ‘ঘরের পাখি’ (১৯৭৩), ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩), খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’ (১৯৭৩), আলি কাওসারের ‘বধূ মাতা কন্যা’ (১৯৭৩), প্রমোকরের (খান আতাউর রহমানের ছদ্মনাম) ‘ত্রিরত্ন’ (১৯৭৪), মাসুদ পারভেজের ‘মাসুদ রানা’ (১৯৭৪), আলি কাওসারের ‘ভাইবোন’ (১৯৭৪), ফজলুল হকের ‘উত্তরণ’ (১৯৭৫), আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ (১৯৭৬), রাজেন তরফদারের ‘পালঙ্ক’ (১৯৭৬) এবং শামসুদ্দিন টগরের ‘দস্যু বনহুর’ (১৯৭৬)।
এই দশকে ঐতিহাসিক কাহিনীভিত্তিক কিছু সিনেমাও নির্মিত হয়। সৈয়দ হাসান ইমামের ‘লালন ফকির’ (১৯৭২) এবং দারাশিকোর ‘ফকির মজনুশাহ’ (১৯৭৮) তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়, এর মধ্যে প্রথম মুক্তি পায় চাষী নজরুল ইসলামের ‘ওরা ১১ জন’ (১৯৭২)।
এরপর নির্মিত হয় সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ (১৯৭২), আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩), নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’ (১৯৭৪) এবং হারুনর রশীদের ‘মেঘের অনেক রঙ’ (১৯৭৬)।
সত্তরের দশকের শেষ দিকে নির্মিত হয় মুস্তাফিজের ‘মায়ের বাঁধন' (১৯৭৬), আজিজুর রহমানের ‘কুয়াশা’ (১৯৭৭)।
সুভাষ দত্তের ‘বসুন্ধরা’ (১৯৭৭) সিনেমাটি নির্মিত হয় বরেণ্য সাহিত্যিক আলাউদ্দীন আল আজাদের ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ উপন্যাস অবলম্বনে।

পরের বছর সুভাষ দত্ত নির্মাণ করেন আশরাফ সিদ্দিকীর ‘গলির ধারের ছেলেটি’ অবলম্বনে ‘ডুমুরের ফুল’ (১৯৭৮), আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ (১৯৭৮) নির্মিত হয় পরিচালকের নিজের লেখা ‘ধ্রুপদী এখন ট্রেনে’ উপন্যাস থেকে। যৌতুকের শিকার হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা এক নারীর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এই গল্প সেসময় দর্শকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
এ সময়ে আরও নির্মিত হয় আজিজুর রহমানের ‘অগ্নিশিখা’ (১৯৭৮), শহীদুল্লা কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘সারেং বৌ’ (১৯৭৮)।
এছাড়া মোস্তাফা মেহমুদের ‘মধুমিতা’ (১৯৭৮), প্রমোদকরের ‘দিন যায় কথা থাকে’ (১৯৭৯) এবং মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ (১৯৭৯)।
সত্তরের দশকে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রে সমৃদ্ধ ছিল বাংলাদেশ। ওই সময়ই অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে 'তিতাস একটি নদীর নাম' নির্মাণ করেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটক।
সিনেমার চিত্রনাট্যে তিতাস নদীর তীরে জেলেপাড়ার মানুষের জীবন ও সংগ্রামের গল্প উঠে এসেছিল। বাণিজ্যিকভাবে সফল না হলেও নির্মাণশৈলীর দিক দিয়ে সিনেমাটি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত।
স্মৃতিচারণ করে প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান গ্লিটজকে বলেন, “সিনেমাটি সেসময় হলে চলেনি, দ্বিতীয় সপ্তাহে নামিয়ে ফেলতে হয়েছিল। হলে গিয়ে দর্শকরা গালিগালাজ করেছিল। কিন্তু ৫৬ বছর আগে নির্মাণ করা সেই সিনেমাই এখন ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক চলচ্চিত্রে দেখাচ্ছে, একমাত্র বাংলাদেশি সিনেমা হিসেবে দেখাচ্ছে।
“সিনেমাটি নির্মাণ করে ঋত্বিক ঘটক আমাকে বলেছিলেন, ‘হাবিব যুগের চেয়ে ২৫ বছর আগে আমি সিনেমাটি বানিয়ে দিয়ে গেলাম’। অর্থাৎ ঋত্বিক ঘটক আমাকে বুঝিয়ে গেলেন এই সিনেমার প্রাসঙ্গিকতা সারাজীবন থাকবে।”

সত্তরের দশকে উল্লেখযোগ্য আরেকটি সংযোজনের মধ্যে ছিল ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’। আবু ইসহাকের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি জীবনযুদ্ধে লড়াকু নারী জয়গুনের সংগ্রামের গল্প বলা হয়েছিল।
সিনেমায় দুর্ভিক্ষ পরবর্তী বাংলার একটি গ্রামের দৃশ্য উঠে এসেছে, যেখানে গ্রামীণ সৌন্দর্যের পাশাপাশি চালের চোরাকারবার ও চালের জন্য হাহাকার, সমাজপতির লালসা, অসহযোগিতা এবং পুরুষতান্ত্রিক প্রতিহিংসা, সর্বোপরি গ্রামের শক্তিমান ও শক্তিহীন মানুষের হাহাকার তুলে ধরা হয়েছিল।
কালজয়ী এই সিনেমা নির্মাণের সময়ও বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল নির্মাতাদের। সেই গল্প শুনিয়েছেন সিনেমার নির্মাতা মসিউদ্দিন শাকের।
“সিনেমাটি যখন তৈরি করছিলাম তখন আমাদের পকেটে পয়সা ছিল না, সেই ১৯৭৯ সালে সিনেমাটি করতে লাখ দশেকের মত টাকা লেগেছিল। তিন বছর চেষ্টা করে সিনেমাটি বানানো হয়েছিল। সরকারি অনুদান পেয়েছিলাম আড়াই লাখ টাকা, আর বাকি টাকাটা আমাদের খুব কষ্টে জোগাড় করতে হয়েছিল।
“কারণ আমরা সেসময়কার গতানুগতিক সিনেমা করিনি, বাণিজ্যিক উপকরণ ছাড়া একদমই সাদামাটা গ্রামীণ সমাজের গল্প। বাইরে থেকে আমরা খুব একটা সাহায্য সহযোগিতাও পাইনি।”
এত বছর পরে এসেও যে সিনেমাটি এক অনন্য স্থান দখল করে আছে, তা নিয়ে এই নির্মাতা বলেন, “সিনেমাটি যখন নির্মাণ করেছিলাম তখন কিন্তু আমরা ভাবতেও পারিনি মুক্তির চার দশক পরেও সিনেমাটি এমন আলোচিত থাকবে। সিনেমাটি এখনো দর্শক পছন্দ করে, বিভিন্ন আয়োজনে সিনেমাটি প্রদর্শন করা হয়, আলোচনা, গবেষণায় রাখা হয়, এটি আমার কাছে আনন্দের।”
আশির দশকে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের ধারা আরও সমৃদ্ধ হয়। সে সময়ে নির্মিত হয় দিলীপ সোমের ‘স্মৃতি তুমি বেদনা’ (১৯৮০), চাষী নজরুল ইসলামের ‘ভালো মানুষ’ (১৯৮০) ও ‘দেবদাস’ (১৯৮১), আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘এখনই সময়’ (১৯৮০), রুহুল আমিনের ‘গাংচিল’ (১৯৮০), আমজাদ হোসেনের ‘কসাই’ (১৯৮০), বাদল রহমানের ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ (১৯৮০), অধ্যাপক নূরল আলমের ‘স্বামী’ (১৯৮১), আলমগীর কুমকুমের ‘ঝুমকা’ (১৯৮১), কাজী নূরল হকের ‘মেঘ বিজলী বাদল’ (১৯৮৩), কামাল আহমেদের ‘লালুভুলু’ (১৯৮৩), ইবনে মিজানের ‘লাইলী মজনু’ (১৯৮৩), শহিদুল আমিনের ‘রামের সুমতি’ (১৯৮৪), কাজী হায়াতের ‘রাজবাড়ী’ (১৯৮৪), চাষী নজরুল ইসলামের ‘চন্দ্রনাথ’ (১৯৮৪)।
আশির দশকের মাঝামাঝি ও শেষ দিকে নির্মিত হয় রাজ্জাকের ‘সৎ ভাই’ (১৯৮৫)। সিনেমাটি শরৎচন্দ্রের ‘বৈকুণ্ঠের উইল’ উপন্যাস থেকে তৈরি করেছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক।
আরও ছিল মতিন রহমানের ‘রাধাকৃষ্ণ’ (১৯৮৫), সি বি জামানের ‘শুভরাত্রি’ (১৯৮৫), মোহাম্মদ হান্নানের ‘রাই বিনোদিনী’ (১৯৮৫), আলমগীর কবিরের ‘পরিণীতা’ (১৯৮৬), তারাশংকরের উপন্যাস থেকে রাজ্জাক নির্মাণ করেছিলেন ‘চাঁপাডাঙ্গার বৌ’ (১৯৮৬), চাষী নজরুল ইসলামের ‘শুভদা’ (১৯৮৬), এ জে মিন্টুর ‘মান সম্মান’ (১৯৮৬), খান আতাউর রহমানের ‘পরশ পাথর’ (১৯৮৭), বুলবুল আহমেদের ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ (১৯৮৭), রফিকুল বারী চৌধুরীর ‘চণ্ডীদাস রজকিনী’ (১৯৮৭), চাষী নজরুল ইসলামের ‘বেহুলা লখিন্দর’ (১৯৮৮) ও ‘বিরহ ব্যথা’ (১৯৮৯), আজিজুর রহমানের ‘মহানগর’ (১৯৮৯), মহিউদ্দিন ফারুকের ‘বিরাজ বৌ’ (১৯৮৯) এবং কামাল আহমেদের ‘ব্যথার দান’ (১৯৮৯)।
এই দশকে আলোচিত সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে শিশুতোষ সিনেমা ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।
নায়করাজ রাজ্জাক 'চাঁপাডাঙার বৌ' ও 'সৎ ভাই' সিনেমা দুটিও প্রশংসা পায়।
নব্বইয়ের দশকে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতায় নির্মিত হয় শহীদুল হক খানের ‘ছুটির ফাঁদে’ (১৯৯০), চাষী নজরুল ইসলামের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ (১৯৯১) ও ‘স্ত্রীর পাওনা’ (১৯৯১), সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকির ‘আয়নাবিবির পালা’ (১৯৯১), গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ (১৯৯৩), হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪), মুস্তাফিজুর রহমানের ‘শঙ্খনীল কারাগার’ (১৯৯৪), আক্তারুজ্জামানের ‘পোকা মাকড়ের ঘর বসতি’ (১৯৯৬), সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলামের 'হাঙর নদী গ্রেনেড' (১৯৯৭), নায়করাজ রাজ্জাকের ‘উত্তর ফাল্গুনী’ (১৯৯৭)।
সত্তর ও আশির দশকের তুলনায় নব্বইয়ের দশকে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা কিছুটা কমে এলেও এ সময়েই নির্মিত হয় বাংলা সাহিত্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র।

‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ এবং ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্র সাহিত্যভিত্তিক সিনেমার ধারাকে নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে।
সাহিত্যভিত্তিক গল্প, মুক্তিযুদ্ধ ও গ্রামীণ জীবনের আবহ তুলে ধরা এসব চলচ্চিত্র শুধু দর্শকপ্রিয়তাই পায়নি, বাংলা সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।
২০০০ দশকের গোড়ায় সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের ধারায় যুক্ত হয় প্রিয়দর্শিনী খ্যাত অভিনেত্রী মৌসুমীর ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ (২০০৩)। এর আগে আবু সাইয়ীদ নির্মাণ করেন সেলিম আলদীনের ‘কিত্তনখোলা’ (২০০০)। এছাড়া শাহজাহান চৌধুরীর ‘উত্তরের খেপ’ (২০০৪), হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৪), রাবেয়া খাতুনের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলামের ‘মেঘের পরে মেঘ’ (২০০৪) এ সময়েরই সিনেমা।
চাষী নজরুল ইসলামের ‘সুভা’ (২০০৫) রবীন্দ্রনাথের কাহিনী নিয়ে তৈরি হয়েছিল। একই বছর তিনি নির্মাণ করেছিলেন ‘শাস্তি’।
এ সময়ে নির্মিত হয়েছে আমজাদ হোসেনের ‘কাল সকালে’ (২০০৫), জহির রায়হানের উপন্যাস অবলম্বনে সুচন্দার ‘হাজার বছর ধরে’ (২০০৫), শাহজাহান চৌধুরীর ‘একাত্তরের জমি’ (২০০৬), মুশফিকুর রহমান গুলজার ও মৌসুমীর ‘মেহের নিগার’ (২০০৫), বাদল খন্দকারের ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘বাঙলা’।
বেলাল আহমেদের ‘নন্দিত নরকে’ (২০০৬) হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়।
আরও ছিল আজিজুর রহমানের ‘দুঃখিনী জোহরা’ (২০০৬), শাহ আলম কিরনের ‘সাজঘর’ (২০০৬), মতিন রহমানের ‘রাক্ষুসী’ (২০০৬), নুরুল আলমের ‘পরম প্রিয়া’ (২০০৬), মুশফিকুর রহমান গুলজারের ‘বিন্দুর ছেলে’ (২০০৬), হুমায়ূন আহমেদের ‘দুই দুয়ারী’ (২০০৬), কাজী হায়াতের ‘কাবুলিওয়ালা’ (২০০৬), মোর্শেদুল ইসলামের ‘দূরত্ব’ (২০০৮)।
এই দশকের শেষের দিকে তৌকীর আহমেদের ‘দারুচিনি দ্বীপ’ (২০০৭) ও ‘জয়যাত্রা’ (২০০৮) আলোচনায় আসে।
এছাড়া শওকত জামিলের ‘একজন সঙ্গে ছিল’ (২০০৭), মুরাদ পারভেজের ‘চন্দ্রগ্রহণ’ (২০০৮), হুমায়ূন আহমেদের ‘চন্দ্রকথা’ (২০০৯), ‘আমার আছে জল’ (২০০৮), মোরশেদুল ইসলামের ‘প্রিয়তমেষু’ (২০০৯) এই দশকের সিনেমা।

২০১০ থেকে বর্তমান
২০১০ এর দশকেও সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের ধারা থামেনি। গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’ (২০১০) লালন শাহের জীবন ও দর্শন নিয়ে নির্মিত। নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর ‘গেরিলা’ (২০১১) সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস অবলম্বনে মুক্তিযুদ্ধের এক অসামান্য চিত্রায়ণ।
মোর্শেদুল ইসলামের ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ (২০১১) মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস থেকে নেওয়া, যা কিশোর দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। চাষী নজরুল ইসলাম শরৎচন্দ্রের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘দেবদাস’ (২০১৩)।
আরও নির্মিত হয়েছে অ্যাডাম দৌলার ‘বৈষম্য’(২০১৪), জাহিদুর রহিম অঞ্জনের ‘মেঘমল্লার’ (২০১৪), শাহ আলম কিরণের ‘৭১ এর মা জননী’ (২০১৪), মোরশেদুল ইসলামের ‘অনীল বাগচীর একদিন’ (২০১৫), মেহের আফরোজ শাওনের ‘কৃষ্ণপক্ষ’ (২০১৬), গৌতম ঘোষের ‘শঙ্খচিল’ (২০১৫), তৌকির আহমেদের ‘হালদা’ (২০১৭), আকরাম খানের ‘খাঁচা’ (২০১৭), নুর ইমরান মিঠুর ‘কমলা রকেট’ (২০১৮), অনম বিশ্বাসের ‘দেবী’ (২০১৮), তৌকীর আহমেদের ‘ফাগুন হাওয়ায়’(২০১৯), মৃত্তিকা গুণের ‘কালো মেঘের ভেলা’ (২০১৯)।
এরপর তাহের শিপন এবং ভারতের মুকুল রায় চৌধুরী যৌথভাবে নির্মাণ করেন ‘হলুদবনি’ (২০২০)। হাবিবুর রহমানের 'অলাতচক্র' (২০২১) সিনেমাটি আহমদ ছফার উপন্যাস অবলম্বনে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার চিত্র।
গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ‘গুণিন’ (২০২২), সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকীর ‘যা হারিয়ে যায়’ (২০২২), নির্মলেন্দু গুণের উপন্যাস অবলম্বনে আশুতোষ সুজনের ‘দেশান্তর’ (২০২২), প্রশান্ত অধিকারীর ‘হডসনের বন্দুক’ (২০২২) এর নামও আসবে।
প্রদীপ ঘোষের ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’ (২০২৩) ঐতিহাসিক চরিত্রকে পর্দায় নিয়ে আসে। ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরীর ‘মায়ার জঞ্জাল’ (২০২৩), আবদুস সামাদ খোকনের ‘শ্রাবণ জ্যোৎস্নায়’ (২০২৪), মৈমনসিংহ গীতিকার কাজলরেখা অবলম্বনে গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ‘কাজলরেখা’ (২০২৪), আকরাম খানের ‘নকশীকাঁথার জমিন’ (২০২৪), মির্জা সাখাওয়াৎ হোসেনের ‘হৈমন্তীর ইতিকথা’ (২০২৪) সবশেষ দশকের সিনেমা।
এই ধারায় সবচেয়ে সাম্প্রতিক সংযোজন হিসেবে তানিম নূরের ‘উৎসব’ (২০২৫), সোয়াইবুর রহমানের ‘নন্দিনী’ (২০২৫), লিসা গাজীর ‘বাড়ির নাম শাহানা’ (২০২৫) এবং রোজার ঈদে মুক্তি পাওয়া তানিম নূরের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ (২০২৬)।

তবে এই তালিকার বাইরেও মুক্তিপ্রাপ্ত সাহিত্যধর্মী সিনেমা থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতির অফিস সচিব সৌমেন্দ্র রায়।
ভাটার কারণ কী?
চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলের মতে, ঢাকার বড় পর্দা এখন বলিউড ও তামিল সিনেমার অনুকরণে ভরে গেছে।
তিনি বলেন, “সাহিত্য-অসাহিত্য কোনোরকম ভালো চলচ্চিত্রই কি বাংলাদেশে তেমন একটা তৈরি হচ্ছে? অধিকাংশ সিনেমাই তো বলিউড বা তামিল সিনেমার নকলনবীশি বা গরিবী সংস্করণ মাত্র।”
তানভীর মোকাম্মেল সাহিত্যের মানের পতনকেও দায়ী করেন। তার ভাষায়, “বাংলা সাহিত্য এক সময় বেশ উন্নত ছিল। ইদানিং বাংলা সাহিত্যের মান বেশ নেমে এসেছে। ফলে কমে গেছে সাহিত্যনির্ভর ভালো সিনেমার সংখ্যাও।”

সমস্যাটা কি শুধু নির্মাতাদের অনাগ্রহ? নাকি দর্শকরুচির বদল?
তানভীর মোকাম্মেল বলেন, “দুটোই। দেশে পাঠাভ্যাস ব্যাপকভাবে কমে এসেছে। অনেক নির্মাতাই উন্নত সাহিত্য তেমন পড়েন না। আর অধিকাংশ দর্শকই মননশীল কিছুর চেয়ে হালকা আনন্দ, ভায়োলেন্স বা যৌন সুড়সুড়িমূলক চলচ্চিত্র দেখতে পছন্দ করে। এ কারণে সাহিত্যনির্ভর রুচিশীল চলচ্চিত্রের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে।”
চিত্রনাট্যের সংকটও একটি বড় কারণ বলে মনে করেন এই নির্মাতা।
“চিত্রনাট্য লেখার একটা আলাদা ভাষা রয়েছে। এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দক্ষতা, একটি আলাদা শিল্পমাধ্যম। বাংলাদেশে খুব সামান্য সংখ্যক মানুষেরই ভালো চিত্রনাট্য লেখার সেই দক্ষতা রয়েছে।”
প্রযোজনার সংকটও কম নয় জানিয়ে তিনি বলেন, “পুরনো দিনের পেশাদার প্রযোজকেরা এখন তেমন নেই। বর্তমানে করপোরেট পুঁজি বা নতুন আসা প্রযোজকরা সাহিত্যনির্ভর মননশীল চলচ্চিত্রের চেয়ে মারদাঙ্গা সিনেমাই বেশি পছন্দ করেন।”
সম্প্রতি জসীমউদ্দীনের কাহিনী অবলম্বনে ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ চলচ্চিত্রের শুটিং শেষ করছেন তানভীর মোকাম্মেল।
আরেক নির্মাতা মোর্শেদুল ইসলাম মনে করেন, বর্তমান নির্মাতাদের মধ্যে নিজস্ব গল্প বলার একটা তাগিদ তৈরি হয়েছে, তাই এই সিনেমার সংখ্যা কমছে।
তিনি বলেন, “সাহিত্যনির্ভর সিনেমা করলে একটা সুবিধা হল, হাতে একটা রেডিমেড গল্প থাকে, যা কাজ করতে সুবিধা দেয়। আবার সংকটও তৈরি হয়। এই ধরনের সিনেমা নির্মাণ কিছুটা কঠিন এবং দর্শক মনঃপুত হতে হয়।
“আমরা যে ধরনের সিনেমা বানাতাম, সেই যুগ আর নেই। এখন দর্শককে শুরু থেকেই আকর্ষণ করতে হয়, তাই গল্প বলার ধরণ পাল্টে গেছে। নির্মাতারাও নিজেদের গল্পে নির্মাণের দিকে বেশি ঝুঁকছে। তবে সাহিত্যের আবেদন কখনো নষ্ট হবে না।”
স্বপ্ন বনাম বাণিজ্য
‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘হঠাৎ বৃষ্টি’, ‘মনের মানুষ’সহ সিনেমার প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান বলেন, “এখনকার প্রযোজকরা বিনিয়োগ করে টাকা ফেরত পেতে চায়, আর এটাই স্বাভাবিক। সিনেমা তো এখন এক লাখ, দুই লাখ টাকায় হয় না। এখনকার প্রযোজকরা চাইবে টাকা ফেরত আসুক, না হলে তারা ব্যবসা চালাতে পারবে না। লাভের দিকটা আগে চিন্তা করবে।
“আর আমরা সিনেমা বানিয়েছি স্বপ্নের জায়গা থেকে, স্বপ্নের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না। ঋত্বিক ঘটককে পছন্দ, তাকে দিয়েই সিনেমা করেছি, গৌতম ঘোষের সঙ্গে মতের মিল হয়েছে, তাকে দিয়ে সিনেমা করেছি। চলচ্চিত্রশিল্পকে ভালোবেসে সিনেমায় বিনিয়োগ করেছি।”
প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু বলেন, “সাহিত্যনির্ভর সিনেমা তো হচ্ছে, একসময়ও যে অনেক সাহিত্য সিনেমা হত তেমন নয়, তখনো এটা সংখ্যার দিক থেকে কম ছিল, সেটা হয়ত এখনো কম।
“দেশে হল সংকট, বাণিজ্যিক সিনেমায় লগ্নি করে সেই টাকাও কিন্তু উঠে আসছে না। সেই জায়গা থেকে সব চলচ্চিত্রের জন্যই এখন একটা সংকটকালীন সময় যাচ্ছে। আমরা নতুন সিনেমা হল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি এটা ধীরে ধীরে বাড়ালে এই সংকট কেটে যাবে। তখন সাহিত্যনির্ভর সিনেমায়ও লগ্নিকারক পাওয়া যাবে।”
গত কয়েক দশকে সাহিত্যনির্ভর সিনেমা নির্মাণে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ভূমিকার কথা আসবে। প্রতিষ্ঠানটির প্রযোজনায় প্রায় ১৯০টি সিনেমার মধ্যে পঞ্চাশটিই সাহিত্যনির্ভর।
‘চিত্রনাট্যের সংকট’ কারণে সাহিত্যনির্ভর সিনেমা কম হচ্ছে বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর।
তিনি বলেন, “ভালো চিত্রনাট্যকার থাকলেও আমাদের জনপ্রিয় সাহিত্যের গল্প বা উপন্যাসের চিত্রনাট্য করতে তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। গুটিকয়েক মানুষ কাজ করছেন, তবে সংখ্যায় তারা খুব স্বল্প।”
তবে ‘সাহিত্যনির্ভর সিনেমায় প্রযোজকের আগ্রহ কম’–কথাটি ‘একেবারে সত্যি নয়’ বলে তিনি মনে করেন।
ফরিদুর রেজা সাগর বলেন, “সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র সবসময়ের জন্যই ছিল, সব সময়ই থাকবে। এর নির্মাতা থাকবে, প্রযোজক থাকবে, দর্শকও থাকবে। আগামীতে তরুণদের হাত ধরে চিত্রনাট্যের এই সংকটও কেটে যাবে।”
শিল্পীদের চোখে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের সংকট
অভিনয়শিল্পীরা মনে করছেন, বাণিজ্যিক চাপ, প্রযোজনার সংকট ও দর্শকের বদলে যাওয়া অভ্যাসের প্রভাব পড়েছে সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে।
অভিনেত্রী সুচন্দা বলেন, “আমাদের দেশে স্বনামধন্য লেখকদের প্রচুর রচনা রয়েছে। অথচ এগুলো নিয়ে সিনেমা নির্মাণের মানসিকতা কারও নেই। কোনো প্রযোজক অর্থলগ্নি করতে চান না। সবাই শুধু বাণিজ্যের পেছনে ছুটছে। শিল্পকে বাদ দেওয়ায় চলচ্চিত্র এখন অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। সরকারি অনুদান যা দেওয়া হয়, তা দিয়ে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”
অভিনেত্রীর আক্ষেপ, জহির রায়হানের ‘বরফ গলা নদী’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছে ছিল তার, তবে লগ্নিকারকের অভাবে সেটি আর বাস্তবায়ন হয়নি।
সুচন্দা বলেন, “সিনেমা আর এখন করা সম্ভব হবে না, আমার মত অন্যদেরও হয়ত ভালো সাহিত্য নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থাকলেও প্রযোজনা ও অর্থায়নের সংকটে অনেক পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় না।”
অভিনেতা তারিক আনাম খান বলেন, “এখন সাহিত্যনির্ভর সিনেমা কমে গেছে। কিন্তু একটা সময় ছিল ষাট সত্তর দশকে আমরা যারা কলকাতায় সিনেমা দেখতে যেতাম, তারা এসে বলতাম–‘বই দেখে এসেছি’। এরপর সেই ধারায় আমাদের এখানেও শরৎচন্দ্র, বঙ্কিম, তারাশংকরসহ বহু লেখকের কাহিনী নিয়ে সিনেমা হয়েছে।”
তিনি বলেন, সাহিত্য ও সিনেমার সম্পর্ক চিরকালের। জহির রায়হান নিজে লেখক ছিলেন, সৈয়দ শামসুল হক চিত্রনাট্য লিখেছেন।
চলচ্চিত্রে কাজ করা মানুষের সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে তার প্রভাব সংলাপ, চিত্রনাট্য ও নির্মাণের ওপর পড়ে বলেই মনে করেন এই তারিক আনাম।
তিনি বলেন, “‘যেটা লোকাল, সেটাই আল্টিমেটলি গ্লোবাল হয়’ চলচ্চিত্রে এই সত্যটা ভুলে যাওয়া হচ্ছে। হলিউডেও যেসব বই বেস্টসেলার হয়, সেগুলো পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়। এই সত্য বাংলাদেশের সিনেমাজগতের আয়নায়ও দেখা দরকার।”

অভিনেতা সোহেল রানা বলেন, সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র কমে যাওয়ার পেছনে চলচ্চিত্র ব্যবসার সামগ্রিক মন্দাও বড় কারণ।
তার ভাষায়, “আমরা যখন ‘মাসুদ রানা’ করেছিলাম, তখন চলচ্চিত্রের আবেদন অন্যরকম ছিল। এখন সিনেমা হল কমে গেছে, দর্শকের অভ্যাসও বদলে গেছে। আগে মানুষ গল্পনির্ভর সিনেমার জন্য হলে যেত, এখন সেই পরিবেশ আগের মতো নেই।”
এই অভিনেতা বলেন, “শক্তিশালী গল্প ও সাহিত্য একসময় বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছিল। সেগুলোতে আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের সমাজ, দেশের গল্প বলা হত। সেই চর্চা আবার ফিরিয়ে আনতে না পারলে চলচ্চিত্রের ধারা আরও সংকুচিত হবে।”
সমালোচকরা কী বলছেন?
সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র কমে যাওয়াটাকে একেবারে নেতিবাচকভাবে দেখেন না চলচ্চিত্র সমালোচক ও শিক্ষক ফাহমিদুল হক।
তার মতে, চলচ্চিত্র এখন নিজেই একটি স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে এবং এই দাঁড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায়ই সাহিত্যনির্ভরতা কমেছে।
“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার বলেছিলেন, চলচ্চিত্রকে সাহিত্যের দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া দরকার। সেই মুক্তি এখন অনেকটাই অর্জিত হয়েছে। চিত্রনাট্যকার এখন সরাসরি চলচ্চিত্রের জন্য গল্প লিখছেন, মাঝখানে সাহিত্যকে অ্যাডাপ্ট করার ধাপটা বাদ দিয়ে। এটা স্বাভাবিক বিবর্তন প্রক্রিয়া।”
সত্যজিৎ রায়ের প্রথম দিকের সিনেমাগুলো ‘পথের পাঁচালী’, ‘জলসাঘর’, ‘দেবী’ সবই ছিল সাহিত্যনির্ভর। কিন্তু পরের দিকে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘শাখাপ্রশাখা’, ‘আগন্তুক’ এগুলো তার নিজের গল্প। একই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশেও দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত প্রভাবে মানুষ এখন অনেক এগিয়ে, আগের সিনেমায় প্রেম, ভালোবাসার যে বিচ্ছিন্নতা বা অপেক্ষার অনুভূতি চলচ্চিত্রকে গভীর করে তুলত এখন সেই ভিজুয়ালি ইমাজিনেটিভ দৃশ্যকল্প তৈরি কঠিন।
“সিনেমা হল ও ওটিটির দর্শক এখন আলাদা হয়ে যাচ্ছে। হলে মানুষ বড় স্পেক্টাকল দেখতে যায়, ওটিটিতে জীবনঘনিষ্ঠ গল্প। সেই হিসেবে সাহিত্যনির্ভর সিনেমার জায়গা ওটিটিতে আরও বাড়তে পারে।”
ফেরার আশা
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র দর্শকমহলে আলোচনায় আসায় আবারও এই ধারার সিনেমা নিয়ে আশার কথা বলছেন নির্মাতারা।
তাদের ভাষায়, শক্ত গল্প ও সাহিত্যভিত্তিক নির্মাণের প্রতি দর্শকের আগ্রহ এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
রোজার ঈদে মুক্তি পাওয়া 'বনলতা এক্সপ্রেস' সিনেমাটি আলোচনায় আসার পাশাপাশি ব্যবসা করতে পেরেছে। মুক্তির পর থেকেই এটি দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল।
সিনেমার পরিচালক তানিম নূর বলেন, “আমার পরপর দুটি সিনেমাই সাহিত্যনির্ভর। সিনেমাগুলো প্রমাণ করেছে দর্শক চলচ্চিত্রের সঙ্গেই আছেন, তারা এই ধরনের সিনেমা দেখতে চান। অন্যরাও যদি সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসেন, তাহলে এই জায়গাটাও আশার আলো দেখাতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি।”

কোরবানির ঈদে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে ‘বনলতা সেন’ সিনেমা। জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত এই সিনেমার গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন পরিচালক নিজেই।
সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসা থেকেই সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন বলে জানান নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল।
তার ভাষায়, “এই সিনেমাটি নিয়ে আমার দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা রয়েছে। সিনেমাটির পেছনে ১০ বছর সময় ব্যয় করেছি। বাংলা সাহিত্য যে উচ্চ আসনে আছে, সেগুলো ধরে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে চলচ্চিত্রও অনেক উচ্চতর জায়গায় পৌঁছাতে পারে।”
উজ্জ্বল বলেন, “প্রত্যেক নির্মাতারই স্বপ্ন থাকে এমন একটি কাজ নির্মাণ করা, যা কয়েক প্রজন্ম ধরে মানুষ মনে রাখবে। সেই জায়গায় সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের বিকল্প নেই।”
এছাড়া এই ঈদে মুক্তি পাচ্ছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার প্রযোজনায় কাজী আনোয়ার হোসেনের ‘মাসুদ রানা’ অবলম্বনে সিনেমা ‘মাসুদ রানা’।
ওটিটিতেও সাহিত্যনির্ভর গল্প
প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও সাহিত্যনির্ভর গল্প নিয়ে নির্মাণের আগ্রহ বাড়ছে বলে মনে করছেন নির্মাতারা।
কোরবানির ঈদে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আইস্ক্রিনে মুক্তি পাচ্ছে ‘সারার সংসার’ সিনেমা। প্রয়াত লেখক কাজী আনোয়ার হোসেনের উপন্যাস ‘আর্তনাদ’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি।

সিনেমার পরিচালক আকা রেজা গালিব বলেন, “ওটিটিও একটা বড় সম্ভাবনাময় জায়গা। সাহিত্যনির্ভর সিনেমার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এখানে শক্ত একটা গল্প থাকে। ভালো নির্মাণের সবসময়ই চাহিদা থাকে। ওটিটিতে যেহেতু সব ধরনের কাজ হচ্ছে, সেক্ষেত্রে সাহিত্যের জন্যও বড় একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।