Published : 08 Sep 2025, 03:04 PM
লালন সাঁইয়ের গানে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া শিল্পী ফরিদা পারভীনের উন্নত চিকিৎসায় সরকারকে পাশে চাইছেন তার বড় ছেলে ইমাম নিমেরী।
তার চাওয়া, রোগব্যাধিতে নিরন্তর ধুঁকতে থাকা ফরিদা পারভীনকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর বিষয়ে সরকার যেন উদ্যোগী হয়।
৭১ বছর বয়সী ফরিদা পারভীনের অসুস্থতা দীর্ঘদিনের। কিডনি সমস্যা ও ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতা রয়েছে তার। কিডনি ডায়ালাইসিস চলছে নিয়মিত।।
এর আগে টানা দুই সপ্তাহ হাসপাতালে থাকার পর সুস্থ হয়ে গেল ২১ জুলাই বাসায় ফিরেছিলেন ফরিদা পারভীন। চিকিৎসকের বেঁধে দেওয়া নিয়মের বেড়াজালেই দিন কাটছিল তার। এর মধ্যে খবর আসে গেল ২ সেপ্টেম্বর আবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে এই শিল্পী।
তবে শিল্পীর এবারের অবস্থা ‘গুরুতর’ বলছেন চিকিৎসকরা। তাকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ইমাম নিমেরী গ্লিটজকে বলেছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে তার মায়ের চিকিৎসার সব খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “ফরিদা পারভীনের আর্থিক ক্রাইসিস না থাকলে তো তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হত, অন্য বড় হাসপাতালে নেওয়া হত। বারবার ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় কেন এই কারণ তো জানতে চায় না কেউ। সরকার থেকে উনাকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করানো হোক এটা আমার চাওয়া।
“গত জুলাই মাসে উনি যখন বাসায় ফিরলেন তখন উনাকে কিছুদিন অবজার্ভেশনে রেখে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।”
জুলাই মাসে ফরিদা যখন হাসপাতালে ছিল, তখনও পরিবারের পক্ষ থেকে তার উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে ইমাম নিমেরী বলেন, “ফরিদা পারভীনের অর্থসম্পদ বলতে উনার কুষ্টিয়ার বাড়ির ভাড়া, আর গান থেকে যে আয় আসত। এটা লজ্জার কিছু নেই, আমাদের আর্থিক সমস্যার কথা বলতে। উনার ছেলেমেয়েরা সবাই চাকরীজীবী। আমাদের বেতন থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা খরচ করা সম্ভব হচ্ছে না।"
সরকার দায়িত্ব নিলে ফরিদা পারভীনের চিকিৎসায় ভিন্নতা আসতে পারত বলে মনে করেন নিমেরী।
“আমরা বারবারই বলছি সরকার যদি চিকিৎসায় সহযোগিতা করতেন, দেখতেন কোন জায়গায় পাঠালে মায়ের ভালো চিকিৎসা হবে। তাহলে মা এই যাত্রায় বেঁচে যাইতেন।
“অনেক কিডনি রোগী আছে যারা আমাদের কাছে এসে গল্প করেন কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করে এখন তিনি সুস্থ। এসব শুনলে আমাদের খারাপ লাগে। মায়ের মত একজন ব্যক্তি সারা বাংলাদেশে একজনই। তার জন্য এই সুবিধাটুকু কেন পাওয়া যাচ্ছে না তা বুঝতে পারছি না।”
গত ২ সেপ্টেম্বর ডায়ালাইসিস করাতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন ফরিদা পারভীন। ডায়ালাইসিসের পর তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে তাকে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিকিৎসক আশীষ কুমার চক্রবর্তী বলেছিলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই তো কিডনি জটিলতায় ভুগছেন ফরিদা পারভীন। উনাকে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস করাতে হয়। মঙ্গলবার ডায়ালাইসিসের পর উনার বমি শুরু হয়, হিমোগ্লোবিন কমতে থাকে এবং উনার ‘ইন্টার্নাল ব্লিডিং’ হয়। তারপর দ্রুত আইসিইউতে নেওয়া হয়।
“উনার শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে, এবারের অবস্থা আগে থেকে কিছুটা জটিল।”
চিকিৎসক আশীষ আরও বলেন, “কিডনি ফেইলিউর কোনো রোগীর অবস্থা নিয়ে আগে থেকে বলা যায় না। উনি যখন জুলাই মাসে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরছিলেন, তখন বলেছিলাম উনার হয়ত আবারও হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। আমরা উনার সুস্থতার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
এবছরে ফরিদা পারভীনকে এ নিয়ে তিন দফা হাসপাতালে যেতে হল। প্রথবার
ফেব্রুয়ারিতে শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে ১৩ দিন হাসপাতালে থেকে বাসায় ফেরেন তিনি। এরপর ৫ জুলাই তাকে আবারও হাসাপাতালের আইসিইউতে রাখা হয় তাকে।
জুলাইয়ে ফরিদা পারভীনকে দেখতে হাসপাতালে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মেডিকেল বোর্ড গঠনের দাবি রেখেছিলেন। এরপর মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তার চিকিৎসা করা হয়।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও ফরিদা পারভীনের চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়েছিলেন সেবার।
নজরুলসংগীত ও দেশাত্মবোধক গান দিয়ে সংগীত জীবন শুরু করলেও পরে তিনি ভিড়ে যান লালনের গানে। এরপর জীবনভর লালনগীতি চর্চাতেই ডুবে থেকেছেন এই শিল্পী।
সংগীতাঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। ২০০৮ সালে জাপান সরকারের ‘ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচার’ পুরস্কার পান তিনি।
বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন এই শিল্পী। সেরা প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৯৩ সালে।
ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনের গানের যে চর্চা হয়ে এসেছে গেল পাঁচ দশক ধরে, সেটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে প্রায় ১৬ বছর আগে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'অচিন পাখি সংগীত একাডেমি'। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা, প্রতিষ্ঠানের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়া এবং নিজস্ব ভবন না থাকায় এ প্রতিষ্ঠানটিও টিকে থাকার লড়াইয়ে।
আরও পড়ুন-