Published : 15 Jun 2026, 11:28 AM
গানেরে সুর, নৃত্য আর কবিতার আবহে আষাঢ়ের প্রথম সকালে রাজধানীতে ‘বর্ষা উৎসব' উদযাপন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
বর্ষার চিরন্তন রূপ, জীবন-প্রকৃতি আর বাঙালি সংস্কৃতিতে এর গভীর প্রভাবকে তুলে ধরতে প্রতিবারের মত এবারও বর্ণিল আয়োজনে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়।
বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চের এবারের উৎসবের প্রতিপাদ্য 'আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে'। পুরো আয়োজন জুড়ে ছিল বর্ষার গান, কবিতা আর নাচের পরিবেশনা।
সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় শিল্পী জাবীর ইমাম খান শাহীর রাগ ‘মিয়া কি মল্লার’ এর সুরমূর্ছনার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
এরপর কামরুল হাসান ফেরদৌসের পরিচালনায় ‘বহর’ নৃত্যদলের দলীয় নৃত্য পরিবেশিত হয়। দলীয় নৃত্যের পর মঞ্চে আসেন নজরুল সংগীত শিল্পী মাহমুদুল হাসান। তিনি দুইটি একক গান গেয়ে শুনিয়েছেন। 
এরপর নজরুল মঞ্চে আবারও ‘বহর’ নৃত্যদলের নৃত্যশিল্পী দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন।
সংগীত পরিবেশন করেন উদীচী ঢাকা মহানগর, পরবর্তী পর্বে লোকগানের সুরে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন লোকসংগীত শিল্পী বিমান বিশ্বাস। তিনি পরিবেশন করেন উকিল মুন্সীর 'আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে'।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনার একপর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘বর্ষা কথন ও আলোচনা’ পর্ব।
এবারের বর্ষাকথন উপস্থাপন ও পাঠ করেন উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক একরাম হোসেন।
বর্ষা কথন ও আলোচনা পর্বে অংশ নেন লেখক, গবেষক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা, উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম এবং সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন।
অনুষ্ঠানে লিখিত বর্ষাকথন পাঠের পর দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সংকট তুলে ধরে ছয়টি দাবি উপস্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক তপন৷
তিনি বলেন, "আমরা এমন এক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এবারের বর্ষা উৎসব করছি, যেখানে সর্বত্র অস্থিরতা ও সীমাহীন উদ্বেগ বিরাজ করছে।"
দেশের পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারের কাছে ছয়টি দাবি তুলে ধরেন তিনি।

দাবিগুলো হলে:
১. প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে কোনো প্রকল্প বা স্থাপনা গড়া চলবে না। শহরে সৌন্দর্য বর্ধনের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা এবং বন্যপ্রাণীর আবাসন ধ্বংস করা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
২. ভারতের আধিপত্য ও স্বার্থরক্ষাকারী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাতিল করে সুন্দরবন রক্ষার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
৩. দেশের সব নদীর নাব্য ফিরিয়ে এনে নদীভিত্তিক জীবনপ্রবাহ সচল করতে হবে, দখল হওয়া নদী উদ্ধার এবং হাওরের বুকে সব ধরনের ক্ষতিকর বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
৪. অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীতে ভারতের একতরফা বাঁধ ও পানি প্রত্যাহারের ফলে উত্তরবঙ্গে সৃষ্ট মরুকরণ রোধে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে।
৫. দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া প্রায় এক কোটি জলবায়ু উদ্বাস্তুর বাসস্থান ও জীবিকার জন্য সুচিন্তিত প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
৬. বর্ষা ও বন্যার মৌসুমে ফসলহানি এবং কর্মহীনতার শিকার গ্রামীণ কৃষক, ক্ষেত-মজুর ও শহুরে শ্রমজীবী মানুষের জন্য অবিলম্বে 'রেশন' ব্যবস্থা চালু করতে হবে
এই বর্ষাকালে গাছ থেকে কদম ফুল না ছেঁড়ার আহ্বান জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা।
তিনি বলেন, "এই কদম ফুল পাখিদের খাদ্য। এই বর্ষায় আমরা সকলে যেন কোনো গাছ থেকে কদম ফুল না তুলি, রাস্তায় কদম ফুল না কিনি।"
আলোচনা সভা শেষে উদীচীর দ্বিতীয় পর্বের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একক সংগীত নিয়ে মঞ্চে আসেন রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী অনিমা রায়।

গান গেয়ে শোনান মীর সাখাওয়াত।
একক সংগীতের পরে অনিক বসুর পরিচালনায় মঞ্চে আসে ‘স্পন্দন’ নৃত্যদল, তারা দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন।
এরপর একে একে একক সংগীত পরিবেশন করেন রুদ্র দাস, মায়েশা সুলতানা উর্বি।
গানের এই পর্বের মাঝে একক আবৃত্তি করেন সজীব তানভীর।
সমবেত সংগীত পরিবেশন করে উদীচীর উত্তরা শাখা।
উৎসবের শেষভাগে একে একে মঞ্চে এসে একক সংগীত পরিবেশন করেন হুমায়রা তাসিন, অদ্বয় স্যান্যাল আর্য এবং জাকির হোসেন। সবশেষে উদীচীর ডেমরা শাখার বিশেষ দলীয় পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি হয়।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন মৌমিতা জান্নাত, সজীব তানভীর, রুমি দে এবং আজাদ অরণ্য।