Published : 19 Jan 2026, 04:24 PM
ষাট দশক আগে কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায় রবি ঠাকুরের চারুলতা ও অমলকে পর্দায় তুলে ধরে দর্শককে উপহার দিয়েছিলেন দুটি কালজয়ী চরিত্র। এরপর আরো অনেক সিনেমা, থিয়েটারের মঞ্চে সহশিল্পী হয়েছেন ওই দুই চরিত্রের শিল্পী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়।
জীবনকে ছুটি দিয়ে অনন্তলোকে পাড়ি দেওয়া সৌমিত্রর ৯১তম জন্মবার্ষিকী সোমবার। অভিনেতার জন্মদিনে তাকে নিয়ে স্মৃতিকাতর হয়েছেন মাধবী।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মাধবীর কথায়, একজন ভালো অভিনেতা হওয়ার জন্য যা যা গুণ থাকা প্রয়োজন, সেগুলোর সব তিনি দেখেছেন সৌমিত্রর মধ্যে।

কলকাতার সংবাদমাধ্যম ‘এই সময়’কে মাধবী বলেন, “থিয়েটার, সিনেমায় যেমন সৌমিত্রবাবুর একসঙ্গে অভিনয় করেছি, তেমনই বিদেশে ঘুরতেও গিয়েছি কাজের সূত্রে বহু বার। কত যে স্মৃতি জীবনজুড়ে, সেগুলো আসলে ভুলে যাওয়ার নয়। এক জায়গায় কাজ করলে এমন নানা স্মৃতির মালা তো তৈরি হয়, যা হয়তো সবসময় অনুভূতি দিয়ে ব্যক্ত করা সম্ভব নয়।
“একটা মানুষের যত রকমের গুণ থাকলে ভালো অভিনেতা হওয়া যায়, সৌমিত্রবাবুর মধ্যে তার সব গুণই ছিল। সুর, তাল, ছন্দ যাকে বলে। মিউজিক সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান ছিল।”
সৌমিত্র নাটকের নির্দেশনাও দিয়েছেন। সে প্রসঙ্গে মাধবী বলেন,”তার পরিচালনায় দুটো নাটকে অভিনয় করেছি। গানের সুর দিয়ে সেই গানগুলো স্টেজে হত সেটা করতে পারতেন। এমন অনেক কাজ মঞ্চের জন্য তিনি পারতেন যেটা অনেকে ভাবতেও পারবে না।”
মাধবী বলেন, “পড়াশোনা ছিল প্রচুর মানুষটার। একটা চরিত্রের জন্য সৌমিত্রবাবু যেভাবে পড়াশোনা করতেন, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। যখন যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন, সেটা সঠিক ভাবে ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘নষ্টনীড়’ নিয়ে ১৯৬৪ সালে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র চারুলতা। দর্শক-চিত্র সমালোচকদের কাছে তো বটেই, সত্যজিৎ নিজেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ‘চারুলতা’কে তার অন্যতম প্রিয় সিনেমা হিসেবে অবহিত করেছেন।
সেই সিনেমা নিয়ে মাধবী বলেন, “আমাদের ‘চারুলতা’র কথা এখনও মানুষের মুখে মুখে। এর পেছনে যে মানুষটা ছিলেন তিনি অবশ্য সত্যজিৎ রায়।
“যার চোখ ক্যামেরায় পড়লেই কাউকে কিছু চিন্তাভাবনা করতেই হত না। চরিত্রটা নিয়ে ভাবতেই হতো না। শুধু চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করতে হবে নিজ ভঙ্গিতে। আমার, সৌমিত্রবাবু সকলের ক্ষেত্রেই তাই। অভিনয়ের তো শর্তই হল সব সত্ত্বাগুলোকে মনে রাখা। কেউ যখন অভিনয় করছে তখন সে একটা মানুষ। আবার কখনও দর্শকের জায়গা থেকে ভাবতে হবে আপনি কী দেখছেন। সেটা ভালোলাগছে কি না, যে বিষয়ে নজর রাখা ভীষণ প্রয়োজন।”
শুরুতে আবৃত্তি ও মঞ্চনাটকে ব্যস্ত সৌমিত্র চলচ্চিত্র নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তবে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ তার মন বদলে দেয়।
ছয় দশকের ক্যারিয়ারে তিনশর বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এই শিল্পী। মৃণাল সেন, তপন সিনহা, তরুণ মজুমদার, গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেনদের সঙ্গেও কাজ করেছেন।
সাত পাকে বাঁধা, চারুলতা, বাক্স বদল, আকাশ কুসুম, মণিহার, কাঁচ কাটা হীরে, ঝিন্দের বন্দী, অরণ্যের দিনরাত্রি, সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ, হীরক রাজার দেশে, ঘরে বাইরে, আবার অরণ্যের মত সিনেমার মধ্য দিয়ে সৌমিত্র স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন দর্শকের হৃদয়ে।
অভিনয় ছাড়াও নাটক ও কবিতা লিখেছেন তিনি, যুক্ত হয়েছেন মঞ্চ নাটকের নির্দেশনায়, দ্যুতি ছড়িয়েছেন আবৃত্তির মঞ্চেও।
সৌমিত্রর অভিনয় নিয়ে মাধবী বলেন, “তার অভিনয় নিয়ে কোনো কথা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। তাই অমল আর চারুলতার জন্য হয়ত পরিচালক মহাশয় শুধু সৌমিত্র আর মাধবীকেই ভেবেছিলেন। আজও সেই সিনেমা দর্শকের হৃদয়জুড়ে। সৌমিত্রবাবুর মতো অভিনেতারা তো ক্ষণজন্মা। যা উপহার দিয়েছেন ইন্ডাস্ট্রিকে তা আজীবন থেকে যাবে।”
১৯৩৫ সালে ১৯ জানুয়ারি নদীয়ার কৃষ্ণনগরে এক সাংস্কৃতিক পরিবারে তার জন্ম। বাবা মোহিত কুমার চট্টোপাধ্যায় একজন আইনজীবী ও মঞ্চঅভিনেতা। মা আশালতা চট্টোপাধ্যায়ও যুক্ত ছিলেন মঞ্চনাটকে; তিনি স্থানীয় নাটকের দল ‘প্রতিকৃতি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
অপু ট্রিলজির দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘অপরাজিত’র অপু চরিত্রের জন্য অভিনয়শিল্পী খুঁজছিলেন সত্যজিৎ রায়। আর সত্যজিতের সহকারী নিত্যানন্দ দত্তের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল সৌমিত্রর।
সেই সূত্রে অডিশন দিতে গেলেও চরিত্রের সঙ্গে বয়সের তারতম্যের কারণে সেবার সুযোগ মেলেনি তার। তবে সৌমিত্রকে মনে ধরেছিল সত্যজিতের। ১৯৫৯ সালে অপু ট্রিলজির শেষ চলচ্চিত্র ‘অপুর সংসার’ এ তরুণ অপুর চরিত্রে সৌমিত্রকেই তিনি বেছে নেন।
সেই সিনেমায় সৌমিত্রের সঙ্গে অভিষেক ঘটে ১৩ বছর বয়সী শর্মিলা ঠাকুরের। সিগারেটের প্যাকেটে লেখা ‘খাওয়ার পর একটা করে, কথা দিয়েছ’র মত দৃশ্য আর সৌমিত্র-শর্মিলা জুটির সেই রসায়ন দর্শকের মনে এখনও অমলিন।

সত্যজিতের ৩৪টি সিনেমার মধ্যে ১৪টিতেই অভিনয় করেছেন সৌমিত্র। অপুর পর সত্যজিতের সৃষ্টি আরেক চরিত্র ফেলুদাকে সিনেমার পর্দায় সৌমিত্র নিয়ে গেছেন অন্য মাত্রায়।
চলচ্চিত্রে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ছাড়াও ফ্রান্স সরকারের ‘লিজিয়ন অব দ্য অনার’ পদকে ভূষিত হয়েছেন এই অভিনেতা। ২০০৪ সালে তাকে ‘পদ্মভূষণ’ খেতাবে ভূষিত করে ভারত সরকার।
ধর্মের নামে গোঁড়ামি ও বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মার্কসবাদী) সমর্থক ছিলেন, তিনি ছিলেন বিজেপি সরকারের কড়া সমালোচকদের একজন।
সৌমিত্র চলে যান কোভিড মহামারীর বছর ২০২০ সালে। কলকাতার বেলভিউ ক্লিনিকে ৮৫ বছরে মারা যান সৌমিত্র।