Published : 04 Jun 2026, 09:10 PM
পদ্মা সেতু হওয়ার পরে লোকে বরিশালে যাওয়ার জন্য কী ব্যবহার করে সাধারণত? লঞ্চ না বাস?
একথার উত্তর সবাই জানেন। খুব শখে বা, নেহাত বাধ্য না হলে, সেই গন্তব্যে যেতে লঞ্চ আর তেমন ব্যবহার করেন না কেউ। ঈদ-পার্বণের কথা আলাদা।
তো, এ্আই আসার পর লোকে কেন সেটার সাহায্য না নিয়ে অনুবাদ করবে এত সময় ব্যয় করে এত কষ্ট করে? ওল্ড স্কুলের অনুবাদকরা হয়ত পুরানো পরিশ্রমসাধ্য দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ পদ্ধতিতেই কাজটি করবেন, তা সে পুরানো মূল্যবোধ থেকেই হোক, বা তত ‘টেকি’ না হওয়ার কারণেই হোক। কিন্তু তরুণরা এখনো কেন সেই ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে থাকবেন? বা, আরো গভীরে গিয়ে বলতে হয়, তারা কি আদৌ ধারণা করতে পারবেন / বা পারেন যে কি ভয়ানক কষ্ট করে কত সময় নিয়ে একেকটা অনুবাদ করা হতো, বা এখনো মাঝে মাঝে করা হয়?
তো, সেই ঐতিহ্য যদি আঁকড়ে ধরে না থাকেন কেউ, এআই দিয়েই যদি করেন কাজটা, তাহলে অনুবাদক হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব কতটা? ব্যাপারটা তো স্রেফ এমন না যে আগে লেটার প্রেসে বইপত্র ছাপা হতো, কিন্তু অনেকদিন ধরেই কাজটা কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে হচ্ছে। তাতে সংবাদকর্মীর কৃতিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে না।
অনেকেই প্রশ্ন করবেন যে এআই কি ফিকশন ও নন-ফিকশন দুটোই সমান দক্ষতায় তরজমা করতে পারে? যতটুকু জানি, বিশেষ ক’রে নগদ নারায়ণ দিয়ে কেনা এআই, বেশ ভালোই পারে। নন ফিকশন তো খুবই ভালো পারে। অনেক ফিকশন-ও বেশ ভালোই পারে। ধীরে ধীরে তার দক্ষতা ঈর্ষণীয় (বা, আশংকাজনক) জায়গায় চলে যাচ্ছে।
তবে, ফিকশন হোক বা নন-ফিকশনই হোক, কেউই তো আর এআই দিয়ে অনুবাদ করে তা সটান বাজারে ছেড়ে দেয় না বা প্রকাশকের কাছে পাঠায় না, আর প্রকাশক-ও তা ভারবেটিম ছাপিয়ে দেন না, তা যতই নবীন বা অনভিজ্ঞ প্রকাশকই হোক। কিছুটা সম্পাদনা করতেই হয়। সেই সম্পাদনা কে করেন? কে আর করবেন? সাধারণত, অনুবাদকই করেন।
যাই হোক, সেই আগের প্রশ্নে ফেরা যাক। এভাবে সম্পাদিত একটি অনুবাদকের কৃতিত্ব কাকে দেবো আমরা? অনুবাদক হিসেবে বইয়ে কার নাম যাবে? দেখা তো যাচ্ছে, এক্ষেত্রে সম্পাদকের একটা ভূমিকা থাকছে, তা সেই সম্পাদনা এ আই-এর সাহায্য নিয়ে করা “অনুবাদক”-ই (বা, কাঁঠালের আমসত্ব অনুবাদক”) করুন, বা অন্য কোনো সম্পাদক করুন। বইয়ে তাহলে কার নাম যাবে? এআই-এর নাম? নাকি এআই দিয়ে অনুবাদ ক’রে অনূদিত টেক্সট যিনি প্রকাশকের কাছে পাঠালেন তাঁর নাম, অনুবাদক ও সম্পাদক হিসেবে? আর, সম্পাদনা অন্য কেউ করলে, সেই “কাঁঠালের আমসত্ব অনুবাদক” আর সম্পাদনাকারী দুজনেরই নাম (২য় জনের নাম সম্পাদক হিসেবে, বিশেষ ক’রে যেহেতু সেখানেই কিছু কাজ করা হয়েছে)?
তাছাড়া, সেই “কাঁঠালের আমসত্ব অনুবাদক” কি তখন স্বীকার করবেন যে অনুবাদটি আসলে এআই দিয়ে করিয়ে খানিকটা সম্পাদনা করা হয়েছে?
এতো গেল অনুবাদকের দিক থেকে ব্যাপারটা।
পাঠক কী করবেন? তার কাছে কী গুরুত্বপূর্ণ? তিনি তো একটা ভালো অনুবাদ পড়তে চান। সেটা কে করল – এআই না মানুষ -- তা কি তাঁর কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ? হাতে কলমে করা অনুবাদ যদি এআই দিয়ে করা অনুবাদের চাইতে ভালো না হয়, কেন তাহলে তিনি সেই ‘খারাপ’ অনুবাদটা পড়বেন? তিনি তো আশা করবেন তাঁর প্রিয়জনের দেখা পেতে, যত তাড়াতাড়ি ও নিরাপদে, সম্ভব। তিনি কেন চাইবেন সেই একই প্রিয়জন লঞ্চ চেপে দেরি করে তাঁর কাছে আসবেন?
আর যিনি প্রকৃত অর্থেই নিজের অমূল্য সময় ব্যয় করে পরিশ্রম করে অনুবাদের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার আনন্দ উপভোগ করে একটি বই অনুবাদ করতে চান (তা সে চাওয়া যতই বিলাসী বা উচ্চাকাঙ্ক্ষী চাওয়া হোক) তাঁর কী হবে? তিনি হয়ত দেখবেন তাঁর লঞ্চ নির্দিষ্ট ঘাটে পৌঁছুবার অনেক আগেই বাস চলে এসেছে স্টপেজে। তাঁর পছন্দ করা বইটির (একাধিক) অনুবাদ বাজারে চলে এসেছে সেই সময়ের মধ্যে, আর তার ফলে (বিশেষ করে আমাদের ছোট) বাজারটা ধরে ফেলেছে আগেই এআই দিয়ে অনুবাদ করা বই। তিনি কি হতাশ বোধ করবেন না? তাছাড়া, তিনিও কি প্রলুব্ধ হবেন না এআই ব্যবহার করে দ্রুত অনুবাদ করতে? কতদিন তিনি এই প্রলোভন ঠেকিয়ে রাখবেন? কত দিন তিনি ও তাঁর প্রকাশক ধৈর্য ধরবেন?
নাকি অনুবাদ করাই ছেড়ে দেবেন তিনি? নাকি স্রেফ একজন সম্পাদক হওয়াই ধীরে ধীর অনুবাদকে পরিণত হওয়ার অনিবার্য নিয়তিই মেনে নিতে হবে তাঁকে? সেটাই নিয়তি হয়ে দাঁড়াবে, এবং আমরা অনুবাদককে বলব, শচীন দেববর্মনের সেই কালজয়ী গানের অনুসরণে, “তুমি আর নেই সে তুমি”?