Published : 28 Jun 2025, 10:15 AM
ফেলে আসা শতকের নব্বই দশকে ‘মাইলস’, ‘সোলস’, ‘ফিডব্যাকের’ মত যেসব ব্যান্ডের হাত ধরে বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের গণজোয়ার এসেছিল, তিন দশক পেরিয়ে এখনো সেসব গান ফেরে মানুষের মুখে মুখে। কেবল ভক্তশ্রোতাদের মুখে নয়, এই দলগুলোর শিল্পীরা তাদের কনসার্টেও পুরনো গানে দর্শক মাতান।
আর কনসার্টে দর্শকদেরও আবদার থাকে প্রিয় শিল্পীদের কণ্ঠে ফেলে আসা দিনের গান শোনার জন্য।
ব্যান্ড দলগুলোর নতুন গান এলেও কেন সেগুলো জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না বা হারিয়ে যাচ্ছে, সেই কারণ খুঁজতে গ্লিটজ কথা বলেছে কয়েকজন শিল্পী সঙ্গে।
দীর্ঘ পথচলায় এসব ব্যান্ডের নতুন গান যে আসছে না–তা নয়, সেসব তারা গাইছেনও। কিন্তু মাইলসের হামিন আহমেদ, আর্কের আশিকুজ্জামান টুলু বা সোলসের নাসিম আলী খানসহ পুরনো অনেক গায়কেরই ভাষ্য, নতুন গানের লিরিকে ‘দুর্বলতা’ আছে, ফলে সেগুলো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে না, সে কারণে স্থায়িত্বও পাচ্ছে না।
পুরনো শিল্পীরা এও বলেছেন, হুট করে তারা নতুন গান আনতে চান না, কারণ শ্রোতারা পুরনো গানের সঙ্গে পার্থক্য করে বসেন সহজেই।
এদিকে দর্শকরা বলছেন, কনসার্টে গেলে নব্বইয়ের দশকে আর্কের ‘সুইটি’, জেমসের 'মীরাবাঈ', মাইলসের 'নীলা তুমি', এলআরবির 'সেই তুমি', সোলসের 'মন শুধু মন ছুঁয়েছে', ফিডব্যাকের 'মেলা', ওয়ারফেজের 'একাকী', প্রমিথিউস ব্যান্ডের 'চান্দের বাতির কসম দিয়া' শুনতে তারা উদগ্রীব থাকেন।
তারা শুনতে চান রেনেসাঁর 'হৃদয় কাদামাটির কোনো মূর্তি নয়', ডিফারেন্ট টাচের 'শ্রাবণের মেঘগুলো', ব্ল্যাক ব্যান্ডের ‘আমার পৃথিবীও’।
উল্টো চিত্রও আছে। বহু শ্রোতা আছেন, যারা নতুন গান শুনতে চান, শিল্পীরা পুরনো গান ধরলে তাদের মধ্যে তৈরি হয় বিরক্তি।
তবে নব্বইয়ের ব্যান্ডগুলোর তুলনায় নতুন ব্যান্ডগুলো গান, অ্যালবাম প্রকাশ করছে নিয়মিত।
'চিরকুট', 'নেমেসিস', 'ভিআইপি', ‘মেঘদল’, ‘শিরোনামহীন’সহ আরো বহু ব্যান্ড বছর বছর নতুন গান প্রকাশ করছে।
পুরনোর সঙ্গে নতুনের তুলনা
মাইলস, আর্ক, নগরবাউল, এলআরবি, দলছুট, বাংলাদেশ, ওয়ারফেজ, উইনিং, ফিডব্যাক, রেনেসাঁ, পেপার রাইম, প্রমিথিউস, ব্লু বার্ডস, ব্লু হরনেট, ব্লু ওশান, কেইডেন্স, ডিফারেন্ট টাচ, ডিজিটাল, ড্রিমল্যান্ড, সিম্ফনী, মিউজিক টাচ, নিউ ইভস, অডেসি, অরবিট, অভেশন, পালস, স্পার্ক, স্টারলিং, স্পারটানের মত দলগুলো গত শতকের শেষ কয়েক দশকের ব্যান্ড সংগীতের পরিচিত নাম।
ফরিদ রশিদের হাত ধরে ১৯৭৯ সালে হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদ গড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘মাইলস’। দুটি ইংরেজি গানের অ্যালবামের পর মাইলসের বাংলা গানের প্রথম অ্যালবাম ‘প্রতিশ্রুতি’ বের হয় ১৯৯১ সালে। তাদের জনপ্রিয়তা শুরু মূলত নব্বইয়ে।

এরপর ‘চাঁদ তারা সূর্য’, ‘প্রথম প্রেমের মতো’, ‘গুঞ্জন শুনি’, ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘ধিকি ধিকি’, ‘পাহাড়ি মেয়ে’, ‘নীলা’, ‘পিয়াসী মন’সহ বহু গান দিয়ে দেশের শ্রোতা মনে জায়গা করে নিয়েছে দলটি।
এমন একটি দলের নতুন গান নেই প্রায় দশ বছর হল। 'প্রতিচ্ছবি' তাদের সর্বশেষ অ্যালবাম, যা প্রকাশ হয় ২০১৫ সালে।
গান নিয়ে কেন এত দীর্ঘ বিরতি? দলের ভোকালিস্ট হামিন আহমেদ বলেলেন, ২০১৯ সালে ৪০ বছর পূর্তির আয়োজনের পরই থেমে যায় গতি। প্রথমে কোভিড মহামারী, পরে ব্যান্ডের ভেতরের সংকট, অর্থাৎ তার ভাই শাফিন আহমেদের মাইলস ছেড়ে একক দল তৈরি করার বিষয়গুলো ছাপ ফেলে মাইলসের ওপরে।
“এরপর শাফিনের মৃত্যু সবকিছু মিলিয়ে আমাদের মূল কাজের যে জায়গা তা থেকে অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছে।"
হামিনের কথায়, 'শ্রোতাদের প্রত্যাশা ও গানের মান' এই দুইয়ের ভারেই ‘মাইলস’ কিছুটা ধীরে আগাচ্ছে।
“হুট করে গান প্রকাশের পক্ষপাতী আমরা নই। নতুন গান এলেই তা আগের গানের সঙ্গে তুলনা হয়। সেই তুলনায় টিকতে হলে গানকে আরও সময় দিতে হয়।”
তবে কাজ থেমে নেই, মাইলসের হাতে ছয় থেকে সাতটি গান করা আছে যা ‘চমক’ হিসেবে রাখা হয়েছে জানিয়ে হামিন বলেছেন, চলতি বছরেই সেগুলোর কোনোটি আলোর মুখ দেখতে পারে।
ভালো গানের ‘অভাব’
নব্বইয়ের গানগুলোর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কাছে, নতুন গান কেন জায়গা নিতে পারছে না– এ প্রশ্নে হামিন বলেন, “একটা গান জনপ্রিয় হতে হলে প্রথম যে শর্ত সেটা হল গানটি ভালো হতে হবে। গান হিট হওয়া আর সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া দুটো আলাদা ব্যাপার। এখন গান হিট হয় কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা পায় না। অনেক ব্যান্ডের ভালো গান হচ্ছে, কিন্তু সেটা সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না।"

বর্তমান সময়কে 'ডিসপোজেবল যুগ' হিসেবে বর্ণনা করলেন নজরুলগীতির কিংবদন্তী শিল্পী ফিরোজা বেগম ও সুরকার-গীতিকার কমল দাশগুপ্তের ছেলে হামিন।
তার ভাষ্য, এখনকার দিনে ইউটিউবে একটা গান ছাড়ার অর্থ হল সারা বিশ্বের মধ্যে গানটা ছেড়ে দেওয়া।
“এই গানগুলো কিন্তু পার্টিকুলার শ্রোতা গোষ্ঠী বা বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যেই ছড়াচ্ছে না। একটা গান প্রকাশ পেল সেটা যে সাথে সাথে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তাও না। মানুষ এখন গানের খবর জানেই না।
“একটা গান আজ ভালো লাগছে, কাল ভুলে যাচ্ছে সবাই। ইউটিউব বা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে গান এলে সেটা কোটি ভিউ পেলেই যে সত্যিকারের শ্রোতা তৈরি হচ্ছে তা নয়। এখনকার গানগুলো স্থায়িত্ব পাচ্ছে না।”
নব্বইয়ের ক্যাসেট, অ্যালবাম বা পরবর্তীতে সিডির সেই যুগটাও গানের জনপ্রিয়তার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন এই শিল্পী।
হামিন বলেন, "নব্বইয়ের দশকে শ্রোতারা কিন্তু হাতে নিয়ে গানটি শুনত। আগে মানুষ নিজের টাকায় ক্যাসেট বা অ্যালবাম কিনত, সেগুলো ঘরে থাকত, পড়ার টেবিলে, বৃষ্টির রাতে সেগুলো শুনত। ৬৫ টাকায়, ৫০ টাকায় একটা অ্যালবাম কিনে সেই গান নিজের সম্পত্তি মনে করত। সেই সময়ে গানগুলো শ্রোতার ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে মিশে যেত। এখন সবাই ফ্রিতে গান শোনে এবং তাদের সামনে এত এত অপশন। একটা গান বারবার কেন শুনবে?"
অ্যালবাম বা সিডির সেই যুগটা পড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়িক দিক থেকেও গানের সেই বাজারটা ধরা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করলেন এই শিল্পী।
"আগে গানগুলো দর্শকপ্রিয়তার পাশাপাশি আর্থিক বিষয়টাও ছিল। এখন মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ হলেই যে হাইপটা ওঠে, তাদের আয়টা কিন্তু সেরকম না। আগে গান রিলিজের জন্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছিল, এখনকার পরিস্থিতিতে গানের খরচা উঠানোই কষ্টকর। গানের সেই ব্যবসাটা পড়ে গেছে। এখন মানুষ ফ্রিতে গান শোনে।"
গভীরতা নেই?
সংগীতশিল্পী আশিকুজ্জামান টুলুর নেতৃত্বে ১৯৯০ সালে ‘আর্ক’ যাত্রা শুরু করার পর যোগ দেন পঞ্চম ও হাসান। নব্বইয়ের দশকজুড়ে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় অ্যালবাম উপহার দিয়েছেন এ ত্রয়ী।
নব্বইয়ের শেষদিকে 'সুইটি' গানটি দিয়ে আলোচনায় আসে 'আর্ক'। হাসানের কণ্ঠে গাওয়া ওই গানটি তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে ফিরেছে তখন।
এছাড়া ‘সেদিনও আকাশে ছিল চাঁদ’, ‘হারিকেন লণ্ঠন’, 'তোমার জন্য', 'হারিয়ে গেছি', 'যাবো না বাড়ি', ও 'যা রে যা উড়ে যা', ‘গুরু’, ‘পাগল মন’সহ অনেক গান দিয়ে শ্রোতা হৃদয়ে শক্ত অবস্থান গড়ে আর্ক।
জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ওঠা দলটির কাছ থেকে গত দুই দশকে নতুন কোনো গান আসেনি। ‘অর্ধাঙ্গিনী’ শিরোনামে গান আসার ঘোষণা বারবার এলেও প্রকাশ হয়নি সেটি।

নতুন গান নেই কেন? আর্ক ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য রহমান আজিজুর টিংকু বললেন, ‘নানা পরিস্থিতির কারণে’ নতুন গান প্রকাশের সুযোগ হয়ে ওঠেনি তাদের।
“তবে হাসান ভাইয়ের লেখা বেশকিছু গান আছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সেগুলোর কথা ও সুর প্রায় প্রস্তুত।”
২০০২ সালে ‘আর্ক’ ছেড়ে হাসান গড়ে তোলেন ‘স্বাধীনতা’ নামের আরেকটি ব্যান্ড। পঞ্চমও অন্য দল গড়েন। টুলুও কানাডায় পাড়ি জমালে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে ব্যান্ডটি। ২০১৯ সালে পাঁচ সদস্যের নতুন লাইনআপ তৈরি করে নতুন করে ফেরে আর্ক।
চলতি বছরে নতুন গান আসছে জানিয়ে টিংকু বলেন, "এখন আমাদের দল তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল সময় পার করছে, তাই গান প্রকাশের পরিকল্পনাও চূড়ান্ত হচ্ছে। এ বছরের অগাস্ট-সেপ্টেম্বরে নতুন গান নিয়ে আসার ইচ্ছা আছে।”
আধুনিক সময়ে নতুন গান জনপ্রিয় না হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে টিংকু গানের কথায় ‘দুর্বলতাকে’ দায়ী করছেন।
“গানের কথা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সেটা বাস্তবধর্মী হতে হবে, সময়কে ধারণ করতে হবে। এখন অনেক গানেই সেই গভীরতা নেই। তাই মানুষ মনে রাখে না।”
তবে প্রতিযোগিতা যে অনেক বেড়ে গেছে, সে কথা তুলে ধরে এই শিল্পী বললেন, "শ্রোতার সামনে এখন অনেক অপশন, ইউটিউব নিজে থেকেই আপনাকে অন্য গানে নিয়ে যাবে। সেটা হিন্দি, ইংরেজি বা পাকিস্তানি গানও হতে পারে। ফলে একটা গানকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেন কথা, সুর, উপস্থাপনা সবকিছু মিলেই শ্রোতাকে আকৃষ্ট করে। তারা যেন গানে ফিরে আসে।”
এ সময়ের কনসার্ট
এক যুগের বেশি সময় ধরে কোনো অ্যালবাম প্রকাশ হয়নি 'নগরবাউল' ব্যান্ডের। ২০২২ ও ২০২৩ সালে বসুন্ধরা ডিজিটালের ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে ‘আই লাভ ইউ’ ও ‘সবই ভুল’ নামে দুটি গান প্রকাশ পেয়েছিল। তবে সেই গানগুলোতে পাওয়া যায়নি পুরোনো জেমসকে। গান দুটি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়েছেও কম।

গত বছরের ডিসেম্বরে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্টে 'কবিতা' গান দিয়ে শুরু করে মাহফুজ আনাম জেমস একে একে গেয়েছেন 'দিওয়ানা মাস্তানা', 'গুরু ঘর বানাইলা কি দিয়া', 'মা', 'দুষ্ট ছেলের দল', 'মীরাবাঈ', 'আসবার কালে আসলাম একা', 'তারায় তারায় রটিয়ে দেব'। তিনি কনসার্ট শেষ করেন 'পাগলা হাওয়া' গানটি দিয়ে।
জেমস তার প্রায় সব কনসার্টেই এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে গান করেন। সময় বেশি হলে এই তালিকায় যোগ হয় ‘বিজলী চলে যেওনা’, ‘না জানি কোহি’সহ আরও দুয়েকটি গান।
গানের পুনরাবৃক্তির ঘটনা জেমসের ভক্তকূলের কারো কারো কাছে ‘বিরক্তিকরও’।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘তারুণ্যের উৎসব’ কনসার্ট উপভোগ করেন গোলাম মোর্শেদ নামের এক শ্রোতা।
জেমসের গাস শেষে কনসার্ট কেমন লেগেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "গুরুর (জেমসের) প্রায় ছয় থেকে সাতটি কনসার্ট আমি দেখেছি, এখন এমন হয়ে গেছে গান শুরু হওয়ার আগেই ধরতে পারি এখন গুরু এই গানগুলো করবেন। সেই কয়েকটা গানই বারবার রিপিট হয় বলে এখন কিছুটা বিরক্তি কাজ করে, মনে হয় পরের কনসার্টে আর যাব না, যেহেতু একই গান শুনছি।
"২০২৩ সালে গুরুর নতুন একটা গান রিলিজ হয়েছিল, গানের নাম মনে নেই। পরপর কয়েকটা কনসার্টে আমি গেয়েছি তো নতুন গানটা গাইতে শুনিনি। হয়ত সময়ের স্বল্পতা থাকে কিন্তু নতুন গানগুলোও গাওয়া উচিত।"
সঞ্জয় চক্রবর্তী প্রায় তিন দশক ধরে নিয়মিত কনসার্টে যান, তার এই কনসার্টের নেশা সেই কলেজ জীবন থেকে।
নতুন গান জনপ্রিয়তা না পাওয়ার কারণ কী? এই শ্রোতার ভাষ্য, নব্বইয়ের ব্যান্ডগুলোর গান কেবল সুর নয়, স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। তখন ক্যাসেট বা রেডিওতে একটা গান এতবার শোনা হত যে গানগুলো মুখস্ত হয়ে যেত। সেই অভিজ্ঞতা আজকের গানে পাওয়া যায় না।
সঞ্জয় বলেন, “নতুন গান এলেও সেটা কানে পৌঁছায় না, কনসার্টেও বাজে না বললেই চলে। ফলে সেই রকম জনপ্রিয়তাও তৈরি হয় না।”
গত বছরের ডিসেম্বরে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্টে অংশ নিতে গাজীপুর থেকে আসেন রাহাত হোসেন।
কনসার্ট কেমন লাগছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,"ব্যান্ডগুলো গান করছে ঠিকই, কিন্তু তাদের গানে একটা 'ব্যান্ড স্পিরিট' মিস করছি। বারবার শোনার মত, হৃদয়ে গেঁথে যাওয়ার মত নতুন গান তৈরি হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না তারাই জানেন। তবে সংগীত একটা শিল্প, এটার মধ্যে পরিবর্তন আনা উচিত।"
বাংলাদেশের প্রথম দিককার ব্যান্ডদল সোলসের ৫০ বছর পূর্তি হয়েছে ২০২৩ সালে। পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ৫০টি গান প্রকাশ করার কথা জানিয়েছিলেন পার্থ বড়ুয়া।
তারই ধারাবাহিকতায় প্রকাশ পেয়েছে 'বাহানা', 'বিনিময়','সাগরের প্রান্তরে', 'প্রেমিক মেয়র', 'বন্ধ হয়ে গেছে', 'কিতা ভাইসাব', 'বৃষ্টির গান', 'যদি দেখো', 'হাওয়াই মিঠাই', 'নতুন শহর', 'যত প্রেম', 'রিক্সা' গানগুলো।

সোলসের নতুন অনেক গান আসছে, কিন্তু সেই গানগুলো জমছে কতটুকু? দলের সাবেক সদস্য নাসিম আলী খানের মতে, “সৃষ্টিশীলতার অভাব ও স্টেরিওটাইপ ধারা গানকে আটকে দিচ্ছে।”
প্রচারের অভাবেও গান সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না বলেও মনে করেন তিনি।
ক্যাসেট যুগের সঙ্গে তুলনা টেনে এই শিল্পী বলেন,"আগে ক্যাসেট বের হলে একধরনের ‘বিগ ব্যাং’ হত। গান ঘরে ঘরে পৌঁছাত, কনসার্টে উঠত, টিভিতে বাজত। সেই উৎসব এখন আর নেই।”
নতুন গানগুলো কেন কনসার্টেও সেভাবে গাওয়া হয় না–সেই প্রশ্নে নাসিম আলী দায় দিলেন শিল্পীদেরই।
“শিল্পীরাও সহজ প্রসেসিংয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। শ্রোতাপ্রিয় গান গাইলে দর্শক তো পছন্দ করবেই। তাই নতুন গান উপস্থাপন করার প্রবণতা কমে গেছে, বিশেষ করে পুরনো ব্যান্ডদের মধ্যে। দশটা গানের মধ্যে তিনটা নতুন গান দর্শককে শোনাতে হবে। এভাবেই গান দাঁড়িয়ে যাবে।”
বাংলায় হেভি মেটাল ধারার গান শ্রোতাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে 'ওয়ারফেজ' ব্যান্ড।
চার দশকের পথচলায় ‘বসে আছি’, ‘নেই প্রয়োজন’, ‘অসামাজিক’, ‘জীবনধারা’, ‘ধূসর মানচিত্র’, ‘মহারাজ’, ‘অবাক ভালোবাসা’, ‘মৃত্যু এলিজি’, ‘পথচলা’র মত গান গেয়ে বেশ জোরালোভাবেই টিকে রয়েছে ওয়ারফেজ।
দুই বছর আগে ‘পথচলা ২’ নামের অ্যালবাম প্রকাশ শুরু করেছে দলটি। তবে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও বিনিয়োগকারী না পাওয়ায় আগের মত নতুন গান প্রকাশ পাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন দলনেতা ও ড্রামার শেখ মনিরুল আলম টিপু।
তিনি বলেন, "নতুন গান না হলে শিল্পীর অস্তিত্ব থাকবে না। কারণ একই গান দিয়ে কতদিন চলবে। জেনারেশন পরিবর্তন হচ্ছে। একটা গান করতে হলে অনেক খরচের বিষয় আছে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে আগে অ্যালবাম বের করত এখন সেই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো নেই। শিল্পীরা ইনভেস্টটর পাচ্ছে না। পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ থাকলে সেই আগের জায়গায় ফিরে আসা সম্ভব।"
চলতি বছরের বা আগামী বছরের মধ্যে আট থেকে দশটি গান নিয়ে ‘পথচলা ২’ অ্যালবাম শেষ করবেন বলে জানিয়েছেন টিপু।
থেমে নেই নতুন ব্যান্ড
নতুন ব্যান্ডগুলো নিয়মিত গান করছে, অ্যালবামও প্রকাশ করছে।
'চিরকুট' ব্যান্ড আট বছর পর প্রকাশ করেছে তাদের চতুর্থ অ্যালবাম ‘ভালোবাসাসমগ্র', 'নেমেসিস' ব্যান্ড প্রকাশ করেছে 'ভিআইপি' অ্যালবাম, ব্যান্ড মেঘদল এনেছে ‘গোলাপের নাম’, শিরোনামহীন এনেছে ‘বাতিঘর’ অ্যালবাম, অর্থহীনের ‘ফিনিক্সের ডায়েরি’, অপার্থিব ব্যান্ডের 'আবছা নীল কণা’, ‘অ্যাভয়েডরাফা’ নিয়ে এসেছে 'মিক্সটেপ', আর লালন ব্যান্ড 'বাংলার বাউল' প্রকাশ করেছে।
এছাড়া সহজিয়া, বেঙ্গল সিম্ফোনি, রোমেল এন্ড ফ্রেন্ডস, বে অব বেঙ্গল, ক্ষ্যাপার দল, শহরতলী, অ্যাশেজ, আপেক্ষিক, আফটারম্যাথ, এ কে রাহুল ও ব্ল্যাক জ্যাং, হাইওয়ে, কার্নিভাল, কনক্লুশন, ওউনড, পাওয়ারসার্জ, সোনার বাংলা সার্কাস, বাংলা ফাইভসহ আরো ব্যান্ড নিয়মিত নিজেদের নতুন গান প্রকাশ করছে।

চিরকুটের শারমিন সুলতানা সুমির কথায়, 'নতুন গানই তাদের অস্তিত্ব'।
"আমরা সবসময় নতুন গান প্রকাশের উপর গুরুত্ব দিচ্ছি, মৌলিক গান করে আসছি। এটিই আমাদের অস্তিত্ব। মানুষ প্রতিনিয়ত পরিণত হয়, আমরা আমাদের গানে সেটা রাখার চেষ্টা করি। শুধুমাত্র নতুন গান নিয়ে বা নতুন অ্যালবামটি নিয়ে কনসার্টের আয়োজন করি।"
সংকট অনেক, সমাধান কোথায়?
গান প্রকাশের মাধ্যমের পরিবর্তন, ক্যাসেট বা সিডি না থাকায় গানের জনপ্রিয়তা নেই বলে মনে করছেন শিল্পীরা।

নকীব খানের ভাষ্য, গান সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। পুরাতন ব্যান্ডগুলোও তাদের সেই স্ট্রাকচার থেকে বের হয়ে নতুন গান আনতে পারছে না। যার কারণে নতুন ব্যান্ডগুলো গান প্রকাশের দিক থেকে এগিয়ে থাকছে।
একই কথা বললেন ‘ফিডব্যাক’ ব্যান্ডের ফোয়াদ নাসের।
তিনি বলেন, "সংগীতের জন্য তো একটা ইন্ডাস্ট্রি দরকার, গানটা বাজবে কোথায়? আগে শ্রোতাদের গানের ওপর মালিকানা থাকত, এখন গান সহজলভ্য হয়ে গেছে। গান এখন কনটেন্ট হয়ে গেছে, আগে গান গানই ছিল।"
নতুন প্রজন্মকে সংগীতের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিনাইল রেকর্ডের চাহিদা বাড়ানো হচ্ছে।
গ্লোব নিউজওয়্যারে প্রকাশিত 'ভিনাইল রেকর্ডস বিজনেস রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৩-২০৩০ এই সাত বছরে ভিনাইল রেকর্ডের বৈশ্বিক বাজার গড়ে ৭.১ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতের বাজারমূল্য ২.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশেও সেরকম উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে কি না–সেই প্রশ্নে নকীব খান বলেন, “সেটা সময়সাপেক্ষ এবং পৃষ্ঠপোষকতা দরকার, স্পনসর দরকার।”
গান প্রকাশের পদ্ধতির পরিবর্তন এলে সংগীতাঙ্গন ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করেন তিনি।
একই কথা বললেন হামিন আহমেদও। তিনি বলেন, “নিউ ইয়র্কে ভিনাইল লং প্লের প্রচুর দোকান আছে। ক্যাসেট ব্যাক করছে। তাদের গানের পুরো উপার্জনের ১৪ শতাংশ ক্যাসেট থেকে আসছে। বিভিন্ন রঙের ক্যাসেট প্লেয়ার বের হচ্ছে।
“শুধু স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করা যাবে না। মানুষ হাতে নিয়ে যেন গানটা শুনতে পারে সেই ব্যবস্থা রেখেই আমরা নতুন গান প্রকাশ করব।”