Published : 28 Jan 2026, 11:35 AM
গায়ক অরিজিৎ সিং সম্পর্কে বলিউডের মহাতারকা অমিতাভ বচ্চনের মন্তব্য ‘ওর গলার ভগবান আছে’; নব্বই দশকের শাহরুখ খান থেকে শুরু করে এ সময়ের অনেক নায়কের শর্ত থাকে তাদের সিনেমায় যেন প্লেব্যাক করেন অরিজিৎ। সংগীত পরিচালকরা মনে করেন, অরিজিৎ গাইলে সিনেমার অর্ধেক সাফল্য তাতেই।
সাফল্য, পারিশ্রমিক ও খ্যাতিতে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সেই গায়কের সিনেমার গান ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণায় মুষড়ে পড়েছেন তার সতীর্থরা।
আবার কারো কারো কথা হল সিনেমার গান গাওয়া ছাড়াও একজন সংগীতশিল্পীর সংগীত নিয়ে বহু কিছু করার সুযোগ আছে। কেউ কেউ অরিজিতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সংগীতের দুনিয়ায় গায়ককে নতুন কোনো সৃষ্টি নিয়ে হাজির হওয়ার অনুরোধ রেখেছেন।
অরিজিতের প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা আসে মঙ্গলবার আচমকা। ভক্ত অনুরাগী থেকে শুরু করে বলিউড এবং কলকাতার অনেক শিল্পী অরিজিতের সিদ্ধান্তে হতবিহ্ববল হয়ে পড়েছেন।
হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে র্যাপার বাদশা সোশাল মিডিয়ায় অল্প কথায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, ‘শতাব্দীতে একজন’।
নিজেকে অরিজিতের ‘ভক্ত’ বর্ণনা করে গায়ক-সুরকার অমল মল্লিক ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, “খবরটি জানার পর আমি প্রথমে হতাশ হয়ে পড়ি। কি বলব জানিনা। কিন্তু তোমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি।
“কেবল জেনে রেখ, আমি অরিজিৎ সিংয়ের ভক্ত ছিলাম, আছি এবং থাকব। তবে তোমাকে ছাড়া সিনেমার সংগীত আর আগের অবস্থায় থাকবে না ভাই। তোমার সময়ে জন্মাতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ।”
হৃদয় ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছেন কলকাতার গায়িকা লগ্নজিতা চক্রবর্তী। তবে অরিজিতের স্বাধীনভাবে কাজের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ইমন চক্রবর্তী।
লগ্নজিতা ‘সংবাদ প্রতিদিন’কে বলেন, “পোস্ট দেখে একমুহূর্তের জন্য হৃদয় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে আবার পোস্টটি পড়ে সম্বিত ফিরে পাই। উনি নিজেই লিখেছেন আর প্লেব্যাক করবেন না। হয়তো সিনেমায় আর গান শুনতে পাব না। কিন্তু অরিজিৎ সিংয়ের গান এখনও বহু বছর শুনতে চাই।”
তবে ইমন অরিজিৎকে নতুন ভূমিকায় দেখতে বিশেষ আগ্রহী।
ইমনের কথায়, “এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। ভারতীয় বিনোদুনিয়ায় দারুণ কিছু গান উপহার দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তে খুব অবাক হইনি। কারণ, সঙ্গীত তো শুধু প্লেব্যাক নয়। এর চেয়ে আরও ভালো কিছু হয়ত তার করার আছে। সাধুবাদ জানাই এই সিদ্ধান্তে।
“যারা স্বাধীনভাবে সঙ্গীত নিয়ে কাজ করেন, তাদের হয়তো সাহস আরও বাড়বে। মনের জোর বাড়বে।”
সঙ্গীতশিল্পী দুর্নিবার সাহার কথায়, “বিষয়টি অরিজিৎ সিংয়ের একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আমার কিছু বলার নেই।”
গায়ক-সুরকার জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচালনায় বহু গান গেয়েছেন অরিজিৎ।
সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘তোর এক কথায়’-এর মত বাংলা গান, আবার ‘খমোশিয়াঁ’-র মত হিন্দি গানও রয়েছে।
জিৎ বলেন, “আমাদের দেশে শুধুই তো সিনেমার গান রয়েছে, এমন নয়। লোকগান, কীর্তন, রাগপ্রধান, গজ়ল— নানা দিক খোঁজার প্রচেষ্টা কমই করি আমরা। একজন শিল্পীর যদি মনে হয়, তিনি সিনেমা গান গাইবেন না। নন-ফিল্ম মিউজ়িকে মন দেবেন তা, করতেই পারেন। ওটাও আমাদের কাছে বড় পাওনা হবে।”
তবে বেশ মনখারাপ জিতের।
তার কথায়, “অরিজিৎকে মিস করব বটেই। তবে একজন শিল্পীর নিজস্ব মতও থাকে। তাই তাকে তার মত করেই ছেড়ে দেওয়া উচিত। এখন ও সিনো তৈরি করছে। তার সব বিষয়ে জ্ঞানও আছে। গান নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে ভালবাসে। প্রোগ্রামিং করে, সুর করে, নিশ্চয়ই নতুন কোনও বিষয় নিয়ে ভাবছে। কথা বললে জানতে পারব, আসলে কী ভাবছে।”
এক ফেইসবুক পোস্টে মঙ্গলবার সিনেমার গান থেকে বিদায়ের ঘোষণা দেন অরিজিৎ।
তিনি লিখেছেন, “শুভ নববর্ষ সবাইকে। শ্রোতা হিসেবে এত বছর আমাকে ভালোবাসায় তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, প্লেব্যাক ভোকালিস্ট হিসেবে আমি আর নতুন কোনো কাজ হাতে নেব না।
“এটা এখানেই শেষ করছি; দারুণ এক যাত্রা ছিল।”
মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে অরিজিতের ওই পোস্ট। সোশাল মিডিয়া থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যমের পাতায় জায়গা করে নেয় অরিজিতের ঘোষণা।
তবে প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ানোর এই ঘোষণা কি সত্যিই স্থায়ী সিদ্ধান্ত, নাকি নতুন কোনো সৃজনশীল অধ্যায়ের সূচনা—তা এখনো স্পষ্ট করেননি গায়ক।
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জ থেকে শুরু হয়েছিল অরিজিতের সংগীতযাত্রা। আজ এই গায়কের অনুরাগী ছড়িয়ে আছে সারা বিশ্বে।
মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই তিনি ভারতের অন্যতম আলোচিত ও জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী তিনি। কিছুদিন হল সিনেমা পরিচালনা শুরু করেছেন।
২০০৫ সালে ‘ফেম গুরুকুল’ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে অরিজিৎ প্রথমবার কোনো রিয়েলিটি শোয়ে আসেন। তবে মঞ্চে তার পদচারণা ছোটবেলা থেকে। সেবার ষষ্ঠ হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েন। কিন্তু থেমে থাকেননি। আরেকটি সংগীত প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে নজরে আসেন অরিজিৎ।
সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘সাওয়ারিয়া’ সিনেমার জন্য ২০০৭ সালে ‘ইউ শবনামি’ গানটি রেকর্ড করলেও সেটি সিনেমায় ব্যবহার করা হয়নি।
২০১১ সালে ‘মার্ডার ২’–এর ‘ফির মহব্বত’ গান দিয়ে সিনেমায় প্লেব্যাক শুরু করেন অরিজিৎ। এর এক বছর পর ২০১২ সালে ‘এজেন্ট বিনোদ’ সিনেমায় ‘রাবতা’ শিরোনামের গানটি করেন।
সাফল্যের জন্য খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। এক বছর পরই ২০১৩ সালে ‘আশিকি ২’ সিনেমায় ‘তুম হি হো’ গানে কণ্ঠ দিয়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পান।
রোমান্টিক গানে তার কণ্ঠ ফিরেছে তরুণদের মুখে মুখে। গত দশকের হিন্দি সিনেমাগুলোতে তার কণ্ঠ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘চান্না মেরেয়া’, ‘আগার তুম সাথ হো’, ‘গেরুয়া’, ‘জালিমা, ‘কেসারিয়া’ ও ‘ফির লে আয়া দিল’ এর মত অনেক হিট হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে খুব সাধারণ চলাফেরা তার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে ছড়ানো ভিডিওতে তার সেই জীবনযাপনের চিত্র সবাইকে মুগ্ধ করেছে। সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছেন অনন্য।
স্ত্রী কোয়েল রায় ও সন্তানদের নিয়ে কলকাতা থেকে ২২৬ কিলোমিটার দূরে জিয়াগঞ্জে থাকেন ৩৮ বছর বয়সি এ শিল্পী। স্ত্রী-সন্তানদের রেখেছেন গানের ‘স্পটলাইটের’ বাইরে। নিজের এলাকায় অরিজিৎ ঘুরে বেড়ান শখের স্কুটি নিয়ে।
২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে স্পটিফাইয়ে ভারতের সব শিল্পীকে ছাড়িয়ে যান তিনি। সেই সময়ে ভারতের যেকোনো শিল্পীর চেয়ে তার গানই সবচেয়ে বেশি শুনেছেন ভক্তরা।
২০২৩ সালের অগাস্ট থেকে অন্তত দুইবার প্ল্যাটফর্মটিতে এক নম্বর র্যাংকিংয়ে থাকা টেইলর সুইফটকেও তিনি ছাড়িয়ে যান।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ফিল্মফেয়ারসহ বহু সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। অরিজিতের কনসার্ট মানেই চড়া মূল্যের টিকেট এবং ভক্তদের মধ্যে উন্মাদনা। কনসার্টে এই গায়ককে অনেকটা আপন করে পান তার শ্রোতারা। অরিজিৎ গিটার বাজিয়ে গাইতে গাইতে শ্রোতা অনুরোধে বাংলা, হিন্দি ভাষার বহু গান গেয়ে থাকেন। তাদের সঙ্গে মনের ভাব বিনিময় করেন।
আর কনসার্টের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া গায়কদের একজন হিসেবেও পরিচিত তিনি।