Published : 18 Oct 2025, 08:10 PM
‘রুপালি গিটার’, ‘ঘুম ভাঙা শহর’, ‘সেই তুমি’, ‘এক আকাশের তারা’- এমন সব গানে বুঁদ হয়ে ছিল একটি প্রজন্ম। কিছু গান তকমা পেয়েছে ‘চিরসবুজ’ হিসেবেও।
যার অসাধারণ কণ্ঠ আর গিটার বাদনে ছড়িয়েছে এসব গান, সেই আইয়ুব বাচ্চু নেই সাত বছর। কিন্তু তার সেই সুর, কথা এখনো দোলা দেয় অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়ে।
গান লেখা থেকে শুরু করে কণ্ঠ দেওয়া- এক কথায় ‘বহুমুখী’ প্রতিভা এই শিল্পী সুর তুলেছেন অন্য গীতিকারের লেখাতেও। বাপ্পী খান, রাজীব আহমেদ ও শহীদ মাহমুদ জঙ্গীসহ বহু গীতিকারের লেখা গান বাচ্চুর কণ্ঠে বেশ জনপ্রিয়তা পায়।
শনিবার আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুদিন। ২০১৮ সালের এই দিনে পৃথিবীর মায়া কাটান এই শিল্পী। মৃত্যুবার্ষিকীতে এই গীতিকাররা গ্লিটজের কাছে তুলে ধরেছেন বাচ্চুর সঙ্গে কাটানো তাদের অমূল্য স্মৃতি।
আমার কবিতা যে গান হতে পারে ভাবিনি: বাপ্পী খান

গীতিকার বাপ্পী খানের সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর ছিল দারুণ সখ্যতা। বাপ্পী খানের লেখা ‘এখন অনেক রাত’, ‘গতকাল রাতে’, ‘সাড়ে তিন হাত মাটি’, ‘আবেগি কিছু স্বপ্ন’ আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠে বেশ জনপ্রিয়তা পায়।
প্রয়াত শিল্পীর বিষয়ে জানতে চাইলে বাপ্পী হয়ে পড়েন স্মৃতিকাতর।
“বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়টা ভিন্নভাবে হয়েছিল। তবে সখ্যতা তৈরি হওয়ার পর তিনিই আমার কাছে গান চাইলেন। তখন আমি গান গাওয়া ছেড়ে দেই, তবে সারগামে নিয়মিত আড্ডা হত। টুলু ভাই, বাচ্চু ভাই, জেমস ভাই আর ফান্টি ভাইয়ের সঙ্গে আমার বেশ ভালো বন্ধুত্ব। তখন এলআরবির প্রথম ডাবল অ্যালবামের কাজ প্রায় শেষ।”
বাপ্পী বলেন, “জেমস ভাইয়ের সুরে ‘ম্যানিলা পেনফ্রেন্ড’ নামে একটা গান লিখেছিলাম। বাচ্চু ভাই গানটা শুনে জানতে চাইলেন, কে লিখেছে। জেমস ভাই বললেন, ‘এই যে বাপ্পীর লেখা। ব্যাটাকে জোর করে গান লেখালাম। গায়ক থেকে গীতিকার!’
গানটি শোনার পর বাপ্পীর কাছে গান চাইলেন আইয়ুব বাচ্চু।
সেই স্মৃতি জানিয়ে বাপ্পী বলেন, “সারগামের ছোট একটা কক্ষে ডেকে নিয়ে বাচ্চু ভাই আমাকে বললেন, ‘এলআরবির গান রেকর্ড চলছে, তুই গান দে। আমি আকাশ থেকে পড়লাম। জানালাম আমার আর গান নেই। বাচ্চু ভাই বললেন, কবিতা আছে? আমি বললাম, আছে কিছু। বাচ্চু ভাই বললেন, কালকে নিয়ে আয়।”

এই কবিতার খাতা থেকে তৈরি হয় বাচ্চুর এলআরবি-২ অ্যালবামের ‘পেনশন’ গান।
বাপ্পী খান বলেন, “আমি কবিতার খাতা নিয়ে গেলাম। বাচ্চু ভাইকে পেলাম না। খাতাটা রেখে আসলাম। অনেক রাতে বাচ্চু ভাই বাসায় ফোন করে বললেন, ‘এটা তুই কী করলি?’ আমি তো ভয়ে আছি। উনি বললেন, ‘কালকে ছয়টায় সারগাম আয়’। যাওয়ার পর তিনি বললেন, ‘পেনশন’ গানের রেকর্ড হবে। আমার কবিতা যে এভাবে গান হতে পারে, ভাবিনি।”
ওই অ্যালবামেই ছিল বাপ্পীর লেখা আরও দুটি গান ‘জীবনের মানে’ ও ‘এক কাপ চা’।
এরপর শুরু হয় তাদের নিয়মিত কাজ। এই জুটি তৈরি করে অর্ধশতাধিক গান।
বাপ্পীর ভাষায়, ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪- তিন বছরে প্রায় প্রতিদিনই গান নিয়ে বসা হতো।
“কে গাইবে, কোন প্রোডাকশন করবে এসব না ভেবে আমরা গান জমাতাম। তিন বছরেই আমরা অর্ধশত গান বেঁধেছিলাম। কোরবানির ঈদে একবার ডাবল অ্যালবাম রিলিজ হল। ক্যাসেট মাস্টার বাচ্চু ভাইয়ের পছন্দ হয়নি, তাই আবার রেকর্ড হল। কোরবানির ঈদের দিন বিকেলেও আমরা স্টুডিওতে ছিলাম। অল্প কিছুদিন পরই ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘মাধবী’, ‘হকার’ বাজতে শুরু করল পাড়া-মহল্লা জুড়ে।”
আইয়ুব বাচ্চুর গানের সমালোচকও ছিলেন এই গীতিকার।
“আমি সম্মান করতাম, কিন্তু ঠোঁট কাটা ছিলাম। আমার গঠনমূলক সমালোচনা উনি গুরুত্ব দিতেন। নতুন কোনো গান ভালো লাগলে আমি বলতাম, ‘থ্যাংক ইউ আইয়ুব’। শুনে তিনি বাচ্চাদের মত খুশি হতেন। এমনও হয়েছে, আমি কোনো উচ্চারণ সমস্যা ধরলে, রেকর্ড হয়ে গেলেও উনি আবার করেছেন হাসিমুখে। বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে এমন অনেক ঘটনা আছে,” বলেন বাপ্পী খান।
বাচ্চু ভাই ছিলেন ছাতার মত, সবাইকে স্নেহ করতেন: রাজীব আহমেদ

আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠে ‘এক আকাশের তারা তুই’ এখনো আলোড়ন তোলে সব বয়সী শ্রোতার মনে। গীতিকার রাজীব আহমেদের লেখা এই গানটি ২০০৪ সালের দিকে ‘নদীর বুকে চাঁদ’ অ্যালবামের দ্বিতীয় গান হিসেবে প্রকাশ হয়।
রাজীব আহমেদের সঙ্গে বাচ্চুর সম্পর্ক তৈরি হয় তার নেওয়া এক সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে।
বাচ্চুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে রাজীব বলেন, “বাচ্চু ভাই তো অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন। আমার দিক থেকে উনার সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা অন্যরকম। বাংলা গানের প্রতি আমার আগ্রহ শুরু হয় এলআরবির গান শুনে।”
নব্বই দশকের শুরুতে জনকণ্ঠের বিনোদন বিভাগ থেকে সাংবাদিকতা শুরু করেন রাজীব। প্রথম দিনেই বিভাগীয় প্রধান তাপস রায়হান জানতে চেয়েছিলেন কোন বিষয়ে কাজ করতে চান। এই গীতিকারের উত্তর ছিল ‘মিউজিক’ নিয়ে। সেসময় প্রিয় শিল্পী হিসেবে আইয়ুব বাচ্চুর নাম বলেছিলেন রাজীব। প্রিয় শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়ে আসা ছিল রাজীবের প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট।
সাক্ষাৎকারের সেই অভিজ্ঞতা আজও মনে গেথে আছে রাজীবের।
“ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিলাম কাজী অফিসিয়াল স্টুডিওতে। বাচ্চু ভাই এসে খুব আপন ভঙ্গিতে কথা বললেন। আমি তখন বেশ নার্ভাস ছিলাম, কারণ আমি তো তার ভক্ত, কনসার্টে টিকেট কেটে তাকে দেখা মানুষ আমি। আমি যে নার্ভাস ছিলাম সেটা টের পেয়ে উনি গল্পে গল্পে সেই অস্বস্তিটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন।”
রাজীব বলেন, “অদ্ভুতভাবে, যেদিন বাচ্চু ভাই মারা গেলেন, সেদিন খুব ভোরে আমি অফিসে গিয়েছিলাম। যেখানে সাধারণত সে সময় আমি যাই না। খবরটা শোনার পর সাথে সাথে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। তখন শুধু উনার স্ত্রী ফেরদৌস আইয়ুব চন্দনা এবং ব্যান্ড (এলআরবি) মেম্বাররা ছিলেন। মনে হয়, উনার সঙ্গে আমার এক অদ্ভুত যোগাযোগ ছিল।”
জীবনের শেষ কনসার্টে আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া শেষ গানটিও ছিল ‘এক আকাশ তারা’।
গীতিকার রাজীব আহমেদের কাছে আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন ‘ছাতার মত’ ।
তার ভাষায়, “যারা বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করেছেন, সবাই উনার স্নেহ পেয়েছেন। উনি শুধু শিল্পী না, মানুষ হিসেবেও বড় ছিলেন। অনেকটা ছাতার মত সবাইকে স্নেহ করতেন।”
‘এক আকাশের তারা তুই’ গানটি নিয়ে রাজীব বলেন, “গানটা যখন লিখেছিলাম, ভাবিনি এটা এত জনপ্রিয় হবে। আমি খুব অল্প গান লিখেছি, কিন্তু কিছু গান ভাগ্যক্রমে খুব সাড়া পেয়েছে। এই অ্যালবাম রিলিজের তিন থেকে চার মাস পর এই গানটা হিট হয়। এরপর পুরো অ্যালবামই জনপ্রিয় হয় এবং পাঁচ বছর ধরে বিক্রির শীর্ষে ছিল।”
বাচ্চুকে শেষ দেখা দেখতে পারিনি: শহীদ মাহমুদ জঙ্গী

গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর লেখা ‘হারানো বিকেলের গল্প’ গানটি ছিল আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া প্রথম বাংলা গান।
স্বাভাবিকভাবেই আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যু এখনো তাকে তাড়া করে ফেরে।
তিনি বলেন, “১৯৭৮ সালের দিকে চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির মাঠে বাচ্চুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তখন সে ইংরেজি গান করত। বাংলা গান কেন করে না প্রশ্ন করেছিলাম। বাচ্চু তখন আমার কাছে বাংলা গান গাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে এবং আমি তখন ‘হারানো বিকেলের গল্প’ গানের চার লাইন দিয়েছিলাম। সেটা যদি ভালো করে করতে পারে তাহলে পুরোটা দিব। তারপর সে গানটা ভালো করে গায় এবং পুরো গানটা নিয়ে যায়। এরপর ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’র মত গানটি ফরেস্ট হিলে গিয়ে লেখা। বাচ্চু গিটার বাজিয়ে সুর করে আর আমি গান লিখি।”
এই গীতিকারের চোখে বাচ্চু ছিলেন পূর্ণাঙ্গ একজন শিল্পী, এমন শিল্পী আর আসবেন না।
“বাচ্চু গীতিকার, সুরকার, গায়ক, সে সার্বক্ষণিক গান করেছে। এমন মানুষ বাংলাদেশে পাওয়া বিরল। আমরা খুব অল্প সময়ে এক রত্ন হারিয়েছি। বাচ্চু অনেক গান রেখে গেছে, প্রায় সাতশ গান পাওয়া, এটা বিশাল ব্যাপার। বাচ্চু খুব অভিমানি ছিলেন। যারা ভালো অভিমান করতে পারেন তারা খুব ভালো সৃষ্টি করতে পারেন।”
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর সময় দেশে ছিলেন না শহীদ মাহমুদ জঙ্গী। তাই শেষ দেখাটাও হয়নি। এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ হয়ে থাকবে বলে জানান গীতিকার।