‘মনের মধ্যে যা লালন করতেন, সরাসরি বলতেন’: খালিদী স্মরণে তারিক আনাম
“কোনো কিছু ঢেকে রাখা বা বানিয়ে বলার মানুষ তিনি ছিলেন না।"
‘কোনো কিছু রেখেঢেকে বা বানিয়ে বলার মানুষ ছিলেন না, যা বলার সরাসরি বলতেন’-বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী সম্পর্কে এ কথাগুলো বলেছেন অভিনেতা তারিক আনাম খান।
শনিবার দুপুরে বনানীর ওল্ড ডিওএইচএসের খেলার মাঠে নেওয়া হয় তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মরদেহ। সেখানে শ্রদ্ধা জানিয়ে কথা বলছিলেন তারিক আনাম।
বনানীর ওল্ড ডিওএইচএসের খেলার মাঠে শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সাংবাদিক খালিদীকে শেষ বিদায় জানান তার বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা। এরপর খেলার মাঠে তার জানাজা হয়।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর শেষযাত্রায় উপস্থিত হয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন তার বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা।
অনলাইন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রয়াণে তার অবদান ও প্রখর ব্যক্তিত্বের কথা স্মরণ করেন অভিনেতা তারিক আনাম খান।
তিনি বলেন, "বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম যখন শুরু হয়, তখন থেকেই ওনার নাম শুনেছি। দেশের প্রথম অনলাইন নিউজ পোর্টাল হিসেবে এটি আমাদের জন্য বড় গর্বের বিষয় ছিল। এই ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সত্যিকারের পথিকৃৎ।"
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে গড়ে ওঠা সখ্যতার কথা তুলে ধরে করে তারিক আনাম বলেন, "গত দুই-তিন মাসে ওনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। ওনার বাসায় গিয়েছি, উনিও আমার বাসায় এসেছিলেন। দেখে কখনোই মনে হয়নি তিনি এতটা অসুস্থ ছিলেন। উনি খুব নিয়ম মেনে চলতেন।"
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর কাজের প্রতি 'নিষ্ঠা ও স্পষ্টবাদিতার' প্রশংসা করে তারিক আনাম খান বলেন, "ইট ইজ রিয়েলি শকিং! উনি যা মনের মধ্যে লালন করতেন, সেটাই সরাসরি বলতেন, কোনো কিছু ঢেকে রাখা বা বানিয়ে বলার মানুষ তিনি ছিলেন না। সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম নিয়ে ওনার দারুণ কিছু রুচিশীল পরিকল্পনা ছিল, নিমা রহমানের সঙ্গে কিছু কাজ ও ইউটিউব চ্যানেলকেন্দ্রিক নতুন ভাবনার কথা উনি শেয়ার করেছিলেন। এমন একজন কাজের মানুষ চলে যাওয়া বড় ক্ষতির। ওনার আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল।"
অভিনেত্রী নিমা রহমান তৌফিক ইমরোজ খালিদীর 'আতিথেয়তা ও দিকনির্দেশনার' কথা স্মরণ করে বলেন, "শেষের আট মাস তার সঙ্গে কিছু কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কোনো কাজ বা মিটিং শেষে উনি না খাইয়ে কখনোই আসতে দিতেন না। রাত হয়ে গেলে বলতেন, 'ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খেয়ে যান', আমি বলতাম ডিম ভাজি দিয়ে খাব না, যা নিয়ে আমাদের মাঝে অনেক হাসাহাসিও হত।"
অনুষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর জ্ঞানের কথা তুলে ধরে নিমা রহমান বলেন, "অনুষ্ঠান কীভাবে দর্শকমনোগ্রাহী করা যায়, তার সূক্ষ্ম ভুলত্রুটিগুলো উনি ধরিয়ে দিতেন এবং নিখুঁত পরামর্শ দিতেন। ওনার জ্ঞান দেখে সত্যিই মুগ্ধ হতাম। হঠাৎ করে এমন ঘটনা ঘটে যাবে বিশ্বাসই করতে পারছি না।"
‘শূন্য হাতে অনলাইন সাংবাদিকতার ভিত্তি গড়েছিলেন’ খ ম হারূন
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে সখ্যতার দুই দশকের স্মৃতিচারণ করে বিটিভির সাবেক উপ-মহাপরিচালক খ ম হারূন বলেন, "প্রায় ২০ বছর আগে যখন ইন্টারনেট এত সহজলভ্য ছিল না, সেই সময়ে উনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল শুরুর মত সাহসী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দেশের শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকদের এক ছাতার নিচে এনেছিলেন।"
তিনি আরও বলেন, "একেবারে খালি হাতে শুরু করে তিনি যা অর্গানাইজ করেছেন, তা গণমাধ্যমের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তৌফিক ইমরোজ খালিদী আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার যে শক্তিশালী ভিত্তি তিনি গড়ে দিয়ে গেছেন, তা চিরকাল থাকবে।"
বটতলার নাট্য নির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দার বলেন, "তৌফিক ভাই আমাদের কাছে মনে হত তিনি যুগ থেকে অনেক সামনে দেখতে পেতেন। ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা কি হবে সেটা ধারণা করতে পারতেন। উনি অনেক উন্নত মানের মানুষ ছিলেন, তরুণদের নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করতেন। তৌফিক ভাইয়ের মৃত্যুতে বাংলাদেশ এক সাহসী সাংবাদিকতা ও তরুণরা এক সঠিক নির্দেশকের অভাব অনুভব করবে।"
শ্রদ্ধা জানানো শেষে বিকাল ৫টায় মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত হন সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা তৌফিক ইমরোজ খালিদী গত ১ অক্টোবর রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান, তার মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরদিন স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এরপর ৮ অক্টোবর জোহরের নামাজের পর পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেইন মসজিদে খালিদীর জানাজা হয়। সেখানে সাবেক সহকর্মী এবং স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।
শনিবার বেলা ১১টার দিকে বিমান বাংলাদেশের একটি ফ্লাইটে সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মরদেহ ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছায়।
এরপর কফিন নেওয়া হয় তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রিয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অফিস প্রাঙ্গণে। সেখানে মরদেহ রাখা হয় দুপুর ১২টা থেকে ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত।
এরপর সাংবাদিক খালিদীর মরদেহ নেওয়া হয় তার বাসায়। সেখানে পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা শেষবার তাকে দেখেন।
