Published : 12 Apr 2026, 09:32 PM
চলচ্চিত্র জগতের যে মানুষগুলোর সঙ্গে কিংবদন্তী শিল্পী আশা ভোঁসলের জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে, তারা এখন শোকার্ত। রেখা, কমল হাসান, এ আর রহমান, শাহরুখ খান, অক্ষয় কুমার, কাজল, উদিত নারায়ণ থেকে শুরু করে সংগীত ও চলচ্চিত্রের অনেকে আশাকে হারিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন।
সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ায় তারা নিজেদের মন খারাপের কথা বলেছেন। অভিনেতা-অভিনেত্রী, সুরকার, ক্রিকেটার থেকে বহু মানুষ আশা ভোঁসলেকে ‘স্বজন’ বলে সম্বোধন করেছেন। আশা ভোঁসলে ছিলেন তেমনই একজন শিল্পী, যিনি হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের জন্য বরাদ্দ প্রচলিত কণ্ঠধারাকে তিনি বদলে দেন, যা হয়ে ওঠে আধুনিক ভারতীয় নারীর প্রতীক।
খুব একটা অসুস্থ ছিলেন না আশা ভোঁসলে। শনিবার আসে তার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর। চব্বিশ ঘণ্টা না ফুরোতেই আশার মৃত্যুর খবর জানায় তার পরিবার। আশা ভোঁসলের বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
‘আমাকে আশীর্বাদ আর ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছেন’
ভারতীয় সিনেমার সুপারস্টার শাহরুখ খান এক্স বার্তায় শ্রদ্ধা জানিয়েছেন আশা ভোঁসলেকে।
শাহরুখ লিখেছেন, “আশাজির প্রয়াণের খবর সত্যিই খুব দুঃখের…তার কণ্ঠস্বর ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্তম্ভ ছিল এবং আগামী শত শত বছর ধরে বিশ্বজুড়ে তা অনুরণিত হতে থাকবে। এমন এক প্রতিভা যা অনেকের চেয়েও বেশিদিন টিকে থাকবে, তিনি সবসময় আমাকে আশীর্বাদ আর ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছেন এবং আমি তাকে অনেক মিস করব। শান্তিতে থাকুন আশা তাই… ভালোবাসি।”
‘তার সুরেলা কণ্ঠ অমর হয়ে থাকবে’
আরেক সুপারস্টার অক্ষয় কুমারও এক্সে বার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “আশা ভোঁসলে জির প্রয়াণে যে শূন্যতা অনুভব করছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তার সুরেলা কণ্ঠ চিরদিনের জন্য অমর হয়ে থাকবে।”

তামিল সিনেমার সুপারস্টার কমল হাসান, তার ‘চাচী ৪২০’ সিনেমার ‘জাগো গোরি’ গানের একটি ক্লিপ পোস্ট করেছেন। এই গানটি আশা ভোঁসলের সঙ্গে প্লে ব্যাক করেছিলেন কমল হাসান।
ক্যাপশনে কমল লিখেছেন, “স্থায়ী গায়িকা, সখী জাগো।”
‘উমরাও জানের’ সম্পূর্ণ কৃতীত্ব তার’
আশা ভোঁসলেকে নিজের জীবনে ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ বলে বর্ণনা করেছেন অভিনেত্রী রেখা।
মঙ্গেশকর পরিবারের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে বলতে গিয়ে রেখা বলেন, “যখন আমি ইন্ডাস্ট্রিতে এলাম এবং তিনি আমার জন্য গান গাইতে শুরু করলেন, তখনই আমি উপলব্ধি করলাম যে এত সুন্দর একজন মানুষের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ার অর্থ এটাই।"

রেখা বলেছেন এই গায়িকার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য উপযুক্ত শব্দ তার ভাণ্ডারে নেই।
রেখা অভিনীত ‘উমরাও জান’ সিনেমায় কণ্ঠ দিয়েছিলেন আশা। এই সিনেমায় আশা তাকে পথ দেখিয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন রেখা।
তিনি বলেন, “ওই সিনেমায় আপনারা আমাকে যা কিছু দেখেছেন, তার পুরোটাই কৃতীত্ব আশাজির’।
মুজাফফর আলী পরিচালিত 'উমরাও জান' ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে একটি মাইলফলক চলচ্চিত্র। এই সিনেমাটি কেবল রেখার অভিনয়কেই এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়নি, বরং আশা ভোঁসলের ক্যারিয়ারেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই সিনেমার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
তনুজা-কাজলের দুজনের সিনেমাতেই প্লেব্যাক করেছেন আশা
আশা ছিলেন সেই প্রবীণ গায়িকা, যিনি হিন্দি সিনেমার অভিনেতী তনুজা এবং তার মেয়ে কাজল-দুজনের সিনেমারই প্লেব্যাক করেছেন।
তনুজার জন্য আশা ভোঁসলে প্রথম গান গেয়েছিলেন ১৯৬৬ সালের 'দাদি মা' সিনেমায়। এর ছাব্বিশ বছর পর ১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া রাহুল রাওয়াইলের 'বেখুদি’ সিনেমায় আশা কণ্ঠ দিয়েছিলেন তনুজার মেয়ে ১৭ বছর বয়সী নবাগতা কাজলের জন্য।
আশা ভোঁসলের রেকর্ডিং দেখার অভিজ্ঞতা সোশাল মিডিয়ায় তুলে ধরেছেন কাজল।
“আশাজি একজন কিংবদন্তি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন…একজন গায়িকা হিসেবে, একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে এবং একজন মানুষ হিসেবে থাকবেন। তার সবকিছুই আমার ভালো লাগত—জীবন, খাবার ও রসবোধের প্রতি তার ভালোবাসা, এবং অবশ্যই তার প্রথম ভালোবাসা…তার গান! তিনি যে গানগুলো গাইতেন, সেগুলোতে সবসময়ই তার একটা নিজস্ব ব্যক্তিত্ব থাকত, আর তিনি তাঁর কণ্ঠে যা প্রকাশ করতে পারতেন, তা ক্যামেরায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় আমরা অভিনেতারা সবসময়ই ব্যর্থ হতাম।
“আমার মনে আছে, তার একটি গানের রেকর্ডিংয়ে গিয়েছিলাম, যে গানটি কখনো মুক্তি পায়নি। আমার বয়স তখন ১৯ আর তিনি ছিলেন অসাধারণ! ওই সাধারণ সুরটাকে তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা ছিল যেন একটা সিনেমা দেখার মত। আমি তখন তাকে বলেছিলাম যে, তিনি গানটিতে যা দিয়েছেন, তার এক ভাগও যদি আমি দিতে পারতাম, তাহলে আমি একজন সেরা অভিনেত্রী হতে পারতাম। শান্তিতে থাকুন, আপনি আমাদের কাছে চিরকাল আশাজি হয়ে থাকবেন।”
‘তিনি কয়েক প্রজন্মকে সংঞ্জায়িত করেছেন’
এ সময়ের জনপ্রিয় গায়িকা শ্রেয়া ঘোষাল আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
ইন্সটাগ্রামে এক পোস্টে আশা ভোঁসলের শ্রেয়া লিখেছেন, “আজকে আমরা এমন এক কণ্ঠকে হারালাম যিনি কয়েক প্রজন্মকে সংজ্ঞায়িত করেছে...এমন এক আত্মাকে যা সংগীতকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
“আশা ভোঁসলেজি শুধু কিংবদন্তিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অসীম। আমাদের অনেকের কাছে তিনি শুধু একজন অনুপ্রেরণাই ছিলেন না…তিনি ছিলেন আমাদের সংগীতময় আত্মারই একটি অংশ।”
‘তিনি বিশ্লেষণের ঊর্দ্ধে’
আশা ভোঁসলেকে বিশ্লেষণের ঊর্দ্ধে বলে বর্ণনা করেছেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী। কলকাতার বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারকে তিনি বলেন, “সুরের বাঁধনে জনগণের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জুড়ে যেতে পারেন আশা ভোঁসলে। কণ্ঠলাবণ্যের বন্যায় ভাসিয়ে দিতে পারেন আসমুদ্র-হিমাচলকে। তাকে সর্বকালের, সর্বসময়ের, সঙ্গীতের সর্বধারার শ্রেষ্ঠতমা বললেও অত্যুক্তি হবে না।
“পরিবারে এক বোন যদি লতা মঙ্গেশকর হন, তা হলে অন্য বোনকে আশা ভোসলে হয়ে উঠতে গেলে, কতটা কঠিন পথ পেরোতে হয়, তা যিনি সে পথে হেঁটেছেন, তিনিই বলতে পারবেন।”
‘তার সঙ্গে গাইতে পেরে ধন্য’
আশা ভোঁসলের সঙ্গে বলিউডের সিনেমায় একাধিক ডুয়েট গেয়েছেন উদিত নারায়ণ।
‘লগন’ সিনেমায় তাদের গান ‘রাধা ক্যায়সে না জ্বলে’ আজও জনপ্রিয়। তাই আশার প্রয়াণে বাকরুদ্ধ উদিত।
তিনি বলেন, “বলিউড সঙ্গীতের ইতিহাসে অন্যতম নাম তিনি। আশাজি যেন ভগবানের মতো। ছোটবেলা থেকেই ওঁর গান শুনেছি। আমি তখন ভাবিনি, মুম্বই গিয়ে এত বড় মাপের শিল্পীর সঙ্গে কাজ করতে পারব। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তার সঙ্গে বহু গান গাইতে পেরেছি।”
‘অপূরণীয় ক্ষতি বর্ণনায় কোনো ভাষাই যথেষ্ঠ নয়’
ভারতীয় ক্রিকেটের কিংবদন্তি ও সাবেক অধিনায়ক শচীন টেন্ডুলকারও এক্সে তার শ্রদ্ধাঞ্জলী দিয়েছেন।
শচীন লিখেছেন, “ভারতের জন্য এবং সারা বিশ্বের সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য এটি একটি গভীর শোকের দিন। আমাদের কাছে আশাজি ছিলেন পরিবারের একজন। আমাদের এই অপূরণীয় ক্ষতির জন্য কোনো ভাষাই যথেষ্ঠ বলে মনে হচ্ছে না। এক মুহূর্তে হৃদয় স্তব্ধ হয়ে যায়, আবার পরক্ষণেই ভেসে ওঠে তার রেখে যাওয়া অগণিত সুরের মাঝে। মনে হচ্ছে যেন সময় নিজেই থমকে গেছে। তবুও তার চিরন্তন গানের মাধ্যমে তিনি চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।”
তেলেগু সিনেমার তারকা জুনিয়র এনটিআর এক এক্স বার্তায় লিখেছেন, “আশা ভোঁসলে জির প্রয়াণ সংবাদে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তার জাদুকরী কণ্ঠ কয়েক দশক ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রের স্পন্দন ছিল এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিল।”