Published : 18 Jan 2026, 08:16 PM
চার দেয়ালের স্নিগ্ধ পরিবেশে নেই কোনো বাড়তি আড়ম্বর, শব্দের বাড়াবাড়ি। পুরো কক্ষে সাকুল্যে ২০-২২ জনের একেবারেই ছিমছাম আড্ডা। সাদামাটা, কিন্তু প্রাণবন্ত সেই আড্ডার সব আলো একটি মানুষের ওপর- তিনি অভিনেতা খায়রুল আলম সবুজ।
সবুজ তো সবুজই, সবুজের আবার রঙ কিসের? কিন্তু বহুমুখী এই অভিনেতার জীবন যে কতটা বর্ণিল, বুঝি সেটা তুলে ধরতেই আয়োজনের নামকরণ ‘সবুজের যত রঙ’।
শিল্প, জীবন আর স্মৃতির বহুরঙা এক দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা অভিনেতার সেই গল্প জানার আয়োজনটি বসেছিল শনিবার রাবেয়া খাতুন ফাউন্ডেশনের সাপ্তাহিক আয়োজনের চতুর্থ পর্বে। ঘড়ির কাটার ছুটে চলার সঙ্গে সঙ্গে আড্ডাধর্মী অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে স্মৃতি, শিল্প আর জীবনের কথায় ভরপুর এক ঘরোয়া মিলনমেলা।
খায়রুল আলম সবুজের লেখা গান ‘একজনমে হয়নি দেখা’ দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। গান, কবিতা, গল্প ও স্মৃতিচারণে মনোমুগ্ধকর প্রায় চার ঘণ্টা কেটে যায় যেন চোখের পলকে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা রহমত আলী, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, আফসানা মিমি, দীপা খন্দকার, তাহমিনা সুলতানা মৌ, খায়রুল আলম সবুজের স্ত্রী শিরীন আলম, মেয়ে প্রতীতি পূর্ণা, সাহিত্যিক সোহেল আনোয়ারসহ অনেকে।
বরিশালে কাটানো ছেলেবেলা, করাচিতে উচ্চশিক্ষা, মঞ্চনাটক, অভিনয় জীবনের সোনালী সময়, সাহিত্য, গান, বিটিভির চাকরি ছেড়ে লিবিয়া চলে যাওয়া, বৃষ্টির শব্দ না পেয়ে আবার দেশে চলে আসা, ছোটবেলার স্মৃতি, জীবনবোধের গভীরতাসহ শিল্পের সৌন্দর্য নিয়ে অনুষ্ঠানে কথা বলেছেন সবুজ।

ছোটবেলার স্মৃতি মনে করে অভিনেতা বলেন, “আমি ১৭ বছর পর্যন্ত বরিশালে ছিলাম। বরিশালের গণ্ডি পার হইনি। প্রকৃতির যত সৌন্দর্য আমি সেখান থেকেই উপভোগ করেছি। আমি সাড়ে ৩ বছর বয়সে একবার পানিতে পড়ে গিয়েছিলাম। এই পড়ে যাওয়া আমার জীবনে একটা সিম্বোলিক ট্রেন্ড ছিল। আমি মাঝেমধ্যেই পড়ে যেতাম। পড়তে পড়তেই আমার জীবনে পথচলা।”
বরিশালে বেড়ে উঠা এই অভিনেতা ছিলেন বেশ চঞ্চল। স্কুলে ঠিকমত যেতেন না। একদিনের মজার ঘটনা তুলে ধরে বলেন, “বাবা মহিউদ্দিন আহমেদ ছিলেন আইনজীবী। উনাকে খুব একটা পাওয়া যেত না, ব্যস্ত থাকতেন। আমি তখন অনেকটা বাউণ্ডুলে, ঘুরে বেড়ানো ছেলে। একদিন বাবা নিয়ে গেলেন বরিশালের বিখ্যাত মিষ্টির দোকানে। একসঙ্গে নয়টি মিষ্টি খেতে দিলেন। মিষ্টি খাইয়ে বললেন বাবা এবার তুমি স্কুলে যাও।”
এরপর মেজ ভাইয়ের সঙ্গে করাচিতে চলে যান। করাচির বাংলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং বাংলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে দেশে ফেরেন। করাচিতে গান এবং অভিনয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পাকিস্তান টেলিভিশনে প্রথম গান গাওয়ার সুযোগও পেয়েছিলেন।
১৯৮২ সালে লিবিয়ায় শিক্ষকতা করতে গিয়েছিলেন অভিনেতা খায়রুল আলম সবুজ। সেখানে আড়াই বছর ছিলেন। তার আগে বিটিভিতে প্রযোজক হিসেবে চাকরি করেছেন।
লিবিয়া থেকে চলে আসার গল্প মনে করে এই অভিনেতা বলেন, “আড়াই বছরে দুবার দেশে এসেছি এবং শেষবার একেবারে চলে এসেছি। টেলিভিশন প্রডিউসারগিরি ছেড়ে চলে গেছি কাউকে কিছু না জানিয়ে। তারপর যখন দেশে আসি তখন আবার একটা অনুষ্ঠান উপস্থাপনার দায়িত্ব পড়ে। তখন সবাই জিজ্ঞেস করেছিল, দেশে ফিরলে কেন? বললাম, যে দেশে টিনের চালে বৃষ্টি হয় না, সেখানে থাকার কী আছে।”
দেশ ছেড়ে লিবিয়ায় কাটানো সময়ের কথা মনে করে সবুজ বলেন, “আড়াই বছর ছিলাম, খুব কষ্ট হয়েছে। তার মধ্যে সেখানে দুটা নাটক করেছি, তারপরও এত অশান্তি হত আমার, মনে হত পাগল হয়ে যাব। দেশে আমার স্টেজ পড়ে আছে, অভিনয় পড়ে আছে আর আমি লিবিয়ায় টাকা-পয়সা আয় করতে গিয়েছি। তারপর আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে দেশে চলে আসলাম। এসে প্রথম গান লিখি ‘একজনমে হয়নি দেখা, আরেকজনম দে আমারে’।”
অনুষ্ঠানে ‘আমার চোখে আমি’ বই থেকে খায়রুল আলম সবুজের লেখা কবিতা ‘আমার আমি’ পাঠ করেন ওয়াহিদা মল্লিক জলি।
কবিতা পাঠ শেষে এই অভিনেত্রী বলেন, “একজন ভালো মানুষের সংজ্ঞা বলতে আমরা যাদের খুঁজি সবুজ ভাই তাদের মধ্যে একজন।”
অনুষ্ঠানে সোহেল আনোয়ার আবৃত্তি করেন ‘কর্তব্য কথা’, ‘হলুদ পুরের মাঠ’, ‘মন্বন্তর: ভিন্ন রকম’ তিনটি কবিতা করে শুনান তিনি।
‘কর্তব্য কথা’ কবিতার পেছনের গল্প শোনান অভিনেতা সবুজ।
“যখন একজন লোক অনেক কিছু করতে চায় কিন্তু পারে না তখন তার যে কষ্ট হয় সেই কষ্টের কথা আছে এই কবিতায়। এটা আমার নিজের ভাবনা, নিজের ভেতরের কথা তুলে ধরা।”

রাবেয়া খাতুন ফাউন্ডেশন পরিচালনায় আছেন অভিনেত্রী আফসানা মিমি।
শিল্প ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, আড্ডা, গবেষণা নানা বিষয়ে কাজ করতে ফাউন্ডেশনের জন্ম, বলেন অভিনেত্রী।
মিমি বলেন, “এখানে শুধুমাত্র রাবেয়া খাতুনের সাহিত্য নিয়ে চর্চা হবে ব্যাপারটা তা নয়। এখানে আমাদের সাহিত্যে নারীদের যে অবদান, সেই বিষয়গুলোর ওপর একটু আলাদা করে চর্চা করতে চাই, আর বিভিন্ন ধরনের আড্ডা, আলোচনা, একটু গবেষণা করতে চাই। যেমন একসাথে এসে একটু কবিতা পড়া, একসাথে গান করা, সাহিত্য পাঠ, সাহিত্য আলোচনা। আস্তে আস্তে আমরা শিশুদেরকেও এর সাথে যুক্ত করতে চাই। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে একটু আলোচনা করতে এই জায়গাটা।”
‘সবুজের যত রঙ’ এটা এই আয়োজনের চতুর্থ পর্ব৷
আয়োজনটি নিয়ে মিমি বলেন, “আমরা তো সবুজ ভাইয়ের সাথে সেই ছোটবেলা থেকে, ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সহ-অভিনেতা হিসেবে উনার সাথে আমরা কাজ করেছি। তারপর যখন বড় হয়েছি, কাজ শুরু করেছি, তখন আমরা পরিচালনায় একসাথে কাজ করেছি। আমার পরিচালনায় সবুজ ভাইয়ের অনেক কাজ আছে। সবসময় দেখেছি মানুষটা খুব আলাদা। সবার চাইতে খুব আলাদা।
“এই মানুষটা ভীষণ নির্লোভ, এই মানুষটা ভীষণ অন্তর্মুখী। ভীষণ একজন দার্শনিক এই মানুষটা। উনি অভিনয় করেন, উনি লেখেন, গান লেখেন, অনুবাদ করেন, শিক্ষকতা করেছেন। যে মানুষটা বৃষ্টির শব্দ শোনার জন্য একটা নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে চলে আসতে পারে সেই মানুষটার জীবনের গল্প শুনতে আমাদের এই আড্ডার আয়োজন।”
খায়রুল আলম সবুজের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, বরিশালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেন।

৭৭ বছর বয়সী এই অভিনেতা মঞ্চ, বেতার ও টেলিভিশনে নিয়মিত অভিনয়, নাট্য রচনা ও লেখালেখি করছেন নিয়মিত। প্রায় ২০টির মত নাটক লিখেছেন তিনি। তার মধ্যে রয়েছে ‘টেলিভিশনে-স্বপ্নবাতায়ন’, ‘সমান্তরাল’, ‘শ্বেতপারাবত’, ‘আত্মজা’, ‘গিফ্ট’, ‘নীলকণ্ঠ পাখী’, ‘সিঁড়ি’।
ছোট গল্পের ‘স্বর্ণলতার বৃক্ষ চাই’, ‘বুড়োবট ও শকুন’ এবং ‘পবিত্র ও আড্ডাবাজ কয়েকজন’ তিনটি বই লিখেছেন তিনি।
আরও লিখেছেন উপন্যাস, কবিতার বই। লেখক হিসেবে অনুবাদের ক্ষেত্রটি তার বিশেষ আগ্রহের। বিশ্বনাটকের আটটি নাটক অনুবাদ করেছেন। নাটকগুলো হলো আন্তন চেখভের, ‘সী-গাল (গাঙচিল)’, হেনরিক ইবসেনের ‘এ ডলস হাউজ (নোরা)’, ‘ওয়াইল্ড ডাক’, ‘এন এনিমি অব দ্য পিপ্স’, ‘রোজমারশোম’। জাঁ আনুঈর ‘আন্তিগোনে’ এবং ‘ইউরিডাইস’ ও হ্যারল্ড পিন্টারের ‘ডাম ওয়েটার’ এবং ‘সোফিয়া লোরেন: তার আপন কথা’ (জীবনী গ্রন্থ)।