Published : 18 Jan 2026, 01:01 PM
‘সূর্য কন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’সহ আরও কয়েকটি আলোচিত সিনেমার অভিনেত্রী জয়শ্রী কবিরের শেষকৃত্যানুষ্ঠান হয়েছে লন্ডনে।
ছেলে লেনিন সৌরভ, চাচাতো ভাইবোন ও স্বজনদের উপস্থিতিতে শনিবার তার মরদেহ হিন্দু ধর্মের আচার মেনে সৎকার করা হয়েছে সেখানকার শ্মশানে।
‘মিস ক্যালকাটা’ খ্যাত এই অভিনেত্রীর অনন্তলোকে যাত্রা শুরু গত ১২ জানুয়ারি। লন্ডনে স্থানীয় সময় রাত ১০টায় হাসপাতালে ঘুমের মধ্যে তার মৃত্যু হয় বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন আলোকচিত্রী ও চলচ্চিত্র গবেষক মীর শামসুল আলম বাবু।
প্রয়াণের কয়েক মাস আগে থেকেই জয়শ্রী কবির বেশ অসুস্থ ছিলেন।

চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবিরের প্রথম স্ত্রী মঞ্জুরা ইব্রাহিমের মেয়ে ইলোরা কবিরের বরাত দিয়ে মীর শামসুল আলম বাবু এই তথ্য জানিয়েছেন। জয়শ্রী কবির ছিলেন আলমগীর কবিরের দ্বিতীয় স্ত্রী। বিবাহবিচ্ছেদের পর থেকে অনেক বছর ধরেই তিনি লন্ডনে বসবাস করছিলেন। ইলোরা কবিরও থাকেন লন্ডনে।
শামসুল আলম বাবু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইলোরার সঙ্গে আমার আগে থেকেই পরিচয় ছিল। জয়শ্রী কবিরের মৃত্যুর ব্যাপারে জানতে আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। ইলোরা কবির আমাকে জানিয়েছে, ‘গত সোমবার (১২ই জানুয়ারি) রাত ১০টায় হাসপাতালে ঘুমের মধ্যে জয়শ্রী রায় মারা যান।

“অক্টোবর থেকে তিনি হাসপাতালে খুবই দুর্বল অবস্থায় ভর্তি ছিলেন। কয়েক মাসে জয়শ্রী কবিরের দুবার স্ট্রোকও হয়েছিল এবং অনেকদিন ধরে ধরে স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন’।”
শনিবার সকালে লন্ডনে জয়শ্রী কবিরের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়েছে জানিয়ে মীর শামসুল আলম বলেন, “সকাল সোয়া ৮টায় তার জন্য একটি প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। পরিচালক আলমগীর কবিরকে দ্বিতীয় বিয়ে করলেও হিন্দু ধর্ম পালন করতেন জয়শ্রী রায় কবির। শনিবার যুক্তরাজ্য সময় সকাল ১০টায় ছেলে লেনিন সৌরভ, কয়েকজন চাচাতো ভাইবোন ও বন্ধুর উপস্থিতিতে তার মরদেহ শ্মশানে দাহ করা হয়।
“ভারত থেকেও কয়েকজন স্বজন লন্ডনে গিয়ে সৎকারে অংশ নিয়েছেন বলে ইলোরা আমাকে জানিয়েছেন।”

জয়শ্রীর ইচ্ছে অনুযায়ী ‘মৃতদেহের ছাইভস্ম ভারতে থাকা তার আত্নীয় স্বজনদের মাধ্যমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হবে’ বলেও ইলোরা কবিরের বরাত দিয়ে জানান শামসুল আলম।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক বেলায়াত হোসেন মামুন লন্ডনে জয়শ্রী কবিরের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিলেন।
মামুন বলেছিলেন, “আমরা একটু দেরিতেই জানতে পেরেছি যে জয়শ্রী কবির আর আমাদের মাঝে নেই। প্রয়াণের কিছু কাল আগে থেকেই জয়শ্রী কবির বেশ অসুস্থ ছিলেন। লন্ডনের চলচ্চিত্রকর্মীদের কাছ থেকে আমরা তার মৃত্যুর খবরটি জানতে পেরেছি।”
ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ বৃহস্পতিবার রাতে এক শোক বিজ্ঞপ্তিতেও জয়শ্রী কবিরের মৃত্যুর খবরটি জানিয়ে বলেছিল, “বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রের অসামান্য গুণী এই অভিনয়শিল্পী আমাদের অত্যন্ত নিকটজন ছিলেন৷ তিনি মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গুণগত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন৷ তার প্রয়াণের সংবাদ আমাদের শোকাহত করেছে।”

তবে জয়শ্রী কবিরের মৃত্যু নিয়ে পরিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য না দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন অনেকে। কেউ কেউ প্রিয় অভিনেত্রীর মৃত্যুর খবরটি মেনেও নিতে পারেননি।
চলচ্চিত্র নির্মাতা আলমগীর কবিরের ভাগ্নে জাভেদ মাহমুদও বুধবার এক ফেইসবুক পোস্টে তার মামীর মৃত্যু খবর দিয়ে লিখেছিলেন,
“আমার মামী জয়শ্রী কবির, বিখ্যাত নায়িকা, এক কালের ‘মিস ক্যালকাটা’ লন্ডনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। উনি সত্যজিত রায়ের সিনেমা ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, আলমগীর কবিরের ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘রুপালি সৈকতে’, ‘সূর্য কন্যা’য় নায়িকা ছিলেন।”
এরপর সোশাল মিডিয়ায় অনেকে জয়শ্রীকে নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। অনেকে এই অভিনেত্রীর ছবি দিয়ে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হতে চান ফেইসবুকে। মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর, দেশের চলচ্চিত্রে জয়শ্রী কবিরের অবদান ও অভিনয়ের কথা স্মরণ করে অনেকে ডুবে যান স্মৃতিকাতরতায়।
জয়শ্রীর জন্ম ১৯৫২ সালে কলকাতায়। ১৯৬৮ সালে ‘মিস ক্যালকাটা’ উপাধি লাভ করেন তিনি। এর দুবছর পর ১৯৭০ সালে কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার। মহানায়ক উত্তমকুমারের সঙ্গে তার অভিনীত চলচ্চিত্র ‘অসাধারণ’ ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায়, তিনি পৌঁছে যান জনপ্রিয় শিল্পীদের কাতারে।

‘সূর্য কন্যা’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জয়শ্রী কবির বাংলাদেশে আসেন। ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সূর্য কন্যা’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং মহান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন চলচ্চিত্রভাষার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিলও বলা হয়। ‘সূর্য কন্যা’ চলচ্চিত্রের সূত্র ধরেই জয়শ্রীর জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে।
পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রটির পরিচালক আলমগীর কবিরকে বিয়ে করে বাংলাদেশে স্থায়ী হন তিনি। বিয়ের পর জয়শ্রী রায় থেকে তিনি হয়ে ওঠেন জয়শ্রী কবির।
অভিনেতা বুলবুল আহমেদের সঙ্গে জয়শ্রী কবিরের জুটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এক বিশেষ অধ্যায় তৈরি করে। ‘সূর্য কন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘মোহনা’, ‘পুরস্কার’, ‘রুপালি সৈকতে’ সিনেমাগুলোতে বুলবুল আহমেদের সঙ্গে জুটি বাঁধেন তিনি।
আলমগীর কবিরের সঙ্গে সংসার টেকেনি এই অভিনেত্রীর, আসে বিচ্ছেদ; তাদের একমাত্র সন্তান লেনিন সৌরভ কবিরকে নিয়ে জয়শ্রী প্রথমে কলকাতায় চলে যান; পরে সেখান থেকে ছেলেকে নিয়ে পাড়ি দেন লন্ডনে। সৌরভ সিঙ্গাপুরে থাকেন। অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের দুরত্ব তৈরি হয়েছে।
আর আলমগীর কবির মারা যান ১৯৮৯ সালের ২০ জানুয়ারি।
আগের খবর
'মিস ক্যালকাটা' জয়শ্রী চলে গেলেন 'সীমানা পেরিয়ে'