Published : 05 Sep 2022, 04:18 PM
রাষ্ট্রীয় সম্মানের ‘গান স্যালুট’ আর সহযোদ্ধা, সহকর্মীদের অশ্রুশিক্ত ভালোবাসায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিদায় জানানো হল কিংবদন্তি গীতিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে।
একাত্তরের উজ্জয়িনী গান ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ এই গীতিকারের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বললেন, “একজন শিল্পীকে দলীয় রাজনৈতিক মেরুকরণের ঊর্ধ্বে গিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ এবং মূল্যায়ন করতে হবে।“
রোববার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে গাজী মাজহারুল আনোয়ার মারা যান। কিছুদিন ধরেই বার্ধক্যের নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে তার কফিন নিয়ে আসা হয় ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। প্রথমেই তার প্রতি জানানো হয় রাষ্ট্রীয় সম্মান।
ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল ইসলাম সোহাগের নেতৃত্বে দেওয়া হয় গার্ড অব অনার। এরপর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধায় সিক্ত হন প্রয়াত এই গীতিকার। শ্রদ্ধা জানায় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোও।
‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’, ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে’, ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’- এর মত অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা মাজহারুল আনোয়ার তার জীবদ্দশায় ভূষিত হয়েছেন একুশে পদক আর স্বাধীনতা পুরস্কারসহ নানা সম্মাননায়।

শারীরিকভাবে গাজী মাজহারুল আনোয়ার বিদায় নিলেও বাংলাদেশের শিল্পের ইতিহাসে, সংগীতের ইতিহাসে তিনি ‘চির জাগরুক থাকবেন’ বলে মন্তব্য করলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফ।
তিনি বলেন, “ষাট-সত্তর দশকে এই দেশে সৃষ্টিশীল সংস্কৃতিচর্চার যে জাগরণ ঘটেছিল, যাদের হাত দিয়ে এই জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। কিন্তু নতুন শতকে এসে সেই সৃষ্টিশীল জোয়ার আর আগের মত নেই, আমাদের ঐক্যটির অনেকাংশে ক্ষতি হয়েছে দলীয় রাজনীতির মেরুকরণে।”
মাজহারুল আনোয়ারের সাথে ব্যক্তিগত আলাপের স্মৃতিচারণ করে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, "মৃত্যুর কিছুদিন আগে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তার সাথে আমার কথা হয়েছিল, তিনি নাটক-সিনেমা-সংগীত নিয়ে কথা বলেছিলেন। এই সময়ের সংস্কৃতিচর্চা নিয়ে তার মাঝে হতাশাও প্রকাশ পেয়েছিল।“
গাজী মাজহারুল আনোয়ারের মেয়ে সংগীত শিল্পী দিঠি আনোয়ার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং দেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, “যেসব সংগঠন আব্বুকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে, তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আব্বুকে ভালোবাসেন বলে অনেকেই এখানে এসেছেন। আব্বুকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়ার জন্য আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।"
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধায় সিক্ত হবেন মাজহারুল আনোয়ার, দাফন বনানীতে
গাজী মাজহারুল আনোয়ারের জনপ্রিয় যত গান
শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন সঙ্গীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনও। শুধু গান নয়, পারিবারিকভাবে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের সঙ্গে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে সম্পর্কের কথা স্মরণ করতে গিয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েন সবিনা ইয়াসমীন।
“উনার সাথে আমার অসংখ্য স্মৃতি। উনি ২০ হাজারের মত গান লিখেছেন, এর মধ্যে ৬/৭ হাজার গান মনে হয় আমিই গেয়েছি।"
গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ভাই ইমরুল আনোয়ার লিটন বলেন, "উনি যে গান লিখেছেন সেই গানের মাধ্যমেই সবার অন্তরে বেঁচে থাকবেন।"
আর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বললেন, “গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গান আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশেও তরুণ প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
“তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রে গান লিখেছেন। তার গান মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। সৃজনশীল মানুষের সৃষ্টিশীল কাজ প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে যায়। গাজী মাজহারুল আনোয়ার আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন তার কাজের মধ্য দিয়ে।"
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মাজহারুল আনোয়ারের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও ওয়ার্কাস পার্টি।
আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেন, ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দীর নেতৃত্বে ফুল দেওয়া হয় এই কিংবদন্তীর কফিনে।
গাজী মাজহারুল আনোয়ার বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা জাসাসেরও উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।

বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির কেন্দ্রীয় নেতা ও ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ এবং সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক চিত্রনায়ক উজ্জ্বলের নেতৃত্বে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিদের মধ্যে অভিনেতা শংকর শাঁওজাল, সংগীত শিল্পী বিজন চন্দ্র মিস্ত্রি, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, নকীব খান, কুমার বিশ্বজিৎ, শহীদুল্লাহ ফরায়েজী, আসিফ ইকবালসহ অনেকেই এসেছিলেন শহীদ মিনারে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ছাড়াও সেক্টরস কমান্ডার ফোরাম, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জাতীয় কবিতা পরিষদ, চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি, সংগীত সমন্বয় পরিষদ, সিঙ্গার অ্যাসোসিয়েশন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, সংগীত ঐক্য বাংলাদেশ, শিল্পকলা একাডেমি, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, সুরতাল, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক দল-জাসাস শ্রদ্ধা জানায় মাজহারুল আনোয়ারের কফিনে।
গাজী মাজহারুল আনোয়ার ছিলেন ‘এক ও অদ্বিতীয়’: সাবিনা ইয়াসমিন
গাজী মাজহারুল আনোয়ারের জন্য ফেইসবুকে শোকগাথা
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সোয়া ১২টার দিকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় এই প্রযোজক, পরিচালকের দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনে (বিএফডিসি)।
সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানান, বাদ জোহর এফডিসিতে এবং বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে জানাজা হবে মাজহারুল আনোয়ারের। এরপর বনানী কবরস্থানে শায়িত হবেন তিনি।