Published : 05 Jul 2025, 03:37 PM
বড় পর্দায় জাহিদ হাসান, আফসানা মিমিসহ একসঙ্গে অনেক শিল্পীকে নিয়ে নব্বইয়ের ঘ্রাণ মাখা গল্পে এবারের ঈদে তানিম নূরের 'উৎসব' সিনেমাটি সাড়া তুলেছে। ঈদের পরে মাস পেরিয়েও দর্শকের আগ্রহ ধরে রেখেছে সিনেমাটি।
এই সিনেমা দেখে মাঝবয়সী বেশিরভাগ দর্শকরা জানিয়েছেন, সিনেমার দৃশ্য, সংলাপ আর চরিত্র তাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে তাদের হারিয়ে যাওয়া এক সময়ে।
প্রথমে ব্যক্তিগত অর্থায়ন এবং পরবর্তীতে একটি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত ‘উৎসব’ কীভাবে দর্শকদের মুখে মুখে ঘোরা এক নাম হয়ে উঠল, সেই গল্প জানতে গ্লিটজ কথা বলেছে এর কারিগর তানিম নূরের সঙ্গে ।
চিত্রনাট্যের মতই এই সিনেমা নির্মাণের পেছনে আছে পরিচালকের গভীর আবেগ, বেদনা, দুঃসময় পাড়ি দেওয়ার এক সংগ্রাম কাহিনী। প্রথমে প্রযোজক খুঁজে না পাওয়া এই সিনেমাটি আয়ের দিক থেকে তাদের নির্মাণ বাজেট ছাড়িয়ে গিয়েছে। যা নতুন অনুপ্রেরণা বলেই মনে করছেন তানিম।
তানিম বলেছেন ‘উৎসব’ সিনেমার গল্পের অনুপ্রেরণা চার্লস ডিকেন্সের উপন্যাস ‘ক্রিসমাস ক্যারল’। যে গল্পটি ক্লাস ফাইভ থেকে নিজের মধ্যে ধারণ করছিলেন তিনি।

তানিম গ্লিটজকে বলেন, “আমি খুব ছোটবেলায় ‘ক্রিসমাস ক্যারল’ পড়ি। তখন থেকেই গল্পটা আমার মনে গেঁথে ছিল। অনেক অ্যানিমেশন সিনেমায়ও গল্পটা দেখেছি। বড় হয়ে যখন ভাবতে শুরু করলাম যে আমাদের সিনেমায় ঈদকে তো কখনোই তেমন করে তুলে ধরা হয়নি, তখনই মাথায় আসে এই গল্পটা ঈদের প্রেক্ষাপটে বলা যায় কী না।”
এর মধ্যে তানিম বড় হয়েছেন, ওটিটির জন্য সিরিজ বানিয়ে একটু আধটু পরিচিত হয়েছেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর ঘটে যায় এক দুর্ঘটনা, তানিমের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু আরিফুল ইসলাম এবং শফিক করিম সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তামিম কথায় কথায় বলেন, বন্ধুদের হারানোর পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, বিশেষ করে ঈদ আসলে বন্ধু হারানোর শোক আরও অস্থির করে তুলত তানিমকে।
এর মধ্যে অন্য একটি সিনেমার স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করলেও, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হঠাৎ করে তার ‘ক্রিসমাস ক্যারোলের’ কথা মনে পড়ল। সঙ্গে বন্ধুদের জন্য বেদনা মনের ভেতরে তো ছিলই।
এর পরপরই বন্ধুদের স্মৃতিকে উৎসর্গ করে তানিম নেমে পড়েন ‘উৎসব’ বানানোর কাজে।

তানিম বলেন, "আমার সেই আগের সিনেমার কাজ বন্ধ করে ‘উৎসর্গ’ নিয়ে কাজ শুরু করলাম এবং কাজটি করতে হবেই এমন একটা জেদ শুরু হল। উপন্যাসের কাহিনী নিয়ে তখন আমি প্রথম আমার রাইটারদের সাথে আলাপ করি। এবং আমাদের দেশের কনটেক্সটে গল্পটা তৈরি করি।"
'উৎসব' সিনেমার মধ্য দিয়ে ছোটবেলার ঈদের হারিয়ে যাওয়া বন্ধন, সরলতা, আনন্দের মুহূর্তগুলো পর্দায় দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তামিম।
“আমাদের এখানে ঈদের দিনে নামাজ পড়া, খাওয়া–দাওয়ার পর দিনটা একরকম নিস্তেজ হয়ে যায়। সবাই মিলে আনন্দ করার, গানের অনুষ্ঠান করার, ছাদে ওঠা, এগুলো এখন হয় না। অথচ ৯০ দশকে আমি দেখেছি একুশে ফেব্রুয়ারি বা স্বাধীনতা দিবসে পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই গল্পটা গড়েছি। চাইছিলাম, আমার সিনেমা দেখার পর দর্শক ভাবুক এভাবেও তো ঈদ উদযাপন করা যায়!”
নিজের 'অনুভব' থেকেই নব্বইয়ের নস্টালজিয়ায় ফিরে গেছেন তানিম।
'কাইজার' সিরিজ বানিয়ে খ্যাতি কুড়ানো এই নির্মাতা বলেন, "নব্বই দশকের পুরোটা সময় আমার ভিতরে গেঁথে আছে, আমি তখন স্কুলে পড়ি। ছোটবেলায় বাসার সবাই মিলে একসাথে নাটক, সিনেমা দেখার স্মৃতিগুলো এখনো বেশ মনে পড়ে। ঈদের দিনগুলোতে যে বিশেষ নাটক হত সেগুলো খুব আগ্রহ নিয়ে দেখতাম।
"হুমায়ূন আহমেদের নাটক খুব আগ্রহ নিয়ে সবাই মিলে দেখতাম। ওই সময়ে আমি নিজেও ভিএইচএস ক্যাসেট ভাড়া নিয়ে 'দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে' সিনেমাসহ বহু সিনেমা দেখেছি। সেই জিনিসগুলো, সেই স্মৃতিগুলো আমাকে গল্প লেখার ক্ষেত্রে খুব প্রভাবিত করেছে।"

প্রথমে সিনেমার প্রযোজক খুঁজে পাওয়া যায়নি, পরে স্ত্রী এবং বন্ধুর সহায়তায় কাজটি নিয়ে মাঠে নামেন তানিম। তার পরে এগিয়ে আসে একটি ব্যাংক ও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
সেই সংগ্রামের গল্প তুলে ধরে তানিম বলেন, " ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গল্প লেখা শেষ হয়। তারপর শুরু হয় প্রযোজক খোঁজার কাজ। কিন্তু আমাদের ইন্ডাস্ট্রি ছোট, কেউ রাজি হল না। শেষমেশ আমার স্ত্রী ও বন্ধু শাকিব ফাহাদ এগিয়ে এল। এরপর আরও কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীর সহায়তায় সিনেমাটা শেষ করতে পারি।”
রোজার ঈদে মুক্তির পরিকল্পনা থাকলেও প্রযোজনা জটিলতায় সেটা হয়নি। শেষমেশ কোরবানির ঈদে মুক্তি পায় সিনেমাটি।
প্রযোজকের খোঁজ না পাওয়ার সময়ে ক্ষোভ বা আক্ষেপ কাজ করেছিল কী না প্রশ্নে তানিম বলেন, "না, ক্ষোভ, আক্ষেপ নেই। বাংলা সিনেমার ইন্ডাস্ট্রি খুব ভালো অবস্থানে নেই, এখানে যা করার নিজেকেই করে নিতে হবে। নিজেকেই বিকল্প তৈরি করতে হবে। আমাদের এইখানে সিনেমার দর্শক আছে, আমাদের দর্শকের উপযোগী সিনেমা তৈরি করলে সেটা সবাই দেখতে যাবে। সেই চিন্তা থেকেই এমন পারিবারিক গল্পের সিনেমা নিয়ে কাজ করা।"
'উৎসব': নস্টালজিয়ার অ্যালবামে উল্টে দেখা এক সফর
জাহিদ হাসানকে শেষ কবে বড় পর্দায় দেখা গেছে, তা অনেকেরই মনে নেই। কিন্তু ‘উৎসব’ যেন তার জন্যই লেখা।

অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে তানিম বলেন, “খাইস্টা জাহাঙ্গীর চরিত্রটি আমি লিখেছি জাহিদ ভাইকে মাথায় রেখে। ওনার সাবলীল অভিনয়, সব কিছুই চরিত্রে জীবন্ত হয়ে উঠবে এই ধারণা ছিল। আর চঞ্চল ভাই, অপি আপা, জয়া আপা, মিমি আপারা এত প্রফেশনাল এবং অভিজ্ঞ শিল্পী তাদের সঙ্গে কাজ করতে পারাটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তাদেরকে যখন বলেছি স্ব স্ব চরিত্র করতে হবে, মিমিক্রি করতে হবে। প্রত্যেকে খুবই আনন্দের সাথে রাজি হয় এবং আনন্দ নিয়েই কাজটা করেছেন। তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।"
শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল প্রশ্নে তানিম বলেন, "আমরা মাত্র ২০ দিনে সিনেমার শুটিং শেষ করি। সেসময় এক ভয়াবহ ব্যস্ততা ছিল। একই সাথে শুটিং চলছে, এডিটিং চলছে। এর জন্য আমি আমার টিমের প্রত্যেক মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ।"
মুক্তির সপ্তাহখানেক পরে ‘উৎসব’ সিনেমার শো বাড়ানো হয়েছে, এই সাফল্যে আনন্দিত নির্মাতা। এই কৃতিত্ব তিনি ভাগ করে নিয়েছেন পুরো টিমের সঙ্গে।
তামিম বলেন, "প্রথমে মাত্র পাঁচটি শো দিয়ে যাত্রা শুরু। এরপর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫টিরও বেশি শোতে। এতটা সাড়া পাব, কল্পনাও করিনি, আমার ভেতরে বিশ্বাস ছিল এই সিনেমা মানুষের ভালো লাগবে। কিন্তু এই সাড়া আমাদের খুব অনুপ্রাণিত করছে। এই কৃতিত্ব আমার একার নয়, পুরো টিমের। সিনেমা একটা টিমওয়ার্ক। এটা আমরা একসাথে ভালোবেসে করেছি।”
এর পরে সিনেমার পৃষ্ঠপোষক পাওয়া সহজ হবে? এই প্রশ্নে তানিমের ভাষ্য, "আশা করি খুঁজে পাওয়া সহজ হবে। আমাদের এখানে তো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নেই। দুই একটা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান টিকে আছে, আগের মত অসংখ্য নেই। আমরা নিজেরাই যেহেতু উৎসব প্রযোজনা করেছি সামনেরটাও নিজেরাই করব। হয়ত অন্যান্যদের সাথে মিলে কোলাবোরেশন করে কাজগুলো হবে।"
আগামীর পরিকল্পনা নিয়ে তানিম নূর বলেন, একটা সিনেমা নিয়ে গত চার বছর ধরে কাজ করছেন তিনি।
এখন সেই সিনেমার কাজ এগিয়ে নেবেন এবং আবারও কোনো ঈদে ফিরবেন নতুন একটি কাজ নিয়ে।