Published : 21 Jun 2025, 04:03 PM
এবার ঈদের পরে যারা সিনেপ্লেক্সে ‘উৎসব’ সিনেমাটি দেখতে গেছেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকে টিকেট হাতে দাঁড়িয়েছেন দীর্ঘ সারিতে। সিনেমা দেখার পর সেইসব দর্শকদের মুখে একটাই কথা, ‘কী দেখলাম, কী দেখলাম’, ‘কতদিন পর এমন সিনেমা দেখলাম’, ‘আহা ফিরে গেলাম সেই কোথায়’।
সোশাল মিডিয়া জুড়েও ‘উৎসব’ যেন সিনেমা দেখার উৎসব তুলেছে। অনেকে সিনেমার পোস্টার শেয়ার করে লিখেছেন, তাদের মাথা থেকে সিনেমাটি ‘চলে যাচ্ছে না’।
বহু মানুষের প্রংশসাবাক্য আর উচ্ছ্বাস দেখে সিনেমাটি দেখতে ছুটলাম মহাখালীতে সিনেপ্লেক্সের এসকেএস শাখায়।
‘উৎসব’ দেখে মনে হল আশা আছে, এখনো আমাদের সবকিছু ফুরোয়নি! এই দেশের সিনেমাশিল্প নিঃশেষ হয়ে যায়নি এখনো। সহজ কথার শক্ত বাঁধনে লেখা চিত্রনাট্যের ‘উৎসব’ বলে দিয়েছে, মনের আবেগ প্রকাশের ভাষা সময়ের সাথে বদলালেও, অনুভূতি তার গভীরতা হারায়নি।
পুরোনো অ্যালবামের ধুলোমাখা পাতাগুলো খুললে যেমন একে একে জেগে ওঠে বিস্মৃত হয়ে যাওয়া সময়, তানিম নূরের পরিচালনায় ‘উৎসব’ সিনেমাটি তেমনি মনে করিয়ে দেয় এক ফেলে আসা সময়কে।
যে সময়ে আকাশে ঈদের চাঁদ ওঠা মানেই পাড়া মহল্লায় গান, হইচই আর মিলেমিশে আনন্দ করা। যে আমেজ এখন অনেকের কাছে কেবলই স্মৃতি।
‘উৎসব’ সিনেমার শুরুতে শান্তি নীড় এলাকার চাঁদরাতের দৃশ্য তুলে ধরে এই সমাজের হারিয়ে যাওয়া এক দৃশ্যপট। যে দৃশ্যে ঈদ আসে ঈদ কার্ড, অডিও ক্যাসেট, দোকান থেকে ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া করে নিয়ে বাসায় বসে ভিসিআরে সিনেমার দেখার আনন্দকে সঙ্গী করে। এছাড়া সিনেমায় ব্যবহার করা পুরোনো বাংলা নাটকের সাড়া তোলা সংলাপগুলোও ফিরে আসে স্মৃতি-বিস্মৃতির স্তুপ হাতড়ে।
সিনেমা দেখতে দেখতে দর্শকরা কখনো হো হো করে হেসেছে, চোখ মুছেছে, বয়স চল্লিশ পার করা মানুষেরা ফিরে গেছেন নিজেদের কৈশর-তরুণ্যে।

‘উৎসবের’ মূল ম্যাজিকটি হল, সিনেমা শুরু হলে কখন যে দর্শক ‘বুঁদ’ হয়ে যাচ্ছেন, টেরই পাচ্ছেন না। এই সিনেমায় নব্বইয়ে যে সব অভিনেতা নিজেদের তারকাভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তাদের একজন জাহিদ হাসানকে ফিরে পাওয়া গেছে।
২০১০ সাল পরবর্তী প্রজন্ম এই অভিনেতার কটি নাটক সিনেমা দেখেছেন, তা গুণে বলতে হয়ত সময় লাগবে না। ‘উৎসবে’ এক অভূতপূর্ব প্রত্যাবর্তন ঘটেছে এই জাহিদ হাসানের। পাশাপাশি নতুন একটি জুটিও নিজেদের ক্ষমতাকে প্রমাণ করেছে।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘খাইস্টা জাহাঙ্গীর’। হুমায়ূন আহমেদের ‘তিতলি ভাইয়া’ সংলাপ বলে দারুণ সাড়া তোলা অথবা ঢাকাইয়া ভাষায় মজার মজার কথা বলা আরমান ভাই অর্থাৎ জাহিদ হাসান এই চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন নিজস্ব সাবলীলতায়।
‘খাইস্টা জাহাঙ্গীর’ এক কথায় কৃপণ মানুষ। সব কিছুতেই দর কষাকষি, কর্মচারীদের ছুটি না দেওয়া, পাশের বাড়ির গাছের ডাল ভেঙে দেওয়া, চোরা লাইনে বিদ্যুৎ নেওয়াসহ নানা ধরনের কাজকর্ম করাই তার কাজ। তাই নামের আগে বসেছে ‘খাইস্টা’ শব্দ।
পাশাপাশি বাচ্চাদের সংগীতদল নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা, বিড়ালের দুরন্তপনা সহ্য করতে না পারাসহ সব মিলিয়ে জাহাঙ্গীর এক রূঢ় এবং বিরক্তিকর মানুষ। যার প্রতি এলাকার সব মানুষ ক্ষেপে থাকেন। এই মানুষটির জীবনে হঠাৎ হাজির হয় তিন আত্মা বা ভূত; যারা তাকে তার বর্তমান ও অতীত ঘুরিয়ে তাকে নিয়ে যায় ভবিষ্যতে।
ওই ত্রিকাল যাত্রার কারণে এক রাতে মধ্যেই পাল্টে যায় জাহাঙ্গীরের মানসিক গঠন, এবং শুরু হয় আত্মসমালোচনা এবং নিজেকে খুঁড়ে দেখার কাজ।
পর্দা থেকে দূরে থাকলেও জাত অভিনেতারা কখনও মঞ্চ ছাড়েন না, সময়ের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকেন। পুরো সিনেমায় জাহিদ হাসান দর্শকদের তা বুঝিয়েছেন।

সিনেমায় তিন ভূতের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী, জয়া আহসান ও অপি করিম। তিনজনেই নিজ নিজ চরিত্রে যেন জীবন্ত। তাদের মুখে মজার সংলাপে হাসির রোল ওঠে। যে হাসি সহজভাবে এসেছে, জোর করো হাসানোর কোনো চেষ্টাই পরিচালক করেননি। এই তিন চরিত্রের মুখের সংলাপ কেবল হাসায়নি, ভাবিয়েছেও।
দীর্ঘদিন পর অভিনেত্রী অপি করিমকেও পাওয়া গেছে পর্দায়। এই অভিনেত্রীর জন্য আরো খানিকটা জমি ছাড়তে পারতেন পরিচালক। তার চরিত্রটি হুট করে এসে যেভাবে হুট করে বিদায় নিয়েছে, তাতে মনে পড়ে সেই অমর গানের কলি ‘কিছুক্ষণ আরো না হয় রহিতে কাছে’।
তবে পারিবারিক আবেগ থেকে হঠাৎ হঠাৎ স্ল্যাপস্টিক মজা বা আত্মা বা ভূতের মুখে সংলাপের হালকা ভৌতিক ঠাঁট-দুটি মেজাজ একসঙ্গে বয়ে নিতে গিয়ে কোথাও কোথাও গল্পের ছন্দে ছেদ পড়েছে।
‘হাসাবো নাকি ভাবাবো’ এমন একটা টানাপোড়েন দর্শকের মধ্যে তৈরি হবে। ভূতদের সমিতি, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চালানো, ভূতদের একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া-এসব মজার খোরাক যুগিয়েছে।

এ সময়ের দুই অভিনয়শিল্পী সিনেমাজুড়ে আলো ছড়িয়েছেন। তারা হলেন সৌম্য জ্যোতি ও সাদিয়া আয়মান। জাহিদের অল্প বয়সী চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনয় শিল্পী দম্পতি বৃন্দাবন দাস ও শাহনাজ খুশির ছেলে সৌম্য। আর জাহিদের সাবেক স্ত্রী হয়েছেন সাদিয়া আয়মান। যে চরিত্রে পরে আসেন আফসানা মিমি।
পর্দায় সৌম্য ও সাদিয়ার সজীব উপস্থিতি উপলব্ধি করায়, প্রেম প্রকাশের ভাষা, ধরণ বদলাতে পারে কিন্তু গভীরতায় প্রেম বোধহয় সব যুগেই অতল। আবার সব প্রেমে মানুষ কাছে আসে না, দূরেও চলে যায়।

সিনেমায় শেষ দৃশ্যে জাহাঙ্গীরের সাবেক স্ত্রী জেসমিনের সঙ্গে তার ফের দেখা তেমনটাই মনে করায়।
তবে পর্দায় আফসানা মিমির আবির্ভাবে নাটকীয়তার অভাব লক্ষ্য করা গেছে। অথবা যে স্বপ্নভগ্নের যন্ত্রণা নিয়ে জাহাঙ্গীরের সংসার ছেড়েছিলেন জেসমিন, তার সেই সংগ্রামের সময়টি পর্দায় থাকলেও মন্দ হত না। তবে মিমিও সুঅভিনেত্রীর ছাপ রেখেছেন এই চরিত্রে।

বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে শুটিং করেছে ‘উৎসব’ টিম; তবে সিনেমাটোগ্রাফিতে প্রযুক্তির ব্যবহার আহামরি নয়। দেখে বোঝা যা বিশাল অর্থকড়ি নিয়ে সিনেমা বানাতে বসেননি পরিচালক।
তবে সিনেমায় দুইবার চাঁদ রাতের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। সেখানে লাইটিং বা ডেকোরেশন বিশাল কিছু নিয়ে ধরা দেয়নি। দেখে মনে হচ্ছিল কোনো ছোট খাটো একটা নাটকের সেট ডিজাইন করা হয়েছে।
সিনেমার বাকি চরিত্রের সাউন্ড মিক্সার ঠিক থাকলেও ভূতের চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরীর ডায়ালগ ডেলিভারিতে পাওয়া প্রতিধ্বনি কানে কিছুটা ধাক্কা খায়। যা ভূতের সংলাপের সাথে বেখাপ্পা লেগেছে।
এছাড়া সিনেমায় দেখানো নব্বইয়ের বলিউড কিংবা বাংলা সিনেমা, নাটকের রেফারেন্স, মধুমিতা সিনেমা হল, ঈদের গান—সব মিলিয়ে এটি যেন ফেলে আসা সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার চিঠি।
আইটেম সং, নাচ আর অ্যাকশন দৃশ্যের বালাই না রেখে কেবল ছোট ছোট হাসি আনন্দ, দুঃখ-বেদনা ভরা গল্পের এই সিনেমা দেখে মনে হয়, গল্পটা কি আসলেই শেষ হয়েছে!
‘উৎসব’ ভাবনা তৈরি করে, প্রশ্ন জাগায় সেই তো একই দেশ, একই সমাজ, কিন্তু আমরা কোথায় হারালাম সরলতা, পারিবারিক বন্ধন? ঈদের আগের রাতের রোমাঞ্চ-উত্তেজনার এত অভাব কেন! এই সিনেমা ঠিক হারিয়ে যাওয়া ডাকপিয়সের সাইকেলের বেলের শব্দের মত। যে শব্দ এক বুক নতুন আশা তৈরি করে।
সিনেমার অন্যান্য চরিত্রে কাজ করেছেন তারিক আনাম খান, আজাদ আবুল কালাম, ইন্তেখাব দিনার এবং সুনেরাহ বিনতে কামাল। পুরনো অভিনয় শিল্পীরাতো বটেই তবে সহজ অভিনয়ে নজর কেড়েছেন সুনেরাহ।

সিনেমায় দুইটি গান রয়েছে। আর্টসেলের ‘ধূসর সময়’ ও লেভেল ফাইভের 'তুমি'। গান দুইটির চিত্রায়ণ বেশ ভালো এবং সিনেমার দৃশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকায় পর্দায় এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই গান দুইটি দেখা ও শোনা যায়।
‘উৎসবের’ গল্প লিখেছেন তানিম নূর, আয়মান আসিব স্বাধীন, সুস্ময় সরকার ও সামিউল ভূঁইয়া।
ডিরক্টর অব ফটোগ্রাফি হিসেবে কাজ করেছেন রাশেদ জামান। চিত্রনাট্য ও সংলাপ করেছেন আয়মান আসিব স্বাধীন ও সামিউল ভূঁইয়া।
ব্র্যাক ব্যাংক প্রেজেন্টস ‘উৎসব’ সিনেমাটি প্রযোজনা করেছে ডোপ প্রোডাকশন্স, সহ–প্রযোজনায় আছে চরকি। সিনেমার সহযোগী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আছে লাফিং এলিফ্যান্ট।
দেশের পাশাপাশি বিদেশেও শুক্রবার থেকে দেখা যাবে সিনেমাটি।