২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

ডালের পুষ্টিগুণ ঠিক রাখতে রান্নার পদ্ধতিতেও খেয়াল রাখতে হবে

একেক ডালের গুণ একেক রকম। তবে রান্না ও খাওয়ার পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে কতটা উপকারী হবে।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 14 May 2026, 08:01 PM

Updated : 10 Sep 2026, 12:48 PM

‘ডাল ভাত’- কথাটা দিয়ে সহজ-সাধ্য কাজ বোঝানো হলেও শষ্য হিসেবে ডাল মোটেই সরল খাবার নয়।

এই খাবারে যেমন রয়েছে পুষ্টিগুণ তেমনি রান্নার ভুলে হারাতে পারে গুণাগুণ।    

ডাল হল এক প্রকার শিম বা শুঁটি ধর্মী ফসল। এই ধরনের উদ্ভিদের যে সব ভোজ্য শুকনা বীজ খাওয়া হয়, সেগুলোকে ডাল বলা হয়। মসুর ডাল, ছোলা, শিম এবং মটর সবই ডাল ধরনের শস্য।

সস্তা, টেকসই এবং অত্যন্ত বহুমুখী হওয়ার পাশাপাশি, ডালধর্মী শস্য বিভিন্ন পুষ্টিগুণও প্রদান করে।

বিভিন্ন প্রকার ডালের পুষ্টিগুণ

ছোলা

যা গারবাঞ্জো বিন নামেও পরিচিত, প্রোটিন এবং খাদ্য আঁশ সমৃদ্ধ। এটি পটাসিয়াম, ভিটামিন সি এবং ফোলেইটের একটি ভালো উৎস এবং কোলেস্টেরলমুক্ত।

ছোলায় উপস্থিত আয়রন বা লৌহ, ক্যালসিয়াম এবং জিঙ্কের মতো খনিজ উপাদান সুস্থ হাড় ও দাঁত বজায় রাখতে সাহায্য করে।

আঁশের পরিমাণ বেশি, তাই কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করতে এবং সুস্থ পরিপাকতন্ত্র বজায় রাখতেও সাহায্য করে।

সালাদ বা এমনকি তরকারিতেও ছোলা যোগ করা যায়।

কিডনি বিনস বা রাজমা

আঁশ-সমৃদ্ধ জটিল শর্করা এবং কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স থাকায় রাজমা শক্তির একটি স্থিতিশীল উৎস। সালাদে (রান্না করা রাজমার সাথে কালো ও সাদা শিম মিশিয়ে একটি রঙিন থ্রি-বিন সালাদ তৈরি করা যায়) এবং স্যুপে এটি খেতে দারুণ লাগে।

এছাড়াও, রান্না করা রাজমার সাথে রসুন, জিরা এবং লঙ্কা মিশিয়ে একটি সুস্বাদু ‘ক্রুডিটে ডিপ’ বা স্যান্ডউইচ স্প্রেড তৈরি করা যায়।

কালো মটরশুঁটি

এক পরিবেশন কালো শিমে প্রায় ১৫ গ্রাম আঁশ এবং ১৫ গ্রাম প্রোটিন থাকে, যা একটি বেশ চমৎকার সংমিশ্রণ।

এই শিমে আরও রয়েছে আয়রন বা লৌহ, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, কপার এবং জিঙ্ক।

প্রাকৃতিকভাবেই এতে সোডিয়ামের পরিমাণ কম এবং পটাসিয়াম থাকায়, এটি রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে বলে জানা গেছে।

কোলেস্টেরল এবং হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে এই শুঁটিতে থাকা আঁশ।

মেক্সিকান খাবারে কালো শিমের স্বাদ চমৎকার। এটি স্যুপ (পেঁয়াজ, টমেটো এবং পছন্দের মসলার সাথে রান্না করা কালো শিম ব্লেন্ড করে), স্ট্যর ফ্রাই এবং সালাদেও যোগ করা যেতে পারে।

লাল, হলুদ এবং বাদামি মসুর ডাল

রান্না করা প্রতি পরিবেশনে প্রায় ৯ গ্রাম প্রোটিন এবং ৮ গ্রাম আঁশ থাকায়, মসুর ডালে প্রোটিন ও আঁশের পরিমাণ কালো মটর এবং ছোলা থেকে সামান্য বেশি। বিশেষ করে অঙ্কুরিত মসুর ডালে পেশি গঠন, পুনরুজ্জীবন এবং শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে।

মসুর ডালে উপস্থিত ফোলেইট নারীদের ‘নিউরাল টিউব’ ত্রুটি প্রতিরোধ করতে, লোহিত রক্তকণিকা গঠনে সহায়তা করতে এবং হোমোসিস্টিনের মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।

মুগ ডাল

চীনা রান্নায় প্রায়শই ব্যবহৃত হয় মুগ ডাল। এটি প্রোটিন, আঁশ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্টের একটি চমৎকার উৎস।

অন্যান্য কিছু ডালের মতো নয়। এতে অলিগোস্যাকারাইড (এক ধরনের কার্বোহাইড্রেইট) থাকে যা গ্যাস ও পেট ফাঁপা প্রতিরোধ করে এবং কিছু ক্ষেত্রে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করতেও সাহায্য করতে পারে।

এক পরিবেশনে ফোলেইটের দৈনিক প্রস্তাবিত চাহিদার প্রায় ১০০ শতাংশ পাওয়া যায়, যা ডিএনএ সংশ্লেষণ, কোষ ও টিস্যুর বৃদ্ধি, হরমোনের ভারসাম্য, জ্ঞানীয় কার্যকারিতা এবং প্রজননের জন্য একটি অপরিহার্য ভিটামিন।

টমেটো এবং শসার সাথে মেশানো অঙ্কুরিত মুগ ডাল একটি স্বাস্থ্যকর নাস্তা হতে পারে।

এটি দিয়ে প্যাটি তৈরি করা যায়, স্যুপে যোগ করা যায়, ডাল হিসেবে ব্যবহার করা যায় অথবা ডাম্পলিং-এর পুর হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।

ব্রড বিনস

ফাভা বা বেল বিনস নামেও পরিচিত ব্রড বিনস হল খাদ্য-আঁশ (প্রতি ১০০ গ্রামে ৬৬ শতাংশ) সমৃদ্ধ উৎস, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে এবং কোলন বা মলাশয়ে কোলেস্টেরল-সংযোজী পিত্ত অ্যাসিডের পুনঃশোষণ কমিয়ে কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করে।

এক পরিবেশন ব্রড বিনসে ৩ মিলিগ্রাম আয়রন বা লৌহ থাকে, যা পুরুষদের জন্য প্রস্তাবিত দৈনিক গ্রহণের ৩২ শতাংশ এবং নারীদের জন্য ১৪ শতাংশ।

এগুলো বাদামি চালের সাথে মিশিয়ে খাওয়া উপকারী।

রান্নার পদ্ধতির ওপর পুষ্টিমানের ওঠা-নামা

ডাল নিদিষ্ট উপায়ে প্রস্তুত ও পরিবেশন করলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়। তবে ভুল সংমিশ্রনে ডাল খেলে স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে।

কারণ ডালে রয়েছে লুকানো অ্যান্টি- নিউট্রিয়েন্ট যা সঠিকভাবে রান্না না করলে হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

যেমন-

  • কাঁচা বা অর্ধসেদ্ধ ডালে লেকটিন, স্যাপোনিন এবং ট্যানিনের মতো পুষ্টিবিরোধী উপাদান থাকে যা পুষ্টিশোষনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই পুষ্টি বিরোধী উপাদান দূর করতে এবং হজমশক্তি উন্নত করতে ভালোভাবে ভিজিয়ে রাখতে হবে ডাল। অঙ্কুরিত করা এবং ভালোভাবে রান্না করা উপকারী।
  • ডালজাতীয় শস্যে প্রচুর আয়রন বা লৌহ থাকলেও এটি ভালোভাবে শোষন হয় না। কারণ এটি ‘নন-হিম আয়রন’। এজন্য ডাল-ধর্মী শস্য খাওয়ার সময় ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যোগ করতে হবে।
  • ডাল প্রোটিনের ভালো উৎস হলেও এটি সম্পূর্ণ প্রোটিনের উৎস নয়। এতে কিছু অ্যামিনো অ্যাসিডের ঘাটতি থাকে। তাই দুই বা ততোধিক ডাল একসাথে মিশিয়ে খেতে হবে অথবা অন্য কোনো প্রোটিন ধর্মী খাবার যোগ করতে হবে।

যেমন- ভাত, ডাল সংমিশ্রনে খাওয়া যেতে পারে। কারণ ভাতে লাইসিন পরিমাণ কম তবে মেথিওনিনের পরিমাণ বেশি।

আবার ডালে লাইসিনের পরিমান বেশি, তবে মেথিওনিনের পরিমাণ কম।

দুটো একত্রে খেলে অ্যামিনো অ্যাসিডের ঘাটতির যোগান দিবে। এছাড়া ‘ব্রাউন বেডে পিনাট বাটার’ যোগ করে খাওয়া যেতে পারে।

  • ডালে প্রচুর পরিমানে আঁশ রয়েছে। তাই অতিরিক্ত গ্রহণ করলে প্রচুর পরিমাণে তরল পান করতে হবে। না হলে হজমজনিত সমস্যা হতে পারে।
  • ডালে প্রোটিনের পাশাপাশি ক্যালরিও বেশি পাওয়া যায়। তাই সঠিক পরিমাণে শস্যের সাথে ডাল মিশিয়ে এবং ডালের পাশাপাশি অন্যান্য ধরনের উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিনযুক্ত খাবার অন্তর্ভুক্ত করলে, পুষ্টির গুণগত মান উন্নত করতে সাহায্য করে।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেল্থ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।

আরও পড়ুন

স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে যে খাবারগুলো খাওয়া উচিত

পুষ্টিগুণে ভরপুর মসুর ডাল সবার জন্য নিরাপদ নয়

ডাল না ছোলা: কোনটি স্বাস্থ্যকর?