Published : 30 Apr 2026, 04:09 PM
অনেকে বলেন, ‘আমি তো বাতাস খেয়েও মোটা হই’। আবার এমনও আছে- যারা প্রচুর খান তবে ওজন বাড়ে না।
ওজন না বাড়াকে অনেকে সৌভাগ্য মনে করেন। দেহ ঠিক থাকে, পোশাক মানায়। তবে যে মানুষটা রোজ ভাত-মাছ-ডাল খেদয়েও দিনদিন আরও শুকিয়ে যাচ্ছেন, তার জন্য বিষয়টা মোটেই আনন্দের নয়।
শরীর দুর্বল লাগে, কাজে মনোযোগ আসে না, মানুষের কথায় মন খারাপ হয়।
প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক — এত খাচ্ছেন, তবু শরীর নিচ্ছে না কেন?
শুধু খেলেই হয় না
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “অনেকে এই সমস্যায় ভোগেন, কারণ শরীর খাবার হজম করতে পারলেও সেই খাবারের পুষ্টি ঠিকমতো শোষণ করতে পারে না। বিষয়টা অনেকটা এরকম— একটা ছাঁকনি দিয়ে পানি ঢাললে পানি তো যাচ্ছেই, কিন্তু কিছুই আটকাচ্ছে না।”
শুধু পেট ভরানো আর শরীর পুষ্টি পাওয়া— এই দুটো এক জিনিস নয়।
যারা বেশি খেয়েও ওজন বাড়াতে পারছেন না, তাদের ক্ষেত্রে প্রায়ই হজমতন্ত্রে কোনো না কোনো সমস্যা লুকিয়ে থাকে।
“সেই সমস্যাটা না বুঝলে যত খাবারই খান, লাভ হবে না”- বলেন এই চিকিৎসক।
পুষ্টি শোষণ না হওয়া
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থার একটা নাম আছে— ‘ম্যালঅ্যাবসরপশন’। সহজ বাংলায়, পুষ্টি শোষণে ব্যর্থতা।
আমরা যা খাই, সেটা হজম হওয়ার পর ক্ষুদ্রান্ত্রের দেওয়াল দিয়ে রক্তে মিশে যাওয়ার কথা। সেই পুষ্টিগুলো রক্তের মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি কোষে পৌঁছায়, পেশি তৈরি হয়, শক্তি তৈরি হয়, ওজন বাড়ে।
কিন্তু ‘ম্যালঅ্যাবসরপশন’ হলে এই প্রক্রিয়ায় গোলমাল বাধে। পুষ্টিগুলো রক্তে মেশার বদলে হজম না হয়েই শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।
ফলে মানুষটাকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় শরীর ফ্যাকাশে, দুর্বল, কোনো জীবনীশক্তি নেই।
‘ম্যালঅ্যাবসরপশন’ নিজে কোনো আলাদা রোগ নয়, এটি আসলে অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণ। তাই এর সঠিক কারণ বের করতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
যা খাচ্ছেন তাতে কি আসলে দরকারি জিনিসটা আছে
আরেকটা বড় কারণ হলো— পেট ভরছে কিন্তু পুষ্টি পাচ্ছে না। ভাত বেশি খেলে পেট ভরে। তবে শুধু ভাতে শরীর গড়ে না। পেশি তৈরির জন্য প্রোটিন দরকার, আর সেটা অনেকের খাবারের তালিকায় যথেষ্ট থাকে না।
যারা ওজন বাড়াতে চান তাদের জন্য প্রোটিন সবচেয়ে জরুরি উপাদান। ডিম, মাছ, মুরগির মাংস তো আছেই, পাশাপাশি মুগ ডাল, ছোলা, শিমের দানা, সয়াবিন, বাদাম, কাজু— এগুলো প্রতিদিন খাবারে রাখলে শরীর আস্তে আস্তে সাড়া দিতে শুরু করে।
শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, শরীর তৈরির জন্য খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে।
শরীর পরিষ্কার না থাকলে যা খান তা কাজে লাগে না
একটু অন্যরকম একটা কারণও আছে, যেটা অনেকেই ভাবেন না। শরীর যদি ঠিকমতো ‘টক্সিন’ বা দুষিত পদার্থ বের করতে না পারে, তাহলে মেটাবলিজম বা বিপাক ধীর হয়ে যায়।
সহজ ভাষায়, শরীরের ভেতরের যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক চলে না।
এই অবস্থায় যতই খাওয়া হোক না কেন, শরীর সেটা প্রক্রিয়া করতে পারে না।
গাঢ় সবুজ শাকসবজি, রঙিন ফলমূল, মূলজাতীয় সবজি, বিভিন্ন বাদাম— এগুলোতে যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, সেটা শরীরকে ভেতর থেকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। শরীর পরিষ্কার থাকলে পুষ্টি শোষণও ভালো হয়।
এলোমেলো খাওয়াও কিন্তু বড় শত্রু
শুধু কী খাওয়া হচ্ছে সেটাই নয়, কীভাবে খাচ্ছেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকের অভ্যাস, সকালের নাস্তা বাদ দেওয়া। তারপর দুপুরে একসঙ্গে অনেক খাওয়া। এই অভ্যাসটা হজমতন্ত্রের ওপর সরাসরি চাপ ফেলে।
একসঙ্গে পেট ঠেসে খাওয়ার চেয়ে অল্প অল্প করে বারে বারে খাওয়া অনেক বেশি কার্যকর। হজমতন্ত্র তখন প্রতিটি খাবার ঠিকমতো প্রক্রিয়া করার সুযোগ পায়, পুষ্টি শোষণ ভালো হয়।
সকালের নাস্তাকে অবহেলা করলে চলবে না। এটি দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার। শুধু ওজন বাড়ানোর জন্য নয়, সারাদিনের শক্তির ভিত্তি তৈরির জন্যও।
ডাক্তার দেখান, নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন না
বেশি খেয়েও ওজন না বাড়াটা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলে, তাহলে এটাকে স্বাভাবিক ভেবে বসে না থেকে একজন “চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। শরীরের ভেতরে কোনো সমস্যা আছে কি-না, হজমতন্ত্র ঠিকমতো কাজ করছে কি-না— এসব পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া জরুরি”- বলেন ডা. নয়ন।
রোগা থাকাটা সবসময় ‘ভালো ফিগার’ নয়। শরীর সুস্থ থাকাটাই আসল সৌন্দর্য। আর সেই সুস্থতা আসে ঠিকমতো খাওয়া, ঠিক সময়ে খাওয়া আর শরীরের ডাক শোনার মধ্য দিয়ে।
আরও পড়ুন
দীর্ঘজীবন পেতে অল্প সময়ে কঠিন ব্যায়াম
যেসব খাবারে ওজন কমানোর ওষুধের মতো গুণ রয়েছে