ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: ৫ বছরের প্রকল্প ১২ বছরে ৬৬ শতাংশ

আগামী বছর জুনের মধ্যে বাকি কাজ শেষে বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম রোডের কুতুবখালী পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটারে যাওয়া যাবে এক্সপ্রেসওয়ে ধরে।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 Oct 2023, 12:28 PM
Updated : 5 Oct 2023, 12:28 PM

ঢাকার যানজট কমাতে দেশের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে আংশিক চালু হতে যাচ্ছে; তবে পুরোটা খুলে দিতে আরও দেরি, যদিও তা শেষ হওয়ার কথা ছিল সাত বছর আগেই।

বহুল আলোচিত ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ প্রকল্পের এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ৬৬ শতাংশ। এটি প্রথম যখন সরকারের অনুমোদন পায় সেই থেকে পেরিয়ে গেছে ১২ বছর।

আগামী শনিবার আংশিক উদ্বোধন করা হচ্ছে বিমানবন্দরের সামনে কাওলা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১১ কিলোমিটার। সেখান থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডের পাশে কুতুবখালী পর্যন্ত বাকি সড়ক চালু হতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী বছর জুন পর্যন্ত।

দেশের প্রথম এ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মোট দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। তবে এটিতে ওঠা ও নামার জন্য বিভিন্ন স্থানে ৩১টি র‌্যাম্প থাকবে, যেগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ২৭ কিলোমিটার। মূল এক্সপ্রেসওয়ে ও র‌্যামসহ মোট দৈর্ঘ্য হবে মোট ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার।

এ মেগা প্রকল্পে বিলম্বের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক এএইচএম সাখাওয়াত আখতার বলছেন, নানান জটিলতায় প্রকল্পটি শুরু হতেই অনেক দেরি হয়ে যায়। সব ঝামেলা মেটানোর পর প্রকল্পটির কাজ মূলত ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়।

ঢাকার চিরচেনা যানজটের সমাধানের অংশ হিসেবে এক যুগের বেশি সময় আগে এ প্রকল্প হাতে নেওয়ার পর ২০১১ সালের জানুয়ারিতে থাইল্যান্ডের ইটালিয়ান থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এ এক্সপ্রেসওয়ে করতে চুক্তি সই হয়েছিল।

সেই চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পটি ২০১৬ সালে শেষ করার কথা ছিল। তবে পরে আবার ২০১৩ সালের ১৫ ডিসেম্বরে চুক্তিটি সংশোধন করা হয়। কিন্তু এক্সপ্রেসওয়েটির নকশা বদল, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থের সংস্থানসহ নানা জটিলতায় নির্মাণকাজ শেষ করার সময়সীমা এরপর পাঁচবার পিছিয়েছে।

Also Read: যানজটের নগরে এবার খুলছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

Also Read: এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র‌্যাম্পে ঢাকায় যানজট বাড়ার শঙ্কা

Also Read: এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: প্রথম অংশ চালু হতে আরও এক বছর

প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে এটির নির্মাণকাজ শেষ করার মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০১৭ সাল। সেটি পিছিয়ে করা হয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বর। এরপর আবারও পিছিয়ে হয়েছে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

এসময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় চতুর্থবার সেই সময়সীমা পিছিয়ে দাঁড়ায় ২০২৩ সালের জুনে। তবে সর্বশেষ পুরো প্রকল্পের কাজ ২০২৪ সালের জুনে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে মেয়াদ আবার বাড়ানো হয়।

প্রকল্প পরিচালক এএইচএম সাখাওয়াত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রকল্পটি অনেক সমস্যায় পড়ে শুরু করতেই অনেক দেরি হয়ে যায়। আমরা আসলে প্রকল্পটি ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে আসল কাজ শুরু করতে পারি। তবে পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারি মাত্র দেড় বছর আগে ২০২২ সালের প্রথম থেকে।

“সকল সমস্যা দূর করার পর আমরা মাত্র দেড় বছরেই প্রকল্পের প্রায় ৬৬ শতাংশ কাজ শেষ করতে পেরেছি।”

সবশেষ মেয়াদ অনুযায়ী আগামী ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করার বিষয়ে তিনি ‘প্রচণ্ড আশাবাদী’।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উদ্বোধনের পর প্রথম দফায় তেজগাঁও পর্যন্ত চালু করা হলেও আসলে প্রকল্পটির মূল উড়াল সড়কের কাজ মালিবাগ পর্যন্ত হয়ে গেছে।

২৫ বছর টোল নেবে ইটাল থাই

সরকারের সঙ্গে ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির চূড়ান্ত চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানিটি নির্মাণকালসহ মোট ২৫ বছরে এ এক্সপ্রেসওয়ের টোল আদায়ের মাধ্যমে তার বিনিয়োগ ও লভ্যাংশ তুলে নেবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক।

তিনি বলেন, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে প্রকল্পটি নির্মাণের সময় শুরু হিসেবে ধরা হবে। এরপর প্রকল্পটি সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

ইতাল-থাইয়ের আওতায় থাকাকালীন সময়ে প্রকল্পটির রক্ষণাবেক্ষণসহ সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বেও থাকবে কোম্পানিটি।

ব্যয়ের অর্থ সংস্থানে সংকট

২০১১ সালের জানুয়ারিতে হওয়া প্রথম চুক্তি অনুযায়ী এর ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। এরপর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে সংশোধনি চুক্তিতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা।

পিপিপির ভিত্তিতে নির্মাণাধীন প্রকল্পটির চুক্তি অনুযায়ী, এ ব্যয়ের ২৭ শতাংশ ব্যয় বহন করবে বাংলাদেশ সরকার, যেটির পরিমাণ ২ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। বাকি ৬ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা দেবে ইতাল-থাই কোম্পানি।

তবে শুরুর দিকে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ে কোম্পানিটি। ফলে ২০১৩ সাল থেকে কাওলা এলাকায় কিছু পাইলিংয়ের কাজ শুরু করলেও পুরোদমে কাজ করা সম্ভব হয়নি।

এরপর ইতাল-থাই ‘ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কোম্পানি লিমিটেড’ নামের একটি কোম্পানি গঠন করে। এতে ইক্যুইটির পরিমাণ নির্মাণ ব্যয়ের ৩১ শতাংশ এবং ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ড বা ভিজিএফ ২৭ শতাংশ, যা সরকার দিচ্ছে। নির্মাণ ব্যয়ের বাকি ৪২ শতাংশ অর্থ সংগ্রহ নিয়ে সংকটে পড়ে ইতাল-থাই, যেটির প্রভাবে পিছিয়ে যায় নির্মাণকাজ। এরপর ইতাল-থাই কোম্পানি ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (এফডিইই) কোম্পানি লিমিটেড গঠন করে বিনিয়োগকারী কোম্পানি হিসেবে।

এতে ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি লিমিটেডের ৫১ শতাংশ, চায়না শানডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপের (সিএসআই) ৩৪ শতাংশ এবং সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেডের ১৫ শতাংশ শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন চুক্তি করে প্রকল্পে কাজ শুরু করা হয়।

প্রকল্পের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ধাপে ধাপে বন্ধুর পথ পেরিয়ে একাংশ চালু হতে যাওয়া এ এক্সপ্রেসওয়ে সময় ও দুর্ভোগ বাঁচিয়ে ঢাকাবাসীর চলাচল কতটা সুচারু করতে সেটাই এখন দেখার বিষয়।