জ্বালানি সংকট: নিজস্ব অনুসন্ধানে ‘ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে’, বললেন প্রতিমন্ত্রী

“আমাদের প্রচুর সম্পদ কিন্তু এক্সপ্লোরেশনের বাকি আছে”, বলছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 9 August 2022, 01:04 PM
Updated : 9 August 2022, 01:04 PM

চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজস্ব সম্পদ অনুসন্ধানে ‘ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে’ বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

মঙ্গলবার জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস ২০২২ উপলক্ষে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ আয়োজিত ভার্চুয়াল আলোচনাসভায় এ মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, “আমাদের সকলকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং চিন্তা ভাবনা করে এগুতে হবে। আমাদের প্রচুর সম্পদ কিন্তু এক্সপ্লোরেশনের বাকি আছে। মধ্য মেয়াদি ও অল্প সময় মেয়াদি পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে আমরা যত দ্রুত ওই সিদ্ধান্তের কাছে যাব… আমরা যদি আমাদের সম্পদের কাছে থাকতে পারি তাহলে এই ধরনের বিপদ আপদের মোকাবিলা করতে পারব।

“জানি না, ভবিষ্যতে আরও কত বড় বিপদ আসতে পারে। আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এখন। আমাদের হাতে সময় নাই। এই অল্প সময়ে মধ্যে আমাদের সমস্ত যা আহরণ করা দরকার সে কাজ করতে হবে। এটি আমাদের আজকের দিনের শপথ হওয়া উচিৎ।”

দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে নিজস্ব তেল, গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর কথা বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে সরকার গত শুক্রবার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ৫২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিতও দিয়েছেন। আট মাস আগে ২৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল ডিজেল ও কেরোসিনের দাম।

এরপর থেকে আবারও নিজেদের গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরালো করার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

বাংলাদেশে মোট ২৮টি গ্যাস ফিল্ড রয়েছে। এরমধ্যে ২০টিতে গ্যাস উত্তোলন করা হয়। আর ভূমি ও সাগরে মোট অনুসন্ধান ব্লক রয়েছে ৪৮টি। এরমধ্যে ভূমিতে ২২টি ও ২৬টি সাগরে।

ভূমি থেকে গ্যাস উত্তোলনের পরিমাণ দিন দিন কমছে। আর সাগরে অনুসন্ধান ও উত্তোলন নেই বললেই চলে। কিন্তু বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে গ্যাসের মজুদ রয়েছে বলে ধারণা খাত সংশ্লিষ্টদের।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানিই প্রধান ভরসা বলে মনে করেন।

বর্তমান সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এবং এটা যে এখনই শেষ হয়ে যাবে, জানি না। এটা যদি একবছর ধরে চলে বড় বড় বিপদ এসে যাবে। স্পটে এলএনজির মূল্য এখন ৪০ ডলারের মত। এটা আগামী শীতে কত যাবে তা আল্লাহ জানে।

“সুতরাং আমরা স্পট মার্কেট যদি এক্সেস না করতে পারি আমাদের লং টার্মই কিন্তু ভরসা। সেই এলএনজি নিয়েই কিন্তু আমাদের চালাতে হবে।”

নতুন করে অনুসন্ধান চালিয়ে তেল, গাসের সন্ধান পাওয়া গেলেও তা উত্তোলন করে ব্যবহার উপযোগী সময়সাপেক্ষ মন্তব্য করে তিনি বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবাইকে আবারও সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, “গভীর সমুদ্রেও যদি আমরা কিছু পাই সেটা কী করা হবে? পাইপলাইন দিয়ে আনা হবে নাকি... যেদিন পাব সেদিন থেকেও ১০ বছর লেগে যাবে।

“এই ১০ বছর তো আমাদের উৎরাতে হবে। সেজন্য আলোচনায় এসেছে আমরা জ্বালানির বিষয়ে যত বেশি সাশ্রয়ী হব তত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।”

তৌফিক ইলাহী বলেন, আমাদের একাডেমিক এক্সারসাইজ নিয়ে চলবে না। একসময় বলা হল বাংলাদেশ গ্যাসে ভাসতেছে। এই হাইপের মধ্যে আবার এক্সপোর্ট করার কথা উঠল। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের ৫০ বছরের মজুদ যদি না থাকে তাহলে আমরা করব না।

“অনেকে বলেন, ৩টি বা ৫টি কূপ খনন করলে একটি কূপে গ্যাস পাওয়া যায়। বাপেক্স ৫ বছরে সব মিলিয়ে ৩৪টা কূপ খনন করেছে। কনকো ফিলিপস বা পসকো দাইয়ু ছেড়ে গেল, কেন? গত ১০ বছরে মিয়ানমারে নতুন কোনও গ্যাস পাওয়া যায়নি, যা পাওয়া গেছে তা ১০ বছর আগে।”

“আমি এগুলো বলার অর্থ হচ্ছে, এর সাথে একটা ভূ-রাজনৈতিক দিক আছে, যেটা আমাদের মনে রাখতে হবে,” যোগ করেন তিনি।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি বহুমুখীকরণের নীতি নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, আমাদের অর্থনীতিকে সমর্থন দিয়ে যেতে হবে। এখানে বলা যাবে না যে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন, দুই বছর বা পাঁচ বছর অপেক্ষা করুন।

“পৃথিবীর মধ্যে বিপর্যয় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৫ ডলার হয়ে গেছে তেলের দাম। জার্মানি রিনিউয়েবল নিয়ে এত কথা বললো। তারা পুরনো মান্ধাতার আমলের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করছে। জার্মানিতে ৬০ হাজার মেগাওয়াটের মত বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপাদিত। যুক্তরাষ্ট্রে ২ লাখ মেগাওয়াট হয় কয়লা থেকে।”

তিনি বলেন, “আর আমরা যখন প্রথম কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করলাম, তখন পরিবেশবাদীরা বললো যে, আমরা পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিচ্ছি। কিন্তু এগুলো উন্নত প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্র। এজন্য বিনিয়োগও বেশি হয়েছে। এরসঙ্গে বহুমুখীকরণের জন্য নিউক্লিয়ার পাওয়ার করলাম।

“ভারত থেকে সহজ মূল্যে আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি। নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে কাজ করছি জলবিদ্যুৎ নিয়ে।”

বর্তমান যে সন্ধিক্ষণ- এটা সবাই মিলে মোকাবিলা করতে হবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।

১৯৭৫ সালের ৯ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বহুজাতিক শেল অয়েল কোম্পানির কাছ থেকে পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র- তিতাস, বাখরাবাদ, হবিগঞ্জ, রশিদপুর ও কৈলাশটিলা কিনে রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেন। তখন দাম পড়েছিল ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিং। ১৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট মজুদের সেসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে এখনও দেশের গ্যাস উৎপাদনের ৩০ শতাংশের জোগান আসে।

৯ অগাস্ট সরকারিভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। আলোচনাসভায় বঙ্গবন্ধুর নেওয়া সেই সময়ের সিদ্ধান্তকে যুগান্তকারী, সাহসী ও দুরদৃষ্টিসম্পন্ন হিসেবে উল্লেখ করেন বক্তারা।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াশেকা আয়েশা খান, বিদ্যুৎ সচিব হাবিবুর রহমান, বিপিসির চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক