বৈশ্বিক সংকট: বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কমালো বিশ্ব ব্যাংক

বিশ্ব ব্যাংকের পূর্বাভাসে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ৬ দশমিক ১ শতাংশ করা হয়েছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 Oct 2022, 04:05 PM
Updated : 6 Oct 2022, 04:05 PM

বৈশ্বিক অস্থিরতার ধাক্কা বাংলাদেশের অর্থনীতি তুলনামূলক ভালোভবে সামলাতে পারলেও চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কমিয়ে এনেছে বিশ্ব ব্যাংক।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি ৬ দশমিক ১ শতাংশ বাড়তে পারে, যা আগের প্রাক্কলনের চেয়ে দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট কম। 

মূলত বৈশ্বিক সংকটের বিস্তৃত পরিসর বিবেচনায় নিয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে এই পরিবর্তন আনার কথা বলেছে আর্থিক খাতের এই বিশ্ব সংস্থাটি। 

বিশ্ব ব্যাংক বলছে, আর্থিক সংকট দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে চাপে ফেললেও, কয়েকটি দেশ অন্য দেশগুলোর তুলনায় ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারছে। এর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। 

প্রতিবেশী ভারতের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের হিসাবের চেয়ে পুরো এক শতাংশ পয়েন্ট কমিয়েছে সংস্থাটি। নতুন প্রাক্কলন বলছে, চলতি অর্থবছরে ভারত সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেতে পারে। 

বিশ্ব ব্যাংক বলছে, কোভিড-১৯ মহামারীর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট, পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যা, বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীর গতি এবং ইউক্রেইনে যুদ্ধ যোগ হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়া একটি অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ধাক্কা খেয়েছে। 

এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি কমে আসছে জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশগুলোর এখন উচিত অর্থনীতির ‘সহনশীলতা’ আরও বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া।

 দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি ভারতে রপ্তানি ও সেবা খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর গতি গড় বৈশ্বিক ঘুরে দাঁড়ানোর হারের চেয়ে বেশি। সেদেশের বৈদেশিক মুদ্রার যথেষ্ঠ মজুদও অর্থনীতির জন্য একটি সুরক্ষা হিসেবে কাজ করেছে। 

বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমে আসায় এবং ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্টে’ এর চাপ বাড়তে থাকায় দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের পর, তৃতীয় দেশ হিসেবে জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করে বাংলাদেশ। 

“তবে অন্য দুই দেশের মত বাংলাদেশের রিজার্ভ বিপদজনকভাবে তলানিতে নেমে যায়নি, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতাও চলছে না, এবং মূল্যস্ফীতির হারও এখনও ১০ শতাংশের নিচেই আছে, যদিও তা সাম্প্রতিক হিসাবে ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে,” বলছে বিশ্ব ব্যাংক। 

ডলারের সাম্প্রতিক চাঙাভাব, আর ডলারের বিপরীতে ইউরোর দরপতনে বাংলাদেশ থেকে আমদানি পণ্যে বেশি খরচ করতে হচ্ছে ইউরোপীয় ভোক্তাদের, কারণ দুই পক্ষের বাণিজ্যের লেনদেন ডলারে মীমাংসা হয়ে থাকে এবং স্বল্প মেয়াদে ডলারের দর যথেষ্ট চড়া অবস্থায় আছে।

এর ফলে ডলারের বিপরীতে টাকা দর হারালেও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এর সুবিধা পাচ্ছেন না।

 বিশ্ব ব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক রাইজার বলেন, মহামারী, বৈশ্বিক তারল্য ও পণ্যমূল্যে হঠাৎ পরিবর্তন, কিংবা আবহাওয়ার চরম বিপর্যয়কে এক সময় ঝুঁকির তালিকায় শেষ দিকে রাখা হত। কিন্তু গত দুই বছরের মহামারীর ধাক্কার ঠিক পরপরই এই তিন বিপর্যয় দ্রুত দেখা দিয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে।   

তিনি বলেন, “এসব ধাক্কা মোকাবেলার জন্য এ অঞ্চলের দেশগুলোকে মজবুত আর্থিক কাঠামো ও মুদ্রার মজুদ গড়তে হবে, এবং নিজেদের জনগণের সুরক্ষা বাড়াতে সীমিত সম্পদের পুনর্বিন্যাস করতে হবে।” 

বিশ্ব ব্যাংক জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বাণিজ্যে বিধিনিষেধ এই অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। তাতে দক্ষিণ এশিয়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং ধারণা করা হচ্ছে এ বছর তা ৯ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে এরপর তা কমতে শুরু করবে। 

“বিশেষ করে এ অঞ্চলের দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর প্রকৃত আয় ব্যাপকভাবে সঙ্কুচিত হয়েছে, যারা তাদের আয়ের সিংহভাগ খাবার কেনার পেছনে খরচ করতে বাধ্য হন।” 

এছাড়া কোভিড-১৯ মহামারীর সময় মানুষের চলাফেরায় বিধিনিষেধ থাকায় দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসী কর্মীদের মধ্যে যারা অনানুষ্ঠানিক পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, তাদের অনেকেই দারুণ ক্ষতির শিকার হয়েছেন। 

অবশ্য মহামারীর পরের দিককার পরিস্থিতি এটাও দেখিয়েছে যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে অভিবাসন কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

বিশ্ব ব্যাংকের জরিপের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২২ এর প্রথম ভাগ পর্যন্ত, যে অঞ্চলগুলো মহামারীতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেসব অঞ্চলে অভিবাসীদের প্রবাহ, যেসব অঞ্চল তুলনামূলক কম ক্ষতির মুখে পড়েছে সেসব অঞ্চলের চেয়ে বেশি ছিল, যা কোভিড-১৯ পরবর্তী ধাক্কা সামলাতে শ্রমের চাহিদা ও যোগানের ক্ষেত্রে একটি সমতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক