Published : 08 Dec 2025, 04:48 PM
মূল্যস্ফীতি পাঁচ শতাংশের ঘরে নামিয়ে আনতে সুদের হার 'আরো বাড়াতে হবে' বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী।
দেশে অনানুষ্ঠানিক খাতের পরিসর বিস্তৃত বলেই এ নীতি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তার ভাষ্য, “আমাদের মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে। সন্দেহ নেই যে, এর কৃতিত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। উনি (গভর্নর) যে যুক্তিটা দিয়েছেন, আমার সে যুক্তির সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই।
"কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে একটা জায়গায় গিয়ে। যেহেতু আমার এখানে অনানুষ্ঠানিক খাত অনেক বিস্তৃত, সেখানে সুদহার আরো অনেক বাড়াতে হবে, যদি আপনি মূল্যস্ফীতি পাঁচে আনতে চান।”
সোমবার ঢাকার শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব বলেন।
অনুষ্ঠানে মূল্যস্ফীতি আরো কমে না আসা পর্যন্ত সুদের হার না কমানোর পক্ষে নিজের যুক্তি তুলে ধরেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
পরে বক্তব্য দিতে এসে আনিসুজ্জামান চৌধুরী তাতে সায় দিয়ে এ বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, "তারপর এখানে প্রশ্ন এসেছে, যদি আমি মূল্যস্ফীতি কমাতে না পারি, ঋণের খরচ কমাতে না পারি (সুদের কারণে), তাহলে আমাকে অন্য জায়গায় বিজনেস ফ্রেন্ডলি করতে হবে।"
তিনি বলেন, "চট্টগ্রাম বন্দরের কথা এসেছে। চিন্তা করে দেখেন। চট্টগ্রাম বন্দরে আমরা এখন আপনার কাস্টমস ই-ক্লিয়ারেন্সের জন্য বাক্স খুলে দেখতে হচ্ছে না, আমরা স্ক্যানার বসায় দিয়ে আসছি। স্ক্যানারে আপনার কন্টেইনার যাবে, সমস্ত কাগজপত্র ডিজিটাল হয়ে গেছে এখন।"
বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে বন্ধরের 'এফিশিয়েন্সি' বাড়ানো হচ্ছে তুলে ধরে বলেন, "আসলে এই যে এটার যে সমালোচনাটা হচ্ছে, এই পোর্টের ইফিসিয়েন্সি আমি যদি বাড়াতে না পারি, তাইলে তো আমি এখানে ‘কস্ট অব ফান্ড’ কমাতে পারছি না।
"আহসান ভাইকে (গভর্নর) যদিও আমি সবসময় অনুরোধ করে যাব, আরেকটু কমান (সুদের হার)।"
বন্দরে বিদেশি কোম্পানি নিয়ে বিতর্কের প্রশ্নে তিনি বলেন, "পলিসি সার্কেলে এরকম থাকবেই, বিতর্ক থাকবেই। এবং এটাই তো বলছি, কোহিয়ারেন্স আনতে হবে আমাকে। বিতর্কের মধ্য দিয়ে আসবে। অনেস্ট বিতর্ক হবে। ডেটাবেজ বিতর্ক হবে।
"এটার কারণ, এখানে কনসেনসাস নাই। সে কনসেনসাস আনতে হবে। বিতর্কের মধ্য দিয়ে আনতে হবে। অনেস্টলি বিতর্ক করতে হবে, যেটা শফিক (প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব) বারবার জোর দিয়েছে। আমরা বিতর্কের বিরোধী না, ডেটাবেজ, ফ্যাক্টবেসড হতে হবে সেটা। অবজেক্টিভ হতে হবে।"
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে ডেনিশ এ কোম্পানির সঙ্গে ‘পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ প্রকল্প আকারে চুক্তি হয়েছে। যেখানে সম্পূর্ণ বিনিয়োগ করবে কোম্পানিটি।
২০৩০ সালের মধ্যে তিন বছরে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত ও এরপর পরিচালনার জন্য ৩০ বছরের চুক্তি হয়েছে কোম্পানিটির সঙ্গে।
সেক্ষেত্রে ‘সাইনিং মানি’ হিসেবে ২৫০ কোটি টাকা এবং নির্মাণকালে সব মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার কথা বলেছে এপিএম। সরকার থেকে কোনো অর্থায়ন বা গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে না।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের অদূরেই আরেকটি টার্মিনালে পশ্চিমা কোম্পানিকে যুক্ত করাকে গুরুত্বপূর্ণ ‘অবকাঠামো ছেড়ে দেওয়া’ হিসেবে দেখছেন অনেকে। ভবিষ্যতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি বিদেশি শক্তির ‘ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের’ কৌশলের অংশ হওয়ার শঙ্কার বিষয়টিও আলোচনা আসছে।
অবস্থানগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে কর্ণফুলি নদীর ডান তীরের এ চরে নির্মাণ হতে যাওয়া টার্মিনালটি মূল বন্দরের ‘বড়’ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে কিনা, সেই শঙ্কার কথাও বলছেন বন্দর সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিপরীতে রাজপথেও নেমেছেন অনেকে; সংবাদমাধ্যমেও নিবন্ধ লিখছেন কেউ কেউ।
সরকারের চুক্তির অতি গোপনীয়তার জন্যও প্রথম থেকে সরব ছিলেন বাম রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থনীতিবিদরা।
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “কর্মসংস্থান বাড়াতে কী করা লাগবে, সেটার জন্য প্রধান উপদেষ্টা আমার মনে হয় কয়েক ডজন ‘গ্লোবাল বিজনেসেসের’ সঙ্গে কথা বলেছেন। তার বড় একটা উপসংহার ছিল, যে করেই হোক আমাদের চিটাগাং পোর্টকে ইফিশিয়েন্ট করতে হবে।
"না হলে আমার ম্যানুফেকচারিং রেভ্যুলেশন হবে না। ম্যানুফেকচারিং হাব হিসেবে আমি ইমার্জ করতে পারব না আমার এত ইনএফিশিয়েন্ট একটা পোর্ট নিয়ে।"
শফিকুল আলম বলেন, "কিন্তু আপনি যদি দেখেন যে কীভাবে এই ডিবেটটাকে হাইজ্যাক করা হয়েছে। এই ডিবেটটাকে নেওয়া হয়েছে কি...আপনি (সংবাদমাধ্যম) এমন সব 'টিনি গ্রুপকে’ যারা রিপ্রেজেন্ট করছেন, তাদের ভয়েসকে আপনি এমপ্লিফাই করছেন।”
যাদের কণ্ঠ সংবাদমাধ্যম তুলে ধরছে, তাদের এ বিষয়ে 'মিনিমাম আইডিয়া' নাই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রেস সচিব বলেন, "দেখা যাচ্ছে যে আপনি এই জবটা এই গভর্নমেন্ট অ্যাচিভ করতে চাচ্ছে, কিন্তু আপনি (সংবাদমাধ্যম) হাইজ্যাক করতে চাচ্ছেন। যেই সমস্ত ভয়েসকে আপনি এমপ্লিফাই করছেন, তার মিনিমাম কোনো আইডিয়া নাই, কীভাবে একটা বন্দরকে ইফিশিয়েন্ট করা হয়। আপনি তিন চারবার তার লেখা দিচ্ছেন।"
সরকারের এ সিদ্ধান্ত ইতিহাসে 'ভালোভাবে' মূল্যায়িত হবে বলেও মনে করেন প্রেস সচিব।