Published : 14 Nov 2025, 02:03 AM
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং কাঠামোগত সংস্কারে বাংলাদেশ ‘উল্লেখযোগ্য’ অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
এবারের ঢাকা সফরের শেষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থাটির বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জি এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বিদেশ নির্ভরতা কমাতে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশটির সরকার রাজস্ব ও আর্থিক নীতি উভয়ই কঠোর করেছে।
তবে বাংলাদেশের সামনে আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ থাকার কথা তুলে ধরে সতর্ক করেন তিনি। বলেন, দুর্বল কর রাজস্ব ব্যবস্থা, আর্থিক খাতে মূলধনের ঘাটতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এগুলো মোকাবিলায় কর ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ওপর গুরুত্বারোপ করে ক্রিস পাপাজর্জি বলেন, একটি সহজ ও ন্যায্য কর পরিবেশ গড়ে তোলা গেলে আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা সম্ভব হবে।
সফর শেষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আর্থিক খাতের বেশ কিছু সংস্কার দ্রুততম সময়ে করার পরামর্শও দিয়েছে দলটি।
এর মধ্যে রয়েছে কম হারে নেওয়া ভ্যাট বাতিল করা, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার বাইরে অন্যান্য ছাড় তুলে দেওয়া, সব প্রতিষ্ঠানের জন্য ন্যূনতম টার্নওভার কর হার বাড়ানো, সংস্কার কার্যকর করতে কর প্রশাসনকে শক্তিশালী করা, ভর্তুকি সীমিত করা।
চলমান ঋণের পরের কিস্তি ছাড়ের আগে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থের ব্যবহার দেখতে সংস্থাটির বাংলাদেশ মিশন প্রধান ক্রিস পাপাজর্জির নেতৃত্বে গত ২৯ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা সফর করে আইএমএফ রিভিউ মিশন।
আর্থিক খাতে নেওয়া সংস্কার বাস্তবায়িত হলে আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সফর শেষের সংবাদ সম্মেলনে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটির বাংলাদেশ মিশন প্রধান।
২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশে ও ২০২৭ সালে আরেও কমে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসার আভাস সংবাদ সম্মেলনে দিয়েছে সংস্থাটি।
মূল্যস্ফীতি এমন পর্যায়ে নেমে না আসা পর্যন্ত নীতিসুদ হার বর্তমান অবস্থায় ধরে রেখে আটসাঁট মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।
দীর্ঘ সময় দুই অঙ্কের ঘরে থাকা মূল্যস্ফীতি সবশেষ গত অক্টোবরে ৮ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে কিছুটা কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হওয়ার কারণ তুলে ধরে সংস্থাটি বলেছে, ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের কারণে সার্বিক উৎপাদন কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে।
সংবাদ সম্মেলনে সফরকারী দলের নেতা ক্রিস পাপাজর্জি পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর সংস্কার জরুরি বলে তাগিদ দেন।
বিনিময় হার সংস্কারের পর চলতি বছরের গত মে মাস থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরায় বাড়তে শুরু করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মিশন প্রধান ক্রিস পাপাজর্জি বলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধানে একটি বিশ্বাসযোগ্য কৌশল প্রয়োজন, যাতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে ব্যবস্থাপনাগত ঘাটতির বিষয়টি। আর্থিক সহায়তার পরিসর এবং আইনি ভিত্তিসম্পন্ন পুনর্গঠন ও সমাধানের পরিকল্পনাও থাকতে হবে।
দুর্বল ব্যাংকের উপর চালানো ‘অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ’ (একিউআর) রাষ্ট্রায়ত্ব সব ব্যাংকের উপর করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
আইএমএফের ঋণ সূচি অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় না হলে সপ্তম কিস্তির সঙ্গে মিলিয়ে একসঙ্গে ছাড় হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
এর আগে বিনিময় হার ইস্যুতে সমঝোতা দেরিতে হওয়ায় চতুর্থ কিস্তির অর্থ ও পঞ্চম কিস্তির সঙ্গে পায় বাংলাদেশ।
আর্থিক সংকট সামাল দিতে ২০২২ সাল থেকে কয়েক দফা আলোচনা শেষে পরের ব্ছরের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ।
সবশেষ গত জুনে অর্থ ছাড়ের সময়ে ঋণের আকার বাড়িয়ে করা হয় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। সে বছর ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার পায় বাংলাদেশ। একই বছরের ডিসেম্বরে পাওয়া গেছে দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ২০ লাখ ডলার।
২০২৪ সালের জুনে পাওয়া গেছে তৃতীয় কিস্তির ১১৫ কোটি ডলার। গত জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি একসঙ্গে মিলিয়ে ১৩৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ।