Published : 25 Apr 2026, 09:33 PM
আগের সরকারের সময়ে আর্থিক খাতে অনেক বেশি রাজনীতিতীকরণ করার ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ‘খালি হয়ে গেছে’ বলে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আওয়ামী শাসনামল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সময়কালও ‘খুব বেশি যে ভালো’ ছিল- এমনটাও মনে করেন না তিনি।
নির্বাচিত বর্তমান সরকারের আমলে বিগত সময়ের ‘পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি’ থেকে সরে এসে অর্থনীতির ‘গণতান্ত্রিকায়নের’ দিকে ফেরাতে কাজ শুরুর কথা বলেন তিনি।
শনিবার বিকালে সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী কথা বলছিলেন।
তিনি বলেন, “আর্থিক খাতে যে বিশৃঙ্খলাগুলো হয়েছে এগুলো কেন হয়েছে? আর্থিক খাত এত ‘রাজনীতিকীকরণ’ হয়েছে যে ব্যাংকগুলো আজকে খালি হয়ে গেছে।
“শেয়ার বাজার লুটপাট করায় ফিনিশড হয়ে গেছে। তো এরকম একটা জায়গা থেকে আমরা যখন ফিরে আসতে চাচ্ছি এখন, আমাদের ফিনান্সিয়াল সেক্টরে রেজুলেশনের একটা বিষয় আছে।”
তিনি বলেন, “ব্যাংকগুলো আন্ডার ক্যাপিটালাইজড হয়ে গেছে। বেসরকারি খাতও আন্ডার ক্যাপিটালাইজড হয়ে গেছে। আপনার ৪০ পারসেন্ট কারেন্সি ডেপ্রিসিয়েশনে নাই। একজন ব্যবসায়ীর যদি ৪০ পারসেন্ট কারেন্সি ডেপ্রিসিয়েশনে চলে যায়, (এর সঙ্গে) ১৪ পারসেন্ট ইনফ্লেশন রেটে চলে গেছে চিন্তা করেন। তার ইরোশন (পুঁজির), তার ক্যাপিটাল ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ইরোডেড হয়ে গেছে। এই লোকগুলোতো অপারেট করতে পারছে না।
“এখানে কিন্তু আন্ডার পারফরম্যান্স করতেছে (শিল্পগুলো)। যে আন্ডার পারফর্ম করতেছে এমন ইন্ডাস্ট্রি এবং বিজনেস অনেক বেশি। এবং এজন্য অনেক লোক চাকরি হারাচ্ছে কিন্তু। সুতরাং এদেরকে ক্যাপিটালাইজ (করতে হবে), আমাকে রি-ক্যাপিটালাইজ করতে হবে।”
তবে তাদের পুঁজি সহায়তা করার ক্ষেত্রে সরকারের অক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরতে যেয়ে আমির খসরু বলেন, “এখন সরকারের তহবিলে আমাদের এত টাকা নেই যে, এগুলো সব সরকারের তহবিল দিয়ে রি-ক্যাপিটালাইজ করতে পারব।
“আর বিশেষ করে আমরা ইনহেরিট করেছি- যে অর্থনীতিটা পেয়েছি ওই ‘ডিক্টেটোরিয়াল রেজিম’ থেকে। তারপর গত ১৮ মাসের যেটা পেয়েছি। কোনোটার চেয়ে কোনোটা ‘খুব বেশি যে ভালো তা আমি বলতে পারব না’। এর চেয়ে বেশি বলতে চাই না। সুতরাং সবগুলো দায়িত্ব তো আমাদের কাঁধে।
“তারপরে এসেছে আপনার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। এটা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এই যে বিশাল ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, খালি আর্থিক খাতে না ফিসকাল সেক্টরেও স্পেস কমে গেছে।”
অর্থমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতি একটা অলিগার্কদের হাতে চলে গিয়েছিল। অর্থাৎ, পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি হয়ে গিয়েছিল। আজকে বাংলাদেশ যেখানে, যে গর্তের মধ্যে পড়েছি, এটার মূল কারণ হচ্ছে একটা পৃষ্ঠপোষকতা রাজনীতির মাধ্যমে কিছু লোকের কাছে দেশের অর্থনীতি, তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
“এখন দেশের অর্থনীতি যখন কিছু লোকের হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়, এটা অর্থনীতির মধ্যে থাকে না। এটা তখন রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে যায়, সরকারের নীতিমালা প্রণয়নের মধ্যে প্রভাবিত হয়, সব জায়গাতে হয়। এবং যে কারণে আজকে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। এজন্য এই অলিগার্কিক পৃষ্ঠপোষকতা রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য গণতান্ত্রিকায়নের কথা বলছি অর্থনীতিতে। শুধু রাজনীতিকে গণতন্ত্রায়ন করলে তো হবে না, আমাদের অর্থনীতিকে গণতন্ত্রায়ন করতে হবে।”
তিনি বলেন, এজন্য একদম প্রান্তিক মানুষের কাছে সরকারের সেবা ও সহযোগিতা পৌঁছে দিতে বিএনপি সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড দিচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে ‘ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ড’ বাড়াতে কাজ করার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি। এর প্রতিফলন আগামী অর্থবছরেই দেখা যাবে বলে তার ভাষ্য।
টাকা ছাপানোর তথ্য ‘সত্য না’: গভর্নর
বেসরকারি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএনপি সরকারের দুই মাসে ২০ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছাপানোর যে তথ্য দিয়েছে তা ‘কোনোভাবেই সত্য না’ বলে এ বৈঠকে বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
তিনি বলেন, “যে নিউজটা আসছে, নিউজটা কোনোভাবেই সত্য না। এই যে বলা হয়েছে যে, ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপানো হয়েছে- এর কোনো আসলে অস্তিত্ব নেই। এটা যেটা হয় যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে সরকারের দুইটা অ্যাকাউন্ট আছে। ‘ওয়েজ অ্যানন্ড মিনস’ (সরকার বা কোনো সংস্থার ব্যয় মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বা সম্পদ সংগ্রহের উপায় ও পদ্ধতিকে বোঝায়) একটা অ্যাকাউন্ট আছে যেখান থেকে সরকার টাকা নেয়, টাকা দেয়, খরচ করে। এখানে আমাদের ১২ হাজার কোটি টাকার একটা লিমিট আছে, আর সব দেশে সব সরকারেরই থাকে।
“আরেকটা যখন এর থেকে (১২ হাজার কোটি) বেশি দরকার হয়, ওভার ড্রাফট। সরকার আজ একটা বিল পেমেন্ট করছে, কালকে রেভিনিউ কালেকশন করছে, এটা ওভার ড্রাফটের মধ্যের একটা ব্যাপার।”
সরকার বর্তমানে কোন অবস্থায় সে তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা যদি ১৭ ফেব্রুয়ারি যখন এই (বিএনপি) সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন ওয়েজ অ্যান্ড মিনস এর ব্যালেন্স ছিল ১৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা।
“এর মধ্যে আবার কমেছে, বেড়েছে, বাড়ছে, কমছে, বেড়েছে—এভাবে প্রতিদিনই কমে বাড়ে। কারণ আজকে হয়তো টাকা সরকার নিচ্ছে, কালকে দিয়ে দিচ্ছে। ২২ এপ্রিল অর্থাৎ দুই দিন/তিন দিন আগে এখন আমাদের ব্যালেন্স আছে হচ্ছে ১১ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ কমে গেছে কিন্তু সরকারের টাকা নেওয়ার পরিমাণ। এটা আবার বাড়তে পারে কালকে, আবার কমে যাবে।
“এটা একটা নরমাল ট্রানজেকশন। সেখানে এমন না যে আমি টাকা ছাপাচ্ছি আবার পরের দিন টাকা এনে টাকা পুড়িয়ে দিচ্ছি বা ডেমোনেটাইজ করছি, তা না।”
এ সময় অর্থমন্ত্রীও বলেন, “যাতে আমাদের প্রাইভেট সেক্টর ক্রাউড আউট না হয়, যাতে টাকা ছাপিয়ে হাই পাওয়ার মানি দিয়ে আমাদের ইনফ্লেশনারি সিচুয়েশন সৃষ্টি করতে না হয়— এই জায়গাটাতে আমরা থাকার চেষ্টা করতেছি।”
এমন ক্ষেত্রে ভুল কোনো তথ্য এলে তা নির্বাচিত সরকারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যায় বলে তুলে ধরেন তিনি।
বৈঠকে অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান উপস্থিত ছিলেন।