Published : 03 Jun 2026, 11:50 PM
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের আগের ঋণ কর্মসূচি থেকে বের হয়ে এসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন কর্মসূচির আওতায় ঋণ চেয়েছে বাংলাদেশ।
দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিকে সমর্থন দিতে নতুন এই ঋণ চেয়ে ঋণ দানকারী আন্তর্জাতিক এ সংস্থাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে বুধবার আইএমএফের বাংলাদেশবিষয়ক মিশনপ্রধান ইভো কার্জনার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন।
তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কী পরিমাণ ঋণ চাওয়া হয়েছে সে ব্যাপারে বিবৃতিতে কিছু বলা হয়নি।
বিবৃতিতে ইভো কার্জনার বলেছেন, “বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ তাদের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিকে সমর্থন করার জন্য আইএমএফের কাছে একটি নতুন আর্থিক চুক্তির অনুরোধ করেছে। সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনার অংশ হিসেবে আইএমএফের কর্মকর্তারা সরকারের সংস্কার কর্মসূচি ও নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।”
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার বিগত সরকারের ঋণ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চায় না বলে আগেই জানিয়েছিল। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে আইএমএফের কাছে নতুন কর্মসূচির আওতায় ঋণ চাইল সরকার।
ইভো কার্জনারের বিবৃতিতে বলেছেন, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান কর্মসূচিগুলো হল বর্ধিত ঋণসহায়তা (ইসিএফ), বর্ধিত তহবিল সহায়তা (ইএফএফ) এবং রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ)। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের পর থেকে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
“সরকারকে এখন আরও জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, নিম্ন রাজস্ব আহরণ এবং নতুন ও ধারাবাহিক সংস্কার উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।”
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের এই অনুরোধ সংস্থাটির সঙ্গে এমন একটি সম্ভাব্য কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার সুযোগ তৈরি করেছে, যা বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোকে প্রতিফলিত করবে এবং নতুন সরকারের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারকে অন্তর্ভুক্ত করবে।
“বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে নতুন ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে তা নির্ভর করবে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কর্মসূচিভিত্তিক শক্তিশালী নীতিগত প্রতিশ্রুতির ওপর। এ জন্য আইএমএফের নীতিমালা অনুযায়ী, সংস্থাটির নির্বাহী পর্ষদের অনুমোদন লাগবে।”
ইভো কার্জনার বলেন, আইএমএফের কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ সফরের পরিকল্পনা করছেন। এ সফরে তারা সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং নীতিগত অগ্রাধিকার বিষয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন। পাশাপাশি অর্থনীতির সম্ভাবনা ও সংস্কার-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোও মূল্যায়ন করা হবে।
“সম্ভাব্য নতুন আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচির আকার এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কারের অঙ্গীকারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে নতুন মিশন,” বলেন আইএমএফের বাংলাদেশবিষয়ক মিশনপ্রধান।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, “দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অংশীদার হিসেবে থাকবে আইএমএফ।”
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আর্থিক সংকট সামাল দিতে কয়েক দফা আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি (৪.৭০ বিলিয়ন) ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুনে ঋণের অর্থ ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে নিলে মোট ঋণের আকার ৫৫০ কোটি (৫.৫০ বিলিয়ন) ডলার হয়।
এর মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার হাতে পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। ষষ্ঠ কিস্তি ও অবশিষ্ট অর্থ ছাড়ের সময় ছিল গত বছরের ডিসেম্বর।
তখন আইএমএফ জানায়, ঋণের অবশিষ্ট অর্থ ছাড় করা হবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে।
সেই অর্থ ছাড়ের আগে এখন ঋণের শর্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখতে চায় আইএমএফ। তবে রাজস্ব আদায়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় আইএমএফের কাছ থেকে নতুন করে ২ বিলিয়ন ডলার চাওয়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু আইএমএফের শর্ত মেনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সংস্কারের যেসব উদ্যোগে ছিল, সেখান থেকে সরকার খানিকটা সরে আসে। এ পরিস্থিতিতে চলমান ঋণ চুক্তির বাকি অর্থ ছাড়ে আইএমএফের অনাগ্রহের খবর আসে।
অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের সর্বশেষ বার্ষিক সভায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা করলেও সাফল্য মেলেনি।
তবে গেল ১৮ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, ঋণ কর্মসূচি চালিয়ে নিতে আইএমএফের ‘ইতিবাচক’ মনোভাব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ডিসিতে আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এখনও আলোচনা (অর্থ ছাড়) চলছে। আলোচনার মধ্যে যেগুলো এখনও সমাধান হয়নি, সেসব সমাধান হবে।”
তবে খুব বেশি সাফল্য যে আসেনি, তার ইঙ্গিত মেলে অর্থমন্ত্রীর পরবর্তী সময়ের বক্তব্যে। কঠিন শর্ত মেনে চলমান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া বা নতুন কর্মসূচি নেওয়া–উভয় ক্ষেত্রেই সরকার যে নতুন চাপের শঙ্কা দেখছে, সেই আভাস পাওয়া গিয়েছিল তার কথায়।
গত ১১ মে অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেন, আইএমএফ ঋণ চুক্তির আওতায় যেসব শর্ত জুড়ে দিচ্ছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘উপযুক্ত’ নয়।
তার ভাষ্য ছিল, জনগণের প্রতি ‘দায়বদ্ধতা’ থেকে সরকার আইএমএফের সব কথা মানতে পারবে না।
“বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে বেশিরভাগ উন্নয়ন সহযোগীরা একমত। তারা আমার উন্নয়ন সহযোগী। ওরা যদি আমার সঙ্গে একমত না হয়, আমি তো এগোতে পারব না।
“সব জায়গায় আমরা একমত হচ্ছি না। অনেক জায়গায় দ্বিমত হচ্ছে, আইএমএফ-এর সঙ্গে দ্বিমত হচ্ছে। কারণ আইএমএফ যে শর্ত দিচ্ছে ওটা আমার অর্থনীতির জন্য, জনগণের জন্য সুইটেবল না।”
ওই বক্তব্যের দুই সপ্তাহ পর গত ২৫ মে অর্থ মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ২১ মে আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে নতুন ঋণ-কর্মসূচি শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করলে আইএমএফ কর্মকর্তা সে উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
ওই বৈঠক ও আলোচনার তথ্য দিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারে ‘প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’, সে কথা পুনর্ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী।
তবে তিনি বলেন, আইএমএফের বর্তমান ঋণ কর্মসূচিটি ‘ভিন্ন’ অর্থনৈতিক ও নীতিগত প্রেক্ষাপটে গ্রহণ করা হয়েছিল, পরে ‘উদ্ভূত’ দেশীয় প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং ‘বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার’ কারণে কিছু সংস্কারের শর্ত বাস্তবায়নে ‘চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে’।
মন্ত্রী বলেন, “সরকার সংস্কার থেকে সরে আসতে চায় না; বরং ধাপে ধাপে, দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মতভাবে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে আগ্রহী।”
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নবনির্বাচিত সরকারের অধীনে একটি ‘নতুন আইএমএফ কর্মসূচি’ গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়, যেখানে তিন বছরের একটি ‘বাস্তবভিত্তিক’ সময়সীমার মধ্যে ‘অগ্রাধিকারমূলক’ ও ‘বাস্তবায়নযোগ্য’ সংস্কারগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং ধাপে ধাপে সংষ্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
আইএমএফ এর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্ক বৈঠকে বাংলাদেশের সংস্কার কার্যক্রম এবং নতুন কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগকে স্বাগত জানান বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল।