Published : 25 May 2026, 09:30 PM
বিদেশি মুদ্রার চাপ সামলাতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে যে ঋণ চুক্তি করেছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নতুন ঋণ কর্মসূচি শুরুর আগ্রহ দেখিয়েছে বিএনপি সরকার।
আইএমএফকে সরকার বলেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ‘ভিন্ন অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে’ ওই চুক্তি করেছিল, এখনকার বাংলাদেশের বাস্তবতা সেরকম নয়।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ২১ মে আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে নতুন কর্মসূচি শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করলে আইএমএফ কর্মকর্তা সে উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
ওই বৈঠক ও আলোচনার তথ্য দিয়ে সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারে ‘প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’, সে কথা পুনর্ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী।
তবে তিনি বলেন, আইএমএফের বর্তমান ঋণ কর্মসূচিটি 'ভিন্ন' অর্থনৈতিক ও নীতিগত প্রেক্ষাপটে গ্রহণ করা হয়েছিল, পরে 'উদ্ভূত' দেশীয় প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং 'বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার' কারণে কিছু সংস্কারের শর্ত বাস্তবায়নে 'চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে'।
মন্ত্রী বলেন, "সরকার সংস্কার থেকে সরে আসতে চায় না; বরং ধাপে ধাপে, দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মতভাবে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে আগ্রহী।"
অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নবনির্বাচিত সরকারের অধীনে একটি 'নতুন আইএমএফ কর্মসূচি' গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়, যেখানে তিন বছরের একটি 'বাস্তবভিত্তিক' সময়সীমার মধ্যে 'অগ্রাধিকারমূলক' ও 'বাস্তবায়নযোগ্য' সংস্কারগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং ধাপে ধাপে সংষ্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
আইএমএফ এর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্ক বৈঠকে বাংলাদেশের সংস্কার কার্যক্রম এবং নতুন কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগকে স্বাগত জানান বলে জানানো হয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আর্থিক সংকট সামাল দিতে কয়েক দফা আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুনে ঋণের অর্থ ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে নিলে মোট ঋণের আকার ৫৫০ কোটি ডলার হয়।
এর মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার হাতে পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। ষষ্ঠ কিস্তি ও অবশিষ্ট অর্থ ছাড়ের সময় ছিল গত বছরের ডিসেম্বর।
তখন আইএমএফ জানায়, ঋণের অবশিষ্ঠ অর্থ ছাড় করা হবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে।
সেই অর্থ ছাড়ের আগে এখন ঋণের শর্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখতে চায় আইএমএফ। তবে রাজস্ব আদায়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় আইএমএফের কাছ থেকে নতুন করে দুই বিলিয়ন ডলার চাওয়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু আইএমএফের শর্ত মেনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সংস্কারের যেসব উদ্যোগে ছিল, সেখান থেকে সরকার খানিকটা সরে আসে। এ পরিস্থিতিতে চলমান ঋণ চুক্তির বাকি অর্থ ছাড়ে আইএমএপের অনাগ্রহের খবর আসে।
অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের সর্বশেষ বার্ষিক সভায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা করলেও সাফল্য মেলেনি। তবে গত ১৮ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, ঋণ কর্মসূচি চালিয়ে নিতে আইএমএফের ‘ইতিবাচক’ মনোভাব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ডিসিতে আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এখনও আলোচনা (অর্থ ছাড়) চলছে। আলোচনার মধ্যে যেগুলো এখনও সমাধান হয়নি, সেসব সমাধান হবে।”
তবে খুব বেশি সাফল্য যে আসেনি, তার ইঙ্গিত মেলে অর্থমন্ত্রীর পরবর্তী সময়ের বক্তব্যে। কঠিন শর্ত মেনে চলমান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া বা নতুন কর্মসূচি নেওয়া–উভয় ক্ষেত্রেই সরকার যে নতুন চাপের শঙ্কা দেখছে, সেই আভাস পাওয়া গিয়েছিল তার কথায়।
গত ১১ মে অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেন, আইএমএফ ঋণ চুক্তির আওতায় যেসব শর্ত জুড়ে দিচ্ছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘উপযুক্ত’ নয়। তার ভাষ্য ছিল, জনগণের প্রতি ‘দায়বদ্ধতা’ থেকে সরকার আইএমএফের সব কথা মানতে পারবে না।
“বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে বেশিরভাগ উন্নয়ন সহযোগীরা একমত। তারা আমার উন্নয়ন সহযোগী। ওরা যদি আমার সঙ্গে একমত না হয়, আমি তো এগোতে পারব না।
“সব জায়গায় আমরা একমত হচ্ছি না। অনেক জায়গায় দ্বিমত হচ্ছে, আইএমএফ-এর সঙ্গে দ্বিমত হচ্ছে। কারণ আইএমএফ যে শর্ত দিচ্ছে ওটা আমার অর্থনীতির জন্য, জনগণের জন্য সুইটেবল না।”
এ বক্তব্যের দশদিন পর আইএমএফ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে নতুন কর্মসূচির আওতায় সংস্কারের আগ্রহের কথা জানালেন অর্থমন্ত্রী। আর তাতে এই ধারণা জোরালো হল যে, জ্বালানি সংকটে বাড়তি খরচে সরকার যে চাপে পড়েছে, সেখান থেকে উত্তরণে বিদেশি মুদ্রার যোগান বাড়ানো দরকার।
গত ২১ মে আইএমএফ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেন, ওয়াশিংটনের আলোচনার পর সরকার বিষয়টি নিয়ে 'অভ্যন্তরীণভাবে পর্যালোচনা করেছে'।
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, চলমান আইএমএফ কর্মসূচির অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে ।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নাইজেল ক্লার্ক বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের ‘গঠনমূলক ও ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা’ অব্যাহত রাখার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে উভয় পক্ষই ‘বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য’ একটি নতুন আইএমএফ কর্মসূচি, এবং এ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার বিষয়ে একমত পোষণ করেন।