Published : 26 Feb 2026, 06:37 PM
দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান নীতি সহায়তা দিয়ে বন্ধ কলকারখানা চালুর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন।
ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালক মর্যাদার কর্মকর্তাদের সঙ্গে গভর্নরের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার দুপুরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সংবাদিকদের এ কথা জানান।
আগামীতে কীভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক চলবে এবং কীভাবে অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে, এর একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র গভর্নর বৈঠকে তুলে ধরেন বলেও মুখপাত্র বলেছেন।
বুধবার দিনভর উত্তাপ ছড়ানো ঘটনাবলীর মধ্যে পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমানকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দেয় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার।
বৃহস্পতিবার বেলা ১০টা ৪০ মিনিটে নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসেন নতুন গভর্নর। এরপরই চলে যান গভর্নর কক্ষে।
নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর শেষে সভা করেন কর্মকর্তাদের সঙ্গে।
বৈঠকের পর বেলা ২টার দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান গভর্নরের পক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
নতুন গভর্নর নিযুক্ত হওয়ার পরে প্রথম কর্মদিবসেই সাংবাদিকদের সঙ্গে গভর্নরের মতবিনিময় করার রেওয়াজ আছে। আগের তিন গভর্নরই তা করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবার ছেদ পড়লো।
আরিফ হোসেন খান বলেন, “আমার কথাই গভর্নরের কথা। তার কথাই আমি বলতে এসেছি। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন তার হয়ে কথা বলতে।”
এসময় গভর্নরকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অর্থনীতি গতিশীল করা ও প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
গভর্নর পদে নতুন নিয়োগ পেয়েই বন্ধ কলকারখানা চালু করতে কেন এবং কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, “কারখানা বন্ধ হলে কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনীতিকে সচল করতে হলে তো বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এজন্য কারখানাগুলোকে নীতি সহায়তা দেওয়া হবে।”
তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও কারখানা চালাতে চলতি মূলধন হিসেবে নতুন ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, গভর্নরের এমন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরে আরিফ হোসেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, “ব্যক্তি দোষ করতে পারে-প্রতিষ্ঠান তো চালু করা যেতে পারে।”
গণঅভ্যুত্থানে পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ অনেক ব্যবসায়ী আত্মগোপনে চলে যান। এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম (এস আলম), সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদসহ কেউ কেউ বিদেশে চলে গেছেন।
গ্রেপ্তার হয়েছেন বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট, শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারসহ কেউ কেউ।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি, অর্থপাচার, কর ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন। বিদেশে টাকা পাচার করে সেই অর্থে ব্যবসার মালিকানা এবং ফ্ল্যাট ও বাড়ি কেনায় বিনিয়োগ করার অভিযোগও রয়েছে তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে।
যে কারণে বেক্সিমকো, এস আলমসহ কোনো কোনো শিল্প গ্রুপের কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
এসব শিল্প গ্রুপকে নতুন করে ঋণ দিয়ে তাদের কলকারখানা চালু করার উদ্যোগ কেন নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, এমন প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র বলেন, “অথনীতির স্বার্থে চালু করা হবে। একটি কারখনায় যদি ১০ হাজার লোক কাজ করে, তাদের যদি চাকরি না থাকে তাহলে সমাজে অ্যানার্কি তৈরি হবে।
“অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করবে, বাংলাদেশ ব্যাংক তা তদারকি করবে।”

গভর্নর নতুন কারখানা চালুর উদ্যোগ নেবেন কীভাবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গভর্নর চাচ্ছেন বন্ধ কলকারখানা চালু হোক।”
বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে নীতি সহায়তা দিয়ে খেলাপীদের নিয়মিত হওয়ার সুযোগ দিয়ে আসছে। সবশেষ গত সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে খেলাপী ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দিয়েছে।
আরিফ হোসেন বলেন, কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে নতুন গভর্নর ফের নতুন ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকে বুধবার দিনভর নজিরবিহীন উত্তাপ ছড়ানো ঘটনাবলীর মধ্যে বিকালের দিকে নতুন গভর্নর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন আসে। প্রথমবারের মত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব বর্তায় একজন ব্যবসায়ীর কাঁধে। পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নরের দায়িত্ব দেয় তারেক রহমানের বিএনপি সরকার।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১৪ অগাস্ট অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দেয়। তার নেতৃত্বে শুরু হয় ব্যাংক খাতের সংস্কারের কাজ।
দেড় বছরের মাথায় তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে বুধবার আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সেখানে তার নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করার কথা বলা হয়েছে।
নতুন গভর্নর সংবাদ মাধ্যমে নিতান্তই প্রয়োজন ছাড়া কথা বলবেন না জানিয়ে আরিফ হোসেন বলেন, “গভর্নর মিডিয়ার সঙ্গে নিয়মিত হবেন না। প্রয়োজন হলে কথা বলবেন। বাকি যোগাযোগ মুখপাত্রের মাধ্যমে হবে বলেছেন।”
আগের সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদায়ী গভর্নরের নেওয়া আর্থিক খাতের সংস্কার নীতিগুলো চলমান থাকবে জানিয়ে আরিফ হোসেন বলেন, ‘‘আগের সরকার ও গভর্নর খাদের কিনারা থেকে অর্থনীতিতে টেনে তুলেছেন। এখন সামষ্টিক অর্থনীতি কিছুটা নিম্ন পর্যায়ে থাকলেও তাতে গতি আনতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’’
আগের দিন তিন কর্মকর্তাকে বদলি, পরে প্রত্যাহার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সমাবেশ ও গভর্নরের উপদেষ্টাকে বের করে ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। তাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মর্যাদা ভুলন্ঠিত হয়েছে কি না, কেপিআই প্রতিষ্ঠানে এরকম উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয় কি না, তা জানতে চান সাংবাদিকরা।
গভর্নরের বরাত দিয়ে আরিফ হোসেন খান বলেন, “কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা গভর্নরের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। ভবিষ্যতে এরকম শৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো কোনো পরিবেশ তৈরি হবে না। যারা মব সৃষ্টির চেষ্টা করেছে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।”