Published : 07 Apr 2026, 12:31 AM
সরকার চলতি অর্থবছর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে যে পরিমাণ ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, নয় মাসেই তার চেয়ে বেশি ধার করে ফেলেছে।
এখন বাকি তিন মাসের খরচ মেটাতে ব্যাংকগুলোর কাছে নতুন করে আরো ৫ হাজার কোটি টাকা চাইছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সতর্ক হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন দুজন অর্থনীতিবিদ।
অধ্যাপক ওসমান মাহমুদ বলছেন, ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপ সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলাকে ঝুঁকিতে ফেলবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলমান সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি সরকারের ঋণের চাপে আদৌ সঠিক পথে থাকতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
আর অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, আয়ের পথ না বাড়িয়ে খরচ বাড়িয়ে চললে ‘দুর্দশাই’ বাড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গত বছরের ২ জুন নতুন অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের ফর্দ ধরে বাজেট উপস্থাপন করেন। এর বিপরীতে রাজস্ব খাতে তিনি আয় ধরেন ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা।
তাতে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়ায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা ঋণ করে মেটাতে হবে। সেজন্য বিদেশ থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বাজেটে।
অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু মার্চ পর্যন্ত সময়ে সরকার ১ লাখ ১২ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেলেছে।
গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ ছিল ৫৩ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। অবশিষ্ট ৫৯ হাজার ৩২২ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে গত তিন মাসে। এর মধ্যে শেষ মাসটি ছিল বিএনপি সরকারের মেয়াদে, আগের দুই মাস ক্ষমতায় ছিল অন্তবর্র্তী সরকার।
দেশের অর্থনীতি নানা কারণে আগে থেকেই নাজুক অবস্থায় ছিল। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধ আর জ্বালানি সংকট ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকারকে নতুন করে চাপে ফেলে দিয়েছে।
সেই চাপ সামলাতে আগামী ৮ এপ্রিল আরো ৫ হাজার কোটি টাকার চাহিদা দিয়েছে সরকার। সরকারের এই ঋণ বিশেষ নিলামের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে এই ঋণ সংগ্রহ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন ‘মেজর ইকোনোমিক ইন্ডিকেটরস’ এর হালনাগাদ প্রকাশনায় বলা হয়, রাজস্ব ঘাটতি পূরণ, ঋণের ব্যয় পরিশোধের অঙ্ক বেড়ে যাওয়া ও প্ণ্য আমদানিতে বাড়তি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার খরচ যোগাতে সরকারকে ঋণ নেওয়া বাড়াতে হচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা পিছিয়ে আছে। এই ধারা চললে অর্থবছরের শেষে লক্ষ্য পূরণের ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলোও নিশ্চিত আয় করতে সরকারকে ঋণ দিতে উৎসাহী হয়ে উঠেছে। এতে সরকারের সুদ বাবদ ব্যয় বেড়ে যাবে।
“ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে তো সরকার ঋণ নিচ্ছে। ব্যাংকের কাছ থেকে না নিলে তো টাকা ছাপানো লাগবে। সামনের দিনে চাহিদা বাড়লে সেদিকেই হয়ত সরকারকে যেতে হবে।’’
বেসরকারি খাতে ঋণের যে চাহিদা নেই, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রবণতা থেকে তা বোঝা যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে পরিমাণ ঋণ চাচ্ছে, ব্যাংকগুলো প্রস্তাবে তার চেয়ে বেশি দিতে আগ্রহী। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা পেতে নিলাম তুলেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংকগুলো ১৬ হাজার ৭৭২ কোটি টাকার প্রস্তাব দেয়, যা সরকারের চাহিদার পাঁচগুণ।
৯১ দিন মেয়াদী ট্রেজারি বিলের বিপরীতে এ ঋণ নিয়েছে সরকার, যার কাট-অফ ইল্ড (চূড়ান্ত সুদহার) ৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক 'রিভার্স রেপো'র মাধ্যমে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে নিলেও ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। ঋণের মাধ্যমে সেই তারল্য চলে যাচ্ছে সরকারের কাছে।
মাহমুদ ওসমান ইমাম বলেন, “যুদ্ধের কারণে বেসরকারি খাতে এখন বিনিয়োগ চাহিদা কম। তেল না পেলে কীভাবে ব্যবসা বাড়াবেন তারা? ঋণ নেওয়ার আরেকটি জায়গা হলো রপ্তানি খাত। সেখানেও গত দুই মাস ধরে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। তাই ব্যাংকও সরকারকে ঋণ দিতে চাচ্ছে।’’
কিন্তু ঋণের সুদ পরিশোধে খরচ যত বাড়বে, সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর তা বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে। এখন ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে সরকারি ঋণের সুদহার বাড়াতে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক ইমাম।
তিনি বলেন, “সরকারি সুদ ব্যয় বেড়ে গেলে এবং মানুষ হাতে নগদ টাকা ধরে রাখলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। জ্বালানি তেলের সংকটে পণ্য পরিবহণ কমে যেতে পারে। পণ্য পরিবহন না হলে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী এই সুযোগটি নেবেন। পণ্য আছে, কিন্তু হাতের নাগালে নেই। কারণ, তা আসতে পারছে না।’’
ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরেও প্রচুর নগদ অর্থ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে থাকা অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা।
তার আগে গত ডিসেম্বরে তা ছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। নভেম্বর ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা।
সরকারের আর্থিক নীতির বিষয়ে সতর্ক করে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে রাজস্ব হিসাব-নিকাশ আর কার্যকর নাও থাকতে পারে।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একদিকে আমরা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে খরচ বাড়াচ্ছি। অন্যদিকে জ্বালানি ও সারের ওপর ভর্তুকি বাড়ছে। কিন্তু রাজস্ব বাড়ছে না। অথচ সরকার বলছে তারা ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়। এই তিনটির মধ্যে কীভাবে সামঞ্জস্য বিধান করবেন?”
এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি জনগণকে ভোগাবে কি না, সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, “এর উত্তর নির্ভর করছে সরকার যে ব্যয় করবে, তা কোথা থেকে আসছে ও ভবিষ্যতে তা থেকে কী আয় হবে তার ওপর।
“ব্যয়ের অর্থায়ন যদি ঋণের মাধ্যমেও করা হয়, সেই টাকা তো পরিশোধ করতেই হবে। মূল প্রশ্ন হল, তা ভবিষ্যতে আয় তৈরি করতে পারে কি না।”
আয়ের পথ না বাড়িয়ে খরচ বাড়িয়ে চললে দুর্দশা ডেকে আনা ছাড়া আর কিছু হবে না বলে মন্তব্য করেন জাহিদ হোসেন।
বছরের শেষ দুই মাসে ঋণ চাহিদা বেড়ে যায় সরকারের। কিন্তু এবার এক মাস আগেই বেড়ে যাওয়াটা তাকে উদ্বিগ্ন করছে।
জাহিদ হোসেন বলেন, “এই অবস্থা চলতে থাকলে কেবল বেসরকারি খাত নতুন বিনিয়োগের জন্য সমস্যায় পড়বে না, কার্যকরী মূলধনের জন্যও সমস্যায় পড়তে পারে।”