Published : 15 Oct 2025, 09:09 PM
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (চাকসু) নির্বাচনকে ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরলেও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বলছে, তারা ভোট বর্জন করবে না।
ভোট শেষের ঘণ্টা তিনেক পর বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেন সংগঠনটির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শাখার নেতারা।
তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেছে। অভিযোগ জানানো হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বরং ‘দেখছি’ বলেই দায় এড়িয়ে গেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার আশ্বস্ত করেছিলেন ডাকসু ও জাকসু থেকে শিক্ষা নিয়ে চাকসুর নির্বাচন অনন্য উদাহরণ তৈরি করবে।
“কিন্তু আমরা দেখলাম প্রতিটি পদে পদে অনিয়ম কারচুপি ঘটেছে। কিন্তু আমাদের নির্বাচন কমিশনার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বিকার ছিল।”
ভোটকেন্দ্রে প্রচারণা ও ‘স্লিপ বিতরণ’
নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী ভোটকেন্দ্রের ১০০ গজের মধ্যে প্রার্থী বা সংগঠনের প্রচার চালানোর সুযোগ না থাকার কথা তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী আইয়ুবুর রহমান তৌফিকের অভিযোগ, একাধিক কেন্দ্রে নির্দিষ্ট প্রার্থীরা ভোটের সময়েও প্রচারণা চালিয়েছেন এবং ভোটারদের হাতে ভোটের স্লিপ বিতরণ করেছেন।
“যেখানে নির্বাচন কমিশনের লোকজন উপস্থিত ছিল, তাদের চোখের সামনেই এমন অনিয়ম ঘটেছে। অথচ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।”
একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠে, ভোট দেওয়ার পর ব্যবহৃত কালির দাগ অনেক ভোটারের হাতে মুছে গেছে। ফলে একাধিকবার ভোট দেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
সইবিহীন ব্যালট ও এলইডি স্ক্রিন বন্ধ
বেশ কয়েকটি কেন্দ্র থেকে অভিযোগ আসে যে, ভোট বাক্সে সইবিহীন ব্যালট পেপার পাওয়া গেছে। একাধিক ভোটকর্মী বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, “ভুলবশত কয়েকটি পত্রে সই পড়েনি।”
এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে তৌফিক বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে এমন ‘ভুল’ শুধু অদক্ষতা নয়, ইচ্ছাকৃত অনিয়মও হতে পারে।
এছাড়া ভোট পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিটি ভবনে স্থাপন করা এলইডি ডিসপ্লে স্ক্রিন সারাদিনে একাধিকবার বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, “৪০ থেকে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত স্ক্রিন বন্ধ ছিল–কোনো কারণ জানানো হয়নি।”
নির্বাচন কমিশন পরে জানায়, স্ক্রিনের তার কেটে দেওয়া হয়েছিল, কেউ অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করেছে বলে ধারণা। তৌফিকের প্রশ্ন, “যেখানে পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন ছিল, সেখানে কীভাবে কেউ তার কেটে দিতে পারে?”
সহিংসতা ও ‘বহিরাগতদের উপস্থিতি’
বিকেল নাগাদ নতুন কলা ভবন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদল অভিযোগ করে, তাদের সমর্থকদের ওপর লাঠি ও ইট হাতে বহিরাগতরা হামলা চালানোর চেষ্টা করে।
তৌফিকের অভিযোগ, “আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি, চেনা শিক্ষার্থী নয়–বাইরের লোকজন কেন্দ্রের দিকে দৌড়ে আসছে।”
বিবিএ, সমাজবিজ্ঞান, গণযোগাযোগ ও বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের সামনে একই ধরনের অভিযোগ ওঠে—অচেনা ব্যক্তিরা ভোটারদের ঘিরে ধরে স্লিপ ধরিয়ে দিচ্ছে, প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ছাত্রদলের এই নেতা বলেন, তারা একাধিকবার প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে গিয়ে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দিয়েছেন, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ফলাফল ও ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত
রাত পর্যন্ত ভোট গণনা চললেও ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী তৌফিক বলেন, তারা ফলাফল মেনে নাও নিতে পারেন।
তিনি বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার নিয়ে নির্বাচন করতে এসেছি। কিন্তু যেখানে অনিয়ম, পক্ষপাত আর বহিরাগত হস্তক্ষেপ¬–সেখানে ফলাফল গ্রহণ করা মানে অন্যায়ের বৈধতা দেওয়া।”
”নির্বাচন কমিশন বলেছে, সব অভিযোগ বিবেচনা করা হবে এবং প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত ঘোষণা আসেনি।”
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয়, জিএস প্রার্থী মো. শাফায়াত বক্তব্য রাখেন।
ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় অমোচনীয় কালি না থাকা নিয়ে অভিযোগ করে বলেন, “যখন নির্বাচন কমিশনারকে অভিযোগ করা হয়েছে তিনি তখন দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এবং বলেছেন যে তিনি অমোচনীয় কালি দিতে পারেননি। অথচ আমাদেরকে আজকের আগে তিনি কিছু জানাননি। সেখানে উনার ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়া হয়েছে।”
তিনি ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সার্বক্ষণিক এলইডি স্ক্রিন চালু থাকার আশ্বাস দেওয়া হলেও দিনভর বিভিন্ন কেন্দ্রে বারবার তা বন্ধ হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “এখন বিভিন্ন কেন্দ্রে যখন ভোট গণনা চলছে, বাইরে থেকে এলইডি স্ক্রিন অফ। আজ বিভিন্ন কেন্দ্রে যেখানে ছাত্রদলসহ বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা ঢুকতে পারছিল না কিন্তু ইসলামী ছাত্রশিবির ও ছাত্রী সংস্থার প্রার্থীরা গিয়ে সেখানে প্রচারণা চালিয়েছে।
“আমরা বারবার অভিযোগ জানিয়েছি কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোন ব্যবস্থা নেয়নি। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বিবিএ ফ্যাকাল্টিতে প্রিসাইডিং ও রিটার্নিং অফিসারদের সাথে প্রার্থী ও ভোটারদের বাকবিতণ্ডা হয়।”
নির্বাচন কমিশন নিরাপত্তা দিতে পারেনি অভিযোগ করে তিনি বলেন, নতুন কলা ভবনে বহিরাগতরা লাঠি ও ইট দিয়ে ছাত্রদলের ওপর হামলা করেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনকে কলঙ্কিত অধ্যায়ে পরিণত করেছে। বারবার অভিযোগ দেয়ার পরও তারা কোন পদক্ষেপ নেয়নি। ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের জিএস প্রার্থী শাফায়েত হোসেনের অভিযোগ, বিবিএ অনুষদে ৪০০ এর মত ব্যালট সাক্ষরহীনভাবে বক্সে ঢোকানো হয়েছে। ২৩১ ও ২৩২ নম্বর রুমে ফরহাদ হলের জিএস পদপ্রার্থী নিজে উপস্থিত ছিলেন। স্বতন্ত্র এক প্রার্থীকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আমরা চেয়েছিলাম সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচন এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছেন। এর বাইরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক যাদের আমরা অনেক সম্মান করতাম। তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন। এর বিচার সাধারণ শিক্ষার্থীরা করবেন।”