Published : 15 Oct 2024, 06:09 PM
আপ্রাণ চেষ্টা করেও বাঁচানো গেল না চট্টগ্রামের চুনতি অভয়ারণ্যে ট্রেনের ধাক্কায় আহত হাতিটিকে।
চিকিৎসার মধ্যে থাকা অবস্থায় মঙ্গলবার বিকালে হাতিটি মারা যায় বলে জানিয়েছেন ‘বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ,’ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “হাতিটি দুর্ঘটনা কবলিত হওয়ার পর থেকেই আমাদের নিজস্ব ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছিলেন।
“উন্নত চিকিৎসার জন্য হাতিটি রিলিফ ট্রেনে করে সকালে ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকাল সোয়া ৪টার দিকে হাতিটির মৃত্যু হয়।”
চট্টগ্রামের লোহাগড়ার সংরক্ষিত চুনতি অভয়ারণ্য রেঞ্জ সংলগ্ন ঢাকা-কক্সবাজার রেললাইনে রোববার রাতে ট্রেনের ধাক্কায় আঘাতপ্রাপ্ত হয় আনুমানিক ১০ বছর বয়েসী মাদি হাতিটি।
চুনতি অভয়ারণ্য রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন সোমবার জানিয়েছিলেন, রোববার রাতে ৫/৬টি হাতি দলবেঁধে বিচরণ করছিল। সে সময় কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেনের ধাক্কায় একটি হাতি আহত হয়।
হাতিটির চিকিৎসাসেবায় থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাফারি পার্কের চিকিৎসক হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকার নাইম সোমবার সন্ধ্যায় জানান, ট্রেনের ধাক্কায় আনুমানিক ৮/১০ বছর বয়েসী মাদি হাতিটির মেরুদণ্ড ভেঙ্গেছে, পেছনের ডান পা পুরো ভেঙ্গে হাড় বের হয়ে গেছে। তাছাড়া মাথায় আঘাত লেগে কান ও সুর দিয়ে রক্তপাতও হয়েছে। পেছনের অংশ অবশ হয়ে যাওয়ায় দাঁড়াতে পারছিল না হাতিটি।
প্রাণ-প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে চুনতি অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে ‘উন্নয়নের রেলালাইন’ স্থাপনের বিরোধিতা ছিল শুরু থেকেই। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন যে রেললাইন করা হয়েছে, সেটি গেছে এর মধ্য দিয়ে।
চুনতি অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে যাওয়া এই রেললাইনের পাশ দিয়ে করা হয়েছে হাতি বিচরণ ও পারাপারের পথ, যেখানে রোববার রাতে দলবেঁধে বিচরণ করার সময় ট্রেনের ধাক্কায় ছিটকে যায় একটি হাতি।
এমন দুর্ঘটনার শঙ্কা আগে থেকে করে আসছেন পরিবেশবাদীরা, যা এখন ঘটতে দেখা যাচ্ছে।
চলতির বছরের শুরুর দিকে লোহাগাড়ায় চুনতি বণ্যপ্রাণী অভয়রণ্যের পরিস্থিতি নিয়ে সভা হয়, যেখানে পরিবেশগত বিপর্যয় দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পরিবেশবাদী ও আলোচকরা।
২৬ জানুয়ারি ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা- ধরা’ এবং ‘অরণ্য’ যৌথভাবে 'চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বর্তমান অবস্থা ও করণীয়' শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে।
সেখানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ধরার উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি সুলতানা কামাল বলেছিলেন, “আজকে চুনতি বন্যপ্রানী অভয়ারণ্য রক্ষার লক্ষ্যে ‘চুনতি রক্ষায় আমরা’ কর্মসূচির আওতায় চুনতি ভ্রমণে এসে উন্নয়নের নামে এবং ভূমিদস্যু বিশেষত পাহাড় এবং নদী দখলকারীদের কবলে পড়ে এই চুনতির পরিবেশের ওপর যে ভয়াবহ হামলার চিত্র দেখলাম তাতে শিউরে উঠতে হয়।
“প্রকৃতি এবং বন্যপ্রানীর জীবন প্রবাহকে এমন ক্ষতবিক্ষত করার দৃষ্টান্ত এই নৈতিক অবক্ষয়ের দিনেও বিরল। আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করলে হয়ত আমাদের এই অতি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করতে পারব- এখনও সময় আছে।”
ব্রতী-এর প্রধান নির্বাহী এবং বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেছিলেন, “এখানে এসে পরিবেশ ধ্বংসের উন্মাদনা দেখলাম। চুনতি বনাঞ্চল দেখলাম, যেখানে একদিন সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণীর অভয়ারন্য ছিল, আজ সেখানে ধ্বংসের মহাকর্মযজ্ঞ। বনের ভেতর রেললাইন, বসতি, ব্যবসা আর হাজার হাজার মা গাছের মৃত্যু দেখলাম; শত শত পাহাড় কর্তন দেখলাম।
“টিকে থাকা পাহাড়ে অবৈধ দখলদার দেখলাম। মৃতপ্রায় ছড়া ও ছড়ি দেখলাম। এ যেন অন্যরকমের এক মহামারি। এ যেন মাতৃভূমিতে অন্য এক মরন আঘাত।”
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ বিষয়ে শারমীন মুরশিদ সেদিন বলেছিলেন, “প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে এ কেমন উন্নতি? সরকারের এমন আত্মঘাতী উন্নয়ন থেকে সরে আসতে হবে। দুর্নীতি-দুষ্কৃতি দমন করতে হবে। চুনতিবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এই ধ্বংস রুখে দিতে হবে।”
পুরানো খবর:
চুনতি অভয়ারণ্যে রেললাইন: ট্রেনের ধাক্কায় মেরুদণ্ড ভেঙেছে হাতিটির