Published : 13 Jul 2026, 12:59 AM
টানা বৃষ্টিতে আবারও তলিয়েছে রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক। তীব্র জলাবদ্ধতায় সকাল থেকে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে নগরীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ে পানি। রাস্তায় জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলমান অর্ধবার্ষিক ও অন্যান্য পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পরীক্ষা বন্ধ করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
এর আগেও সামান্য বৃষ্টিতে রাজধানীর রাস্তাঘাট তলিয়ে যেত। এ নিয়ে তুমুল সমালোচনার মধ্যে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কিছু কাজও করেছে দুই সিটি করপোরেশন। কিন্তু শনিবার গভীর রাত থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টিতে আবারও নগরীর অনেক জায়গা ডুবে যাওয়ায় পরিস্থিতির কতটুকু উন্নতি হয়েছে তা নিয়ে আছে প্রশ্ন।
একইভাবে প্রশ্ন উঠেছে, শনিবার রাতের মত ভারি বৃষ্টির পানি নিকাশে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা বর্তমানে কতটুকু প্রস্তুত?
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান প্রকৌশলী বলছেন, জলাবদ্ধতার নানা কারণ আছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান কঠিন।
অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বলছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে।
বৃষ্টির মধ্যে রোববার সকালে দেখা গেছে, বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত যাত্রাবাড়ী, কুতুবখালী, শনির আখড়া এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে ডুবে ছিল। একই সময়ে দৈনিক বাংলা মোড় থেকে ফকিরাপুল পর্যন্ত সড়কে পানি জমে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়ে। পুরানা পল্টন কালভার্ট সড়কে হাঁটুপানি জমে আশপাশের ছোট দোকানগুলোতেও পানি ঢুকে যায়।
মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে টিকাটুলি মোড়, আরামবাগ, ফকিরাপুল, শান্তিনগর, রাজারবাগ, নয়াপল্টন ও কাকরাইলের বিভিন্ন সড়ক এবং অলিগলিতেও ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা যায়। দিলকুশা ও মতিঝিলের বাণিজ্যিক এলাকায় সৃষ্ট তীব্র যানজটে অফিসগামীদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। এমনকি প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় চত্বরেও পানি জমতে দেখা গেছে।
খিলক্ষেত থেকে লেকসিটি পর্যন্ত সড়ক, মহাখালীর দক্ষিণপাড়ার প্রধান সড়ক এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাকলী র্যাম্পের নিচের অংশও পানিতে তলিয়ে ছিল। বনানী, খিলক্ষেত, ঢাকা গেইটসহ রাজধানীর বিভিন্ন নিচু এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। নয়াপল্টনের সড়কের বিভিন্ন স্থানে কোমরসমান পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে। সরকারি গবেষণা সংস্থা আইডব্লিউএমের সহায়তায় ইতোমধ্যে এই কাজ শুরু হয়েছে।”
২০২০ সাল থেকে ঢাকার জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের হাতে এলেও দীর্ঘদিন এ খাতে কার্যকর কোনো কাজ হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, “বর্তমানে ডিএসসিসির দুটি পাম্প স্টেশন চালু রয়েছে এবং ড্রেনগুলো পরিষ্কার করার কাজ চলছে।”

আবহাওয়া অধিদ্প্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ১৩৫ মিলিমিটার; যার হিসাব অনুযায়ী সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র ৩ ঘণ্টাতেই রাজধানীতে ৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির এই প্রকৌশলী বলেন, “সাধারণভাবে ৩০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হলে বিদ্যমান ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক দিয়ে পানি দ্রুত নেমে যায়। তবে এর চেয়ে বেশি বৃষ্টি হলে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পানি আটকে থাকতে পারে। শহরের নিচু এলাকাগুলোতেও পানি জমে থাকার আশঙ্কা থাকে।
“সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এ সমস্যার সমাধানে কাজ করছে। তবে স্থায়ী সমাধানে সময় লাগবে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দও দরকার।”
তবে কবে নাগাদ মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার কথা বলতে পারেননি তিনি।
একই প্রশ্নে ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, “বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় দুই-তিনটি খাল নিয়ে একটি প্রকল্পের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। তবে সেটি এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।”
সাম্প্রতিক ভারি বৃষ্টিতে ঢাকার সব জায়গায় নয়, কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল এবং অধিকাংশ স্থান থেকেই পানি নেমে গেছে দাবি করেন তিনি।
তবে মিরপুরসহ কয়েকটি এলাকায় পানি দীর্ঘ সময় ধরে ছিল স্বীকার করে এর কারণ হিসেবে তিনি খাল দখল, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক ভরাট হয়ে যাওয়া এবং পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হওয়ার বিষয়টিকে দায়ি করেন।
তিনি বলেন, “আবাসিক এলাকার পরিকল্পনা, রাস্তা, ভবনের উচ্চতা ও ড্রেনেজের নকশা মূলত রাজউক নির্ধারণ করে। তবে বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে বাস্তবে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যেমন নিকুঞ্জ এলাকায় রাজউকের একটি প্রকল্পের কারণে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে, ফলে ওই এলাকার পানি সহজে নামতে পারছে না। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে চলমান নির্মাণকাজ এবং ড্রেন ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ড্রেন দিয়ে পানি বের হওয়ার পরিবর্তে উল্টো ‘ব্যাকফ্লো’ হয়ে পানি ওপরে উঠে আসছে।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান কঠিন বলেও মত তার।
সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা আছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, “সমন্বয়হীনতা অবশ্যই আছে, খুব ভালভাবেই আছে। ওয়াসার সব দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের কাছে আসেনি। অনেক ক্ষেত্রে ওয়াসার স্যুয়ারেজ লাইন ও সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ লাইন পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকলেও এগুলোর ব্যবস্থাপনা সমন্বিত নয়। তার ওপর ওয়াসা, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও অন্যান্য সংস্থার প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে একই রাস্তা একাধিকবার কাটতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম অবশ্য জলাবদ্ধতা সমস্যায় বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে ‘সমন্বয়হীনতা’ বলা পুরোপুরি সঠিক হবে না বলে মনে করেন।
তিনি বলেন, “সরকারের কার্যবিধি অনুযায়ী বর্তমানে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার আইনগত দায়িত্ব ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। আগে এ দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার ছিল। ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী রাজউক, ওয়াসা ও অন্যান্য সংস্থা সহযোগিতা করতে পারে।
“প্রাকৃতিক খালগুলোর মালিকানাও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিভক্ত। কিছু সিটি করপোরেশনের, কিছু জেলা প্রশাসনের এবং কিছু রাজউকের আওতায় রয়েছে। তবে গুলশান, বনানী, বারিধারা, হাতিরঝিল ও উত্তরা লেকের মত বড় জলাধারগুলো রাজউকই তৈরি করেছে।”

ঢাকায় নগরায়ণের মাত্রা এত বেড়েছে যে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ না থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “অধিকাংশ পানি সরাসরি সড়ক সংলগ্ন ড্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে নির্মাণকাজের পদ্ধতি। অনেক নির্মাণকাজে সড়কের ওপরই ইট, বালি ও সিমেন্ট মিশ্রণ করা হয়। বৃষ্টির সময় এসব উপকরণ ড্রেনে চলে গিয়ে ড্রেনের গভীরতা ও পানি বহনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বেশি বৃষ্টি হলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা চাপ সামলাতে পারে না।
“সাধারণত পাঁচ-ছয় ঘণ্টা সময় পেলে ঢাকার জলাবদ্ধতা ধীরে ধীরে নেমে যায়। কিন্তু ওই তিন থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে জমে থাকা পানি সামাল দেওয়ার ব্যবস্থাটাই আমাদের করতে হবে। এ কারণে ড্যাপে (ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান) স্থানীয় পর্যায়ে রিটেনশন পন্ড বা পানি ধারণের জলাধার তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
“সিএস, আরএস ও মহানগর জরিপে চিহ্নিত পুকুরগুলো ব্যক্তি মালিকানায় থাকলেও প্রয়োজন হলে তা অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণ করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে পানি ধারণের ব্যবস্থা থাকলে বৃষ্টির পানি একসঙ্গে ড্রেনে না গিয়ে ধীরে ধীরে নিষ্কাশিত হবে, ফলে জলাবদ্ধতা কমবে।”
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মনে করেন, ঢাকার জন্য এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা। তার মতে, পরিকল্পনার কোনো অভাব নেই; সমস্যা বাস্তবায়নে। নতুন পরিকল্পনা করার চেয়ে কোন সংস্থা কোন কাজ করবে, সেটি নির্ধারণ করাই বেশি জরুরি।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শুধু ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান করলেই হবে না; শহরের ভৌত পরিকল্পনা, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ এবং জলাধার, খাল, রিটেনশন এলাকা ও সবুজ অঞ্চল সংরক্ষণের পরিকল্পনার সঙ্গে এর সমন্বয় থাকতে হবে। প্রতিটি ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ অনাবৃত জায়গা রেখে বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ধরনের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কার্যকর না হলে শুধু ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।”