Published : 14 Oct 2024, 09:32 PM
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার সংরক্ষিত চুনতি অভয়ারণ্যে ট্রেনের ধাক্কায় আট-দশ বছর বয়সি একটি মাদি হাতি আহত হয়েছে, তার মেরুদণ্ড ও পা ভেঙে গেছে; দেহজুড়ে জখম হয়েছে।
চুনতি অভয়ারন্য রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রোববার রাতে পাঁচ-ছয়টি হাতি দলবেঁধে বিচরণ করছিল। এ সময় কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেনের ধাক্কায় একটি হাতি আহত হয়েছে। হাতিটি মাথা, মেরুদণ্ড ও পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছে।
প্রাণ-প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে চুনতি অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে ‘উন্নয়নের রেলালাইন’ স্থাপনের বিরোধিতা ছিল শুরু থেকেই। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন যে রেললাইন করা হয়েছে, সেটি গেছে এর মধ্য দিয়ে।

চুনতি অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে যাওয়া এই রেললাইনের পাশ দিয়ে করা হয়েছে হাতি বিচরণ ও পারাপারের পথ, যেখানে রোববার রাতে দলবেঁধে বিচরণ করার সময় ট্রেনের ধাক্কায় ছিটকে যায় একটি হাতি।
হাতিটির চিকিৎসা দিচ্ছেন ডুলহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাফারি পার্কের চিকিৎসক হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকার নাইম।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আনুমানিক ৮-১০ বছর বয়সি মাদি হাতিটির মেরুদণ্ডের পেছনের অংশ ভেঙে গেছে, পেছনের ডান পা পুরো ভেঙে হাড় চামড়া ছিড়ে বের হয়ে গেছে।
“মাথায় আঘাত পাওয়ার প্রভাবে কান ও সুর দিয়ে রক্ত বের হয়ে গেছে। পেছনের অংশ অবশ হয়ে যাওয়ায় উঠে দাঁড়াতে পারছে না।”
হাতিটির অবস্থা গুরুতর বলে জানান চিকিৎসক নাইম।
এমন দুর্ঘটনার শঙ্কা আগে থেকে করে আসছেন পরিবেশবাদীরা, যা এখন ঘটতে দেখা যাচ্ছে।
চলতির বছরের শুরুর দিকে লোহাগাড়ায় চুনতি বণ্যপ্রাণী অভয়রণ্যের পরিস্থিতি নিয়ে সভা হয়, যেখানে পরিবেশগত বিপর্যয় দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পরিবেশবাদী ও আলোচলকরা।
২৬ জানুয়ারি ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা- ধরা’ এবং ‘অরণ্য’ যৌথভাবে 'চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বর্তমান অবস্থা ও করণীয়' শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে।
সেখানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ধরার উপদেষ্টা মন্ডলীর সভাপতি সুলতানা কামাল বলেছিলেন, “আজকে চুনতি বন্যপ্রানী অভয়ারণ্য রক্ষার লক্ষ্যে ‘চুনতি রক্ষায় আমরা’ কর্মসূচির আওতায় চুনতি ভ্রমণে এসে উন্নয়নের নামে এবং ভূমিদস্যু বিশেষত পাহাড় এবং নদী দখলকারীদের কবলে পড়ে এই চুনতির পরিবেশের ওপর যে ভয়াবহ হামলার চিত্র দেখলাম তাতে শিউরে উঠতে হয়।
“প্রকৃতি এবং বন্যপ্রানীর জীবন প্রবাহকে এমন ক্ষতবিক্ষত করার দৃষ্টান্ত এই নৈতিক অবক্ষয়ের দিনেও বিরল। আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করলে হয়ত আমাদের এই অতি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করতে পারব- এখনও সময় আছে।”
ব্রতী-এর প্রধান নির্বাহী এবং বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমীন মুরশিদ বলেছিলেন, “এখানে এসে পরিবেশ ধ্বংসের উন্মাদনা দেখলাম। চুনতি বনাঞ্চল দেখলাম, যেখানে একদিন সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণীর অভয়ারন্য ছিল, আজ সেখানে ধ্বংসের মহাকর্মযজ্ঞ। বনের ভেতর রেললাইন, বসতি, ব্যবসা আর হাজার হাজার মা গাছের মৃত্যু দেখলাম; শত শত পাহাড় কর্তন দেখলাম।
“টিকে থাকা পাহাড়ে অবৈধ দখলদার দেখলাম। মৃতপ্রায় ছড়া ও ছড়ি দেখলাম। এ যেন অন্যরকমের এক মহামারি। এ যেন মাতৃভূমিতে অন্য এক মরন আঘাত।”
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ বিষয়ে শারমীন মুরশিদ সেদিন বলেছিলেন, “প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে এ কেমন উন্নতি? সরকারের এমন আত্মঘাতী উন্নয়ন থেকে সরে আসতে হবে। দুর্নীতি-দুষ্কৃতি দমন করতে হবে। চুনতিবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এই ধ্বংস রুখে দিতে হবে।”