Published : 27 Feb 2026, 11:24 AM
সচরাচর দেখা মেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন বনে। অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে কর্ণফুলী নদীর তীরে এক পরিত্যক্ত ইটভাটার পাশেও দেখা মিলল গাছটির।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কোদালা ইউনিয়নে ছোট ছোট পাহাড়ি টিলায় কোদালা চা বাগান। চা বাগান ঘেঁষে চলে গেছে পাকা সড়ক। আর সড়কের বিপরীত পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কর্ণফুলী নদী।
প্রায় ১৩০ বছরের পুরনো চা বাগানটি দেখতে মাঘ মাসের এক বিকালে সড়ক পথে কোদালা পৌঁছাই। বাগানের শেষপ্রান্তের ফটকটি বন্ধ আর আশেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে পাশের মূল সড়ক ধরে এগিয়ে যাই নদীর তীরে যাব বলে।
টিন দিয়ে ঘেরা এক টুকরো পতিত জমির পরই কর্ণফুলী নদী দেখা যায় সড়ক থেকে। টিনের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই দেখি ওই জমিতে একটি পরিত্যক্ত ইটের ভাটা।
সেখানে দলে দলে ঘুঘু চড়ছে। দেশি তিলা ঘুঘু। মানুষের সাড়া পেতেই উড়ে যায় ঘুঘুর দল। পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই কর্ণফুলীর তীরে।
নদীর ওপারে দূরে কাপ্তাইয়ের পাহাড় শ্রেণি দিগন্তে এঁকে দিয়েছে ঘন সবুজ ঢেউ। উজান থেকে পাহাড়ি পথ বেয়ে নেমে এসেছে প্রশস্ত কর্ণফুলী। আপাত শান্ত দেখালেও ভাঙা পাড় জানান দেয় খরস্রোতা নামের সার্থকতা।
কর্ণফুলীর তীর ঘেঁষে বাঁশ আর টিনের চালার দুটি কুড়ে ঘর। ঘরের অবস্থা দেখে মনে হয় কিছুদিন আগেও হয়ত ইটভাটার শ্রমিকরা সেখানে থাকত। খুব বেশি নড়বড়ে নয়।
হঠাৎ হালকা একটা ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে। আশপাশে খুঁজতেই দেখি গাছের ছায়ায় ছয়টি বৃতিতে ঘেরা কাপের মতো অদ্ভূত দর্শন এক ফল নিচে পড়ে আছে। গন্ধটা আসছে সেই গাছ থেকেই।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি কুড়ে ঘর দুটির উপর ছায়া দিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে অনেক উঁচু তিনটি বান্দরফুলা বা বান্দরহুলা গাছ।

গাছের দিকে তাকাতেই নজর কাড়ে নিচের দিকে ঝুলে থাকা ডালের দুপাশে ছড়ানো বড় পাতা, আর সাদা রঙের বড় আকারের ফুল। কলিও ভিন্ন রকমের। ডালের অগ্রভাগে থোকায় থোকায় কুঁড়ি আর ফুল ফুটে আছে।
পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা গাছ তিনটি এতটাই উঁচু যে পুরো গাছের ছবি তুলতে প্রায় ৫০ ফুট পিছিয়ে যেতে হয়।
বান্দরফুলা বা বান্দরহুলা গাছের বৈজ্ঞানিক নাম দুয়াবাঙা গ্র্যান্ডিফ্লোরা (Duabanga grandiflora)। এটি লাইথ্রেসি (Lythraceae ) পরিবারের সদস্য।
নামকরণের ইতিহাস অনুসারে, ১৭৯৯ সালে প্রথম ত্রিপুরায় এই গাছের সন্ধান পান স্কটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হেমিল্টন। ত্রিপুরার বাসিন্দাদের কাছে এই গাছ আগে থেকেই দুয়াবাঙা নামে পরিচিত ছিল। আর গ্র্যান্ডিফ্লোরা অর্থ বড় ফুল।
হিমালয় অঞ্চলের নদীর তীরে, নেপালে, ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে, দক্ষিণ চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, লাওস, কম্বোডিয়া এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে দুয়াবাঙা গ্র্যান্ডিফ্লোরার দেখা মেলে।
অঞ্চল ভেদে আছে নামের ভিন্নতাও। বাংলায় বান্দরফুলার আরেক নাম রামডালু। আসামে পরিচিত থোরা ও খুকান নামে। আবার ত্রিপুরায় এর নাম দুয়াবাঙা। নেপালে পরিচিতি লামপাতি ও পানি সাজ হিসেবে। আর মিজোরামে একই গাছের নাম জুয়াং।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক রাসেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গবেষণার কাজে ওষুধি গুণসম্পন্ন এই গাছটিসহ আরো কিছু গাছের নমুনা সংগ্রহ করতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন বনে গিয়েছিলাম। বান্দরবান জেলার রুমা থেকে দুয়াবাঙার নমুনা সংগ্রহ করি। লামা, আলীকদম ও থানচিতে এবং রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়িতে এই গাছের দেখা পেয়েছি।
“পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো বেশ ভালো সংখ্যায় দুয়াবাঙা গ্র্যান্ডিফ্লোরার দেখা মিললেও সমতলে এই গাছের দেখা পাওয়া বিরল ঘটনা। কর্ণফুলী নদীর তীরে কোদালা এলাকাটি পাহাড়ি। বইপত্রে আছে, পাহাড়ি নদীর তীরে এই উদ্ভিদ হয়। এটি মূলত দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় উদ্ভিদ।”
অধ্যাপক ওমর ফারুক রাসেল বলেন, “এই গাছের নাম নিয়ে এক ধরণের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। ছোটবেলা থেকে আমরা বান্দরহোলা নামে এক ধরনের লতানো উদ্ভিদকে চিনতাম। যেটির ফলের গায়ে রোয়া থাকত; যা মানুষের গায়ে লাগলে অসম্ভব চুলকানি হয়।
“কিন্তু এই উদ্ভিদও বান্দরফুলা বা বান্দরহুলা নামে পরিচিত। কথিত আছে, বানর এই গাছের ডালে দুলতে পছন্দ করত বলে এ ধরনের নামকরণ করা হয়েছে। ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ও নেপালে এটি ভিন্ন ভিন্ন স্থানীয় নামে পরিচিত।”

বান্দরফুলা বড় আকারের চিরসবুজ বৃক্ষ। ফ্লাওয়ারস অব ইন্ডিয়া ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, এই গাছ ৪০ থেকে ৮০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। গাছের উপরের দিকের ডালগুলো ছড়ানো তবে নিচের লম্বা, সরু ও কম শাখাযুক্ত ডালগুলো মাটির দিকে ঝুলে থাকে।
পাতা ডালের শাখার দু’পাশে একটি করে সজ্জিত থাকে। কচি অবস্থায় লালচে আর বড় হলে সবুজ। পাতা প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়।
ফুল বেশ বড়; ৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার চওড়া। সাদা রঙের ফুলের মাঝের অংশে হলদেটে। পাপড়ির সংখ্যা ছয়টি। প্রতিটি পুষ্পমঞ্জরিতে ৩ থেকে ২০টি পর্যন্ত ফুল থাকে। পুংকেশর অনেক। লম্বা পুংকেশর কুড়ির ভিতর বাঁকানো থাকে। ফুল ফুটলে পুংকেশর নিচের দিকে ঝুলে থাকে।
ফুলের পাপড়ি দ্রুত ঝরে যায়। ফল অর্ধ গোলাকৃতির ক্যাপসুল। ফলে সর্বোচ্চ আটটি প্রকোষ্ঠ থাকে। পরিপক্ব হলে ফল ফেটে যায়। বীজ থেকে চারা হয়।
ওষুধি গুণসম্পন্ন একটি উদ্ভিদ বান্দরফুলা। এর পাতা ও ফলের রস শ্বেত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। এছাড়া প্রদাহ নিরাময়ের কাজ করে।
অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, “দুয়াবাঙা গ্র্যান্ডিফ্লোরার পাতা শুকিয়ে চীনে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানকার ল্যাবরেটরিতে এর ওষুধি গুণ পরীক্ষা করা হয় গবেষণার অংশ হিসেবে। সেখানে ব্রেইন ক্যান্সার সেল লাইন ও গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সার সেল লাইনের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।”
আকৃতি, ফুল ও ফলের গঠন ভিন্নতার কারণে অনন্য বান্দরফুলা গাছের ক্যান্সার নিরাময়ে কার্যকারিতার বিষয়ে আরো গবেষণা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করেন এই উদ্ভিদবিদ।
ফিরে আসার সময় দূর থেকে নজরে পড়ে পাহাড়ের প্রচ্ছদপটে নদী পাড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বান্দরফুলা গাছ তিনটির দিকে। হয়ত আদিভূমি দূরের কোনো পাহাড় থেকে নদীর জলে বয়ে আসা বীজ ঠাঁই খুঁজে পেয়েছিল এখানকার মাটিতে।