Published : 13 Apr 2026, 03:59 PM
অবশেষে চট্টগ্রামের ডিসি হিলে ফিরছে বর্ষবরণের আয়োজন; ডিসি হিল ও সিআরবির শিরীষতলা দুই জায়গাতেই বর্ষবরণের আয়োজনে সম্পৃক্ত হয়েছে প্রশাসন ও বিএনপিপন্থিরা।
ডিসি হিলে বর্ষবরণের আয়োজন নিয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে ‘সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম’ এর ভিন্নমত থাকায় ৪৭ বছর ধরে বর্ষবরণের আয়োজনকারী সংস্থাটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এবারের আয়োজন করার ঘোষণা দিয়েছিল।
কিন্তু শহীদ মিনারে অনুষ্ঠান আয়োজনে পুলিশের অনুমতি না মেলায় এবং কয়েক দফার আলোচনা শেষে ডিসি হিলের আয়োজনে ‘সহযোগীর’ ভূমিকায় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ। সেখানে আয়োজক হিসেবে থাকছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।
অন্যদিকে সিআরবি শিরীষতলায় প্রতি বছর বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘নববর্ষ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম’।
এবার সিআরবিতে অনুষ্ঠানের আয়োজন হচ্ছে ‘সম্মিলিত নববর্ষ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম’ এর ব্যানারে। আর এখানকার আয়োজনে ‘সার্বিক ব্যবস্থাপনায়’ নতুন করে সম্পৃক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব। শিরীষতলার মাঠটি বাংলাদেশ রেলওয়ের।

শোভাযাত্রা, আলপনা, বরণের আয়োজনে জেলা প্রশাসন
চট্টগ্রাম নগরীতে পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রাটি প্রতি বছর করতেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। এবার তাদের শোভাযাত্রা হবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
নগরীতে মঙ্গলবার সকাল ৮টায় জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ শুরু হবে সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণ থেকে। নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ডিসি হিলে গিয়ে শেষ হবে শোভযাত্রা। পরে সেখানে বর্ষবরণের দিনব্যাপী আয়োজন শুরু হবে।
শোভযাত্রার জন্য গত কয়েকদিন ধরে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে শিক্ষার্থীরা শতাধিক মুখোশ, শতাধিক শোলার তৈরি মোটিফ এবং দুইশত সরাচিত্র এঁকেছেন।

চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার সৈয়দ আয়াজ মাবুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শোভযাত্রায় অংশ নেবে বিনয় বাঁশী শিল্পী গোষ্ঠীর ঢোলবাদক দল। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আসা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন থিমে সেজে আসবেন।
“সঙ্গে থাকবেন কৃষক, জেলে, চা বাগানের কর্মী, খাল খনন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শ্রমিকরা। এবার ১০ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে চট্টগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করার পরিকল্পনা হয়েছে।”
এর আগে সোমবার রাতে নগরীর সার্কিট হাউজ থেকে ডিসি হিল পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কে আলপনা আঁকা হয়েছে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে। বৈশাখে নগরীতে এত দীর্ঘ আলপনা এবারই প্রথম বলে জানান সৈয়দ আয়াজ মাবুদ।
শোভাযাত্রা শেষে ডিসি হিলে বর্ষবরণের আয়োজন শুরু হবে সকাল ৯টার পর। চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।

১৯৭৮ সাল থেকে ডিসি হিলে বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম’। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পহেলা বৈশাখের আগের রাতে হামলা চালিয়ে মঞ্চ ভাঙচুরের পর সেই অনুষ্ঠান আর হয়নি।
এবার পরিষদের পক্ষ থেকে পহেলা বৈশাখ আয়োজনের বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়। এরপর ২৮ মার্চ প্রস্তুতি সভায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ডিসি হিলে জেলা প্রশাসন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান আয়োজন করবে।
এছাড়া বিএনপিপন্থি সাংস্কৃতিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) এই আয়োজনে সম্পৃক্ত হতে চাওয়ায় বৈশাখের আয়োজনে অতীতে অংশ নেওয়া কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সরে যাওয়ার কথা বলে।
এরপর ২ এপ্রিল নিজেরা পৃথক প্রস্তুতি সভা করে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদের পক্ষে ডিসি হিলের পরিবর্তে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করার কথা জানানো হয়।
পরিষদের সদস্য সচিব মোহাম্মদ আলী টিটো বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শহীদ মিনারে আয়োজনের জন্য আমরা মেয়র মহোদয় থেকে অনুমতি নিলেও পুলিশ আমাদের অনুমতি দেয়নি। পরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের অনুরোধ করা হয় ডিসি হিলে এবারের বর্ষবরণে অংশ নিতে।
“আলোচনা শেষে আমরা পরিষদের পক্ষ থেকে ডিসি হিলে এবং শিল্পকলা একাডেমিতে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
পরিষদের সমন্বয়ক সুচরিত দাশ খোকন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবার আয়োজন করছে জেলা প্রশাসন। আমরা সহযোগিতা করছি। শহীদ মিনারে ‘নিরাপত্তার ঘাটতির’ কথা বলে পুলিশ আমাদের অনুমতি দেয়নি।
“পরে জাসাসও আলোচনায় বসতে চেয়েছে। তাদের সাথে আলোচনা শেষে আমরা ডিসি হিলের আয়োজনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছি।”
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ডিসি হিলের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে প্রায় অর্ধ শত সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নেবে। এছাড়া বিকেলে চিশতি বাউল সংগীত পরিবেশন করবেন।

বৈশাখের শোভাযাত্রা, আলপনা ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজনে জেলা প্রশাসনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাকে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
এ বিষয়ে জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার সৈয়দ আয়াজ মাবুদ বলেন, “আয়োজন নিয়ে কয়েকটি পক্ষ এক হতে পারেনি শুরুতে। যেহেতু ডিসি হিলে বর্ষবরণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের অংশ, তাই সেটা কারো বাধায় বা অনাগ্রহে বন্ধ হয়ে যাক, সেটা আমরা চাইনি। সে কারণে জেলা প্রশাসক মহোদয় উদ্যোগী হয়ে সবাইকে নিয়েই আয়োজন করছেন।”
অন্যদিকে জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে সোমবার বিকেল ৩টায় চৈত্র সংক্রান্তির অনুষ্ঠান শুরু হবে। আর মঙ্গলবার সকাল ৯টায় একাডেমির মুক্ত মঞ্চে শুরু হবে বর্ষবরণের আয়োজন। চলবে সারাদিন।
শিরীষতলার ব্যবস্থাপনায় রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব
সিআরবিতে প্রতি বছর বর্ষবিদায় ও বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘নববর্ষ উদযাপন পরিষদ,চট্টগ্রাম’। এবার সেখানে বিএনপিপন্থি ‘চট্টগ্রাম নববর্ষ উদযাপন মঞ্চ’ সম্পৃক্ত হবার পর আয়োজন হচ্ছে ‘সম্মিলিত নববর্ষ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম’ এর ব্যানারে।
আর এখানকার আয়োজনে ‘সার্বিক ব্যবস্থাপনায়’ নতুন করে সম্পৃক্ত হয়েছে রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব, চট্টগ্রাম।

এখানে সোমবার বিকেল ৩টায় বর্ষবিদায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।
মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে শিরীষতলায় শুরু হবে বর্ষবরণের আয়োজন। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে অংশ নেবে ৬২টি সংগঠন।
সম্মিলিত নববর্ষ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম এর সাধারণ সম্পাদক ফারুক তাহের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ ১৪৩৩ এর অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় থাকছে রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব চট্টগ্রাম। আজ ও আগামীকালের অনুষ্ঠানে রেলওয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।”
এই পরিষদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সংগঠক জানান, মূলত বিএনপিপন্থি কিছু সংগঠক ও পেশাজীবী এই আয়োজন করতে চেয়েছিল। তখন রেলওয়ের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষের অংশগ্রহণে আয়োজন করা হচ্ছে। তাই রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়েছে।
বর্ষবরণের জন্য নতুন নামে গঠিত এ পরিষদের সদস্য সচিব হলেন সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা নিয়াজ মোহাম্মদ খান।

আরো যত আয়োজন
জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ চট্টগ্রাম বাংল বর্ষ বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করতে দুই দিনের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে।
পরিষদের আয়োজনে সোমবার রাত ৮টায় নগরীর নন্দনকানন বৌদ্ধ মন্দির সড়কে শত শিল্পীর অংশগ্রহণে ‘আলপনার রঙে নববর্ষ আবাহন’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন শিল্পী অধ্যাপক কে এম এ কাইয়ুম, অধ্যাপক সৌমেন দাশ, অধ্যাপক ড. দ্বৈপায়ন সিকদার ও অধ্যাপক জাহেদ আলী চৌধুরী।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে বেহালা বাদনের মধ্য দিয়ে পরিষদের বর্ষবরণ আয়োজন শুরু হবে। এছাড়া ‘নব নব পল্লবরাজি সব বন উপবনে, ওঠে বিকশিয়া দক্ষিণ পবনে সংগীত ওঠে বাজি’ শিরোনামে আলেখ্য পরিবেশত হবে সকালের অধিবেশনে।
মঙ্গলবার বিকেলের দ্বিতীয় অধিবেশনে সংগীত পরিবেশন করবে সুরধারা ও সঞ্চারী সংগীত একাডেমি এবং গীতি-নৃত্য আলেখ্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ পরিবেশন করবেন অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন ও নৃত্যরূপ একাডেমির শিল্পীরা।
অন্যদিকে বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রাম ‘বোধন বর্ষবরণ উৎসব ১৪৩৩’ আয়োজন করেছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে। মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে এই আয়োজন।
বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রাম এর প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সন্দীপন সেন একা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বষর্বরণের আয়োজনে আবৃত্তি, সংগীত, যন্ত্রসংগীত ও নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নেবে ২৪টি সংগঠন। এছাড়া একক ও দ্বৈত সংগীত পরিবেশনায় ১০ জন শিল্পী অংশ নেবেন।
নগরীর পাথরঘাটায় সেন্ট প্ল্যাসিডস স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণেও বর্ষবরণের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে শোভাযাত্রা, প্রদীপ প্রজ্বালন, সমবেত সংগীত, একক গান, নৃত্য, যন্ত্র সংগীতসহ সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নেবেন বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।