Published : 04 Jan 2026, 10:34 PM
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ‘নৈতিকভাবে এই সরকারের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত চুক্তি’ করার কোনো এখতিয়ার নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
এই যুক্তি দেখিয়ে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে চুক্তি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) আয়োজিত বন্দর বিষয়ক মতবিনিময় সভায় তিনি এমন অবস্থান তুলে ধরেন।
আয়োজক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের বিষয়ে গণমাধ্যমকে রোববার রাতে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে জানানো হয়।
আনু মুহাম্মদ বলেন, “নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নৈতিকভাবে এই সরকারের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত চুক্তি করার কোনো এখতিয়ার নেই। তাই এনসিটির বিষয়ে কোনো ধরনের চুক্তি করবেন না। পাশাপাশি লালদিয়ার চর ও পানগাঁওয়ের গোপন চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করুন।
“চট্টগ্রাম বন্দরের মতো জাতীয় কৌশলগত সম্পদকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্রের সূচনা হয় ১৯৯৭ সালে, যখন তৎকালীন সরকার এসএস কোম্পানিকে ১৯৮ বছরের জন্য বন্দর ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়।”
আনু মুহাম্মদ বলেন, সেসময় মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং দেশের বিভিন্ন কনসালটেন্সি কোম্পানি বন্দর ইজারা ‘দেশের জন্য ভালো হবে’ বলে মত দিয়েছিল।
“কিন্তু ১৯৯৭ সালেই হাই কোর্টে এস এস কোম্পানি একটি জালিয়াত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রমাণিত হয়। বর্তমানে গোপন চুক্তির মাধ্যমে লালদিয়ার চর ও পানগাঁও ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
“আশঙ্কাজনকভাবে তখনকার সেই একই চক্র আজও বলছে, এসব উদ্যোগ নাকি দেশের জন্য মঙ্গলজনক। অথচ তাদের দেওয়া তথ্য যে মিথ্যা, তা আগেই প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং তাদের বক্তব্য বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই।”
অতীতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যে যুক্তি দেখিয়ে ফাইল তৈরি করা হয়েছিল, আজও সেই বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তখন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যেহেতু বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যাচাই-বাছাই করেছে, তাই নতুন করে টেন্ডারের প্রয়োজন নেই। এখনো একই ধরনের কথা শোনা যাচ্ছে।
“এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়, একটি স্বার্থান্বেষী বৈশ্বিক দুষ্টচক্র বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য বিভিন্ন কৌশলে তৎপর রয়েছে। এ বিষয়ে দেশবাসীকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।”
সভায় অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, “বন্দর একটি জাতীয় সম্পদ এবং এই সম্পদ রক্ষায় জাতীয় আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অতীতেও বন্দর নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছিল এবং তখন জাতীয় আন্দোলনের মাধ্যমেই বন্দর রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল।
“কোনো গোপন চুক্তি দেশের মানুষ মেনে নেবে না। চুক্তির সব বিষয় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জনগণের সামনে আনতে হবে এবং লাভ-ক্ষতি ব্যাখ্যা করে জনগণের সম্মতি নিয়েই কেবল চুক্তি করা যেতে পারে।”
এম এম আকাশ বলেন, “সরকার দেশের স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে যেসব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করছে, তাদের মুনাফা নিশ্চিত করতেই বন্দরের ট্যারিফ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সরকার অপরিকল্পিতভাবে মাতারবাড়ি বন্দর নির্মাণ করছে এবং পাশাপাশি মোংলা বন্দরের উন্নয়ন করছে।
“এর ফলে ভবিষ্যতে লালদিয়ার চর ও এনসিটি হুমকির মুখে পড়তে পারে। এসব বিষয় সরকারকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিতে হবে।”
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার।
এতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম, টিইউইসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন ও বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এস কে খোদা তোতন।